খেলাপির হার কম গ্রিন ফাইন্যান্সে, ঋণ দিতে আগ্রহী হচ্ছে ব্যাংক

0

ঋণ পরিশোধে ব্যবসায়ীদের উদাসীনতার চিত্রই দেখা যায় ব্যাংক খাতে। এজন্য বছর শেষে খেলাপির পরিমাণ বাড়ছে। কিন্তু সবুজ অর্থায়নের ঋণগ্রহীতারা পরিশোধের নজির রাখতে শুরু করেছেন। নিয়মিত ঋণ ফেরত দেয়ার নজির স্থাপন করছেন এ খাতের বিনিয়োগকারীরা। ফলে ব্যাংকগুলোও এ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে আরও মনোযোগী হচ্ছে।

এমন তথ্যই জানা গেল এ-সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে। ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সবুজ বিনিয়োগে এগিয়ে আসছে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই)। সবুজ অর্থায়ন নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া গেছে এমন তথ্য।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ব্যাংকের মোট ঋণের মধ্যে খেলাপির হার এখন ১০ শতাংশের ওপরে। সেখানে সবুজ অর্থায়নে খেলাপির পরিমাণ বর্তমানে দুই শতাংশ।

সবুজ অর্থায়ন বলতে মূলত বোঝায় পরিবেশবান্ধব উপায়ে কারখানা নির্মাণ অথবা স্থাপিত কারখানায় দেওয়া ঋণকে। দূষণ কমিয়ে কারখানার পরিবেশকে কর্মিবান্ধব করতে বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ, সৌর প্যানেল স্থাপন, সূর্যের আলোর ব্যবহার বৃদ্ধি, কারখানায় বৃষ্টির পানির ব্যবহার ও বায়ু চলাচলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। এছাড়া কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে পণ্য উৎপাদন ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য তৈরিতেও এ তহবিল ব্যবহার করা যায়।

গত সেপ্টেম্বর শেষে সবুজ অর্থায়নে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৫২৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে যা ছিল ২৫ হাজার ৯৫৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এ হিসাবে গত ৯ মাসের ব্যবধানে এ খাতে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বেড়েছে দুই হাজার ৫৭১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।

গত ডিসেম্বরে সবুজ অর্থায়নে খেলাপির পরিমাণ ছিল ৬৩২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। খেলাপির হার ছিল দুই দশমিক ৪৩ শতাংশ। গত সেপ্টেম্বরে খেলাপির পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ৫৭৪ কোটি ৪১ লাখ টাকা। খেলাপির হার নেমে দাঁড়ায় দুই শতাংশে। গত ৯ মাসে খেলাপি ঋণের হারও কমেছে শূন্য দশমিক ৪৩ শতাংশীয় পয়েন্ট। সব মিলিয়ে এ খাতে বিনিয়োগে লাভবান হচ্ছে ব্যাংক ও উদ্যোক্তারা।

কাগজের ব্যবহার কমিয়ে আনতে ব্যাংকগুলোও অনলাইনে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এতে সময় ও অর্থেরও সাশ্রয় হচ্ছে। সবুজ বিনিয়োগের ফলে গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর শাখার ৯২ শতাংশই এখন অনলাইনের আওতায় চলে এসেছে।

তথ্যমতে, গত জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ব্যাংকগুলো নতুন করে সবুজ অর্থায়ন বা বিনিয়োগ করেছে দুই হাজার ৩২০ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, যা ব্যাংকের মোট বিতরণকৃত ঋণের ছয় শতাংশ। অবশ্য এ প্রান্তিকে আগের চেয়ে (এপ্রিল-জুন, ২০২০) এ খাতে বিনিয়োগ কমেছে সাত দশমিক ৬২ শতাংশ। এজন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বিনিয়োগ কমে যাওয়া অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

অন্যদিকে আলোচিত সময়ে এনবিএফআই বিনিয়োগ করে ৮২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, যা এ খাতের মোট ঋণের পাঁচ দশমিক ৯৪ শতাংশ। আগের চেয়ে এ প্রান্তিকে এনবিএফআইগুলোর বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায় ১৩১ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এক প্রান্তিকেই বিনিয়োগ শতভাগের ওপর বাড়িয়েছে এ খাত।

৯ মাস আগে সবুজ বিনিয়োগে শীর্ষ ছিল এনআরবি ব্যাংক। ব্যাংকটির বিনিয়োগ ছিল ৩৮০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। বর্তমানে ব্যাংকটির এ খাতে বিনিয়োগ কমে দাঁড়িয়েছে ৯৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। সবুজ বিনিয়োগে বর্তমানে ব্যাংকটির অবস্থান প্রথম থেকে অষ্টম অবস্থানে নেমেছে। একইভাবে দ্য এইচএসবিসি ব্যাংকের বিনিয়োগ ছিল ২৪৭ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। গত সেপ্টেম্বরে দাঁড়িয়েছে ৫২১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। বর্তমানে ব্যাংকটি সবুজ ব্যাংকিংয়ে প্রথম অবস্থানে রয়েছে বিনিয়োগ বিবেচনায়।

ব্র্যাক ব্যাংকের বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ১৬৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা থেকে ৮৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ১৪৩ কেটি টাকা থেকে ১৮৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা এবং আইএফআইসি ব্যাংকের বিনিয়োগ ১২৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা থেকে ১৩৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। গত ৯ মাসে সবুজ বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি বাড়িয়েছে ইসলামী ব্যাংক লিমিেিটড। গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৫১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, যা এ খাতের বিনিয়োগে বর্তমানে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

এছাড়া সবুজ বিনিয়োগে শীর্ষ পাঁচে নাম লিখিয়েছে এক্সিম ও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক। অপরদিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল ফাইন্যান্স ফান্ড ১৩১ কোটি ১৩ লাখ টাকা, যা কমে দাঁড়িয়েছে ৭০ কোটি ৬১ লাখ টাকা। এছাড়া দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে লঙ্কান অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্স চার কোটি ৯০ লাখ টাকা ও হজ্জ ফাইন্যান্স কোম্পানি তিন কোটি টাকা।

৯ মাস আগে ৮৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা বিনিয়োগ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের বিনিয়োগ ছিল ২৫ কোটি ১৬ লাখ টাকা।

৯ মাস আগে সবুজ অর্থায়ন গ্রহণকারী উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৬৯৯। গত সেপ্টেম্বরে তা দাঁড়িয়েছে ৫৪০-এ। সবচেয়ে বেশি কমেছে বড় উদোক্তা খাতে। ৯ মাস আগে এ খাত থেকে বড় উদ্যোক্তাদের ঋণ নেয়ার সংখ্যা ছিল ২০২। গত সেপ্টেম্বরে তা কমে দাঁড়ায় ১০৬-এ। একইভাবে কমেছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের সংখ্যা।

পরিবেশবান্ধব পণ্য উৎপাদন ও শিল্প প্রতিষ্ঠায় ২০১১ সাল থেকে তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পুনঃঅর্থায়নযোগ্য এ তহবিল থেকে উদ্যোক্তরা ঋণ নিতে পারছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকও এ খাতে ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করছে। অপরদিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত হওয়ার জন্য ব্যাংকগুলো সবুজ অর্থায়নের প্রতি মনোযোগী হচ্ছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ব্যাংকগুলো মূলত ইস্পাত, সিমেন্ট, কাগজ, রাসায়নিক পণ্য উৎপাদন, সার, বিদ্যুৎ ও বস্ত্র খাতে সর্বোচ্চ ঋণ বিতরণ করে থাকে। এসব শিল্প সবচেয়ে বেশি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক কার্বন নিঃসরণ করে থাকে। পরিবেশ উন্নয়নে সবুজ অর্থায়নে ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য ব্যাংকগুলোকে ‘গো-গ্রিন’ কর্মসূচির প্রতি উদ্ধুদ্ধ করছে নিয়মিত।

Leave a Reply