নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বেতনের কথা উল্লেখ না করে ‘আলোচনা সাপেক্ষে’ কেন থাকে?

লিংকডইন বা যেকোনো চাকরি সংক্রান্ত ওয়েবসাইটে লোভনীয় চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখে চোখে মুখে এক ধরনের প্রশান্তি ভেসে ওঠে। সঙ্গে বিজ্ঞপ্তির বিবরণ, কাজের ধরন কিংবা যোগ্যতার অংশটি যখন আপনার সঙ্গে মিলে যায়, তখন আর ঠেকায় কে? কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেই প্রশান্তি ভেস্তে যায়, যখন প্রত্যাশিত বেতনের ঘরে খুব সাদামাটাভাবে লেখা থাকে আলোচনা সাপেক্ষে

টেকনো ইনফো বিডি‘র প্রিয় পাঠক: প্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও চাকরির গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ টেকনো ইনফো বিডি তে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন।

বেতনের কথা সরাসরি উল্লেখ না করে এমন অসম্পন্ন দুই শব্দ ব্যবহারের নেপথ্য কারণ কী? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন বিবিসির ক্যারিয়ার সংক্রান্ত বিশেষ আয়োজন ওয়ার্ক লাইফ প্রতিবেদক মার্ক জনসন।

প্রতিবেদনের শুধুতেই তিনি ইউকে, ফ্রান্স ও সিঙ্গাপুরভিত্তিক তথ্য-প্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান উইম্যানটেইন এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর হার্মসওয়ার্তে বক্তব্য তুলে ধরেছেন। এতে হার্মওয়ার্ত বলেন, ঐতিহ্যগত ভাবেই করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বিজ্ঞাপনে বেতনের কথা গোপন রাখে। এটি একটি ইঁদুর বিড়াল খেলার মতো। কেননা এই কৌশলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের প্রত্যাশিত বেতন ও বর্তমান বেতনের সম্পর্কে একটি ধারণা নিতে চায়। মূলত নেগশিয়েশন ছাড়া কর্মীদের বেতন দিতে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই অনিচ্ছুক।

কিন্তু এ ধরনের কৌশল চাকরি প্রত্যাশীদের বেশ কষ্ট দেয়। সত্যিকার অর্থেই একজন বেকার, কিংবা মিড জব সিকার নতুন কোনো বিজ্ঞপ্তি দেখলেই জানতে চান ‌‘বেতন কত’। এই ‌‌‘বেতন কত’ প্রশ্নের উত্তর তারা যত দ্রুত পাবেন, তত দ্রুতই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। বেশিরভাগ কর্মজীবীর একমাত্র আয়ের উৎস মাস শেষে বেতনের টাকা। কার্যতই তাদের কাছে এই হিসাব-নিকাশ খুব গুরুত্ব বহন করে।

২০১৮ সালে এ সংক্রান্ত তথ্যের উপর ভিত্তি করে লিংকডইন একটি সার্ভে তথ্য প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয় কমপক্ষে ৬০ শতাংশ চাকরি প্রত্যাশী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বেতনের কথা সরাসরি উল্লেখ করার পক্ষে মত দিয়েছেন। একইসঙ্গে গ্লাসডোর নামের একটি প্রতিষ্ঠানের আরেক সার্ভের প্রতিবেদন অনুসারে ৬৭ শতাংশ চাকরি প্রত্যাশী বিজ্ঞাপনে বেতনের বিষয়টি খোঁজেন।

এরপরেও বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান বেতন সংক্রান্ত বিষয়টি বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করতে চান না। তাদের যুক্তি, বেতনের কথা উল্লেখ করলে বিদ্যমান কর্মীদের মধ্যে বিবাদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। অবশ্য এছাড়া আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণও রয়েছে।

তবুও বেতনের স্বচ্ছতা শুধুমাত্র একটি নতুন নিয়মে নয় বরং আইন করার জন্য বিশ্বব্যাপী মৌন আন্দোলন করছে চাকরি প্রত্যাশীরা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো এ নিয়ে একদমই কর্ণপাত করছে না।

এদিকে পে-স্কেল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের মাত্র ১২.৬ শতাংশ কোম্পানি বিজ্ঞাপনের সঙ্গে বেতনের কথা উল্লেখ করে। বাকিরা ক্রমবর্ধমান বাজারে ভালো কর্মী টিকিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে এটি প্রকাশ করতে চায় না।

এ নিয়ে কানাডার কুইনস ইউনিভার্সিটির ইকুইটি অ্যান্ড ইনক্লুশন ইন বিজনেস বিভাগের প্রফেসর এডি এনজি স্মিথ বলেন, নিয়োগকর্তাদের বেতনের কথা প্রকাশ করতে না চাওয়ার অন্যতম কারণ প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে বিরক্তি দেখা দেওয়া।

আদর্শিক ভাবে এ কথা সত্য যে, ফ্রেশাররা যখন একই পদে যোগদান করেন তখন তাদের প্রত্যেকের বেতনের পরিমাণ প্রায় সমান হয়। কিন্তু সবসময় এ কথা সত্য বলে প্রতীয়মান হয় না। কাজের পরিবেশ, কর্ম দক্ষতা, স্মার্টনেস ও প্রতিষ্ঠানের গতি-প্রকৃতির ওপর প্রার্থীদের বেতনের পরিমাণ কম-বেশি হতে পারে।

অপরদিকে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই চায় বেশি যোগ্য ও মেধাবী কর্মী নিজেদের প্রতিষ্ঠানে যুক্ত করতে। এ ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত পদের কত বেতন, সেটা প্রকাশ্যে আসলে, সমমনা প্রতিষ্ঠানগুলো চাইবে আরও বেশি বেতন প্রদান করে ভালো কর্মী নিজেদের প্রতিষ্ঠানে যুক্ত করতে। ফলে চাকরির বাজারে অস্থিতিশীল এক পরিস্থিতির তৈরি হবে। বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে অপেক্ষাকৃত ছোট ও মধ্যম বিত্তশালী প্রতিষ্ঠানগুলো বিপদে পড়বে। এ ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতার হাত থেকে চাকরির বাজার বাঁচাতে দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞপ্তিতে বেতনের কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয় না। কৌশলে ‌আলোচনা সাপেক্ষে রাখা হয়।

এছাড়া কিছু প্রতিষ্ঠান বিশ্বাস করে, তারা যদি বিজ্ঞাপনে পদ অনুসারে বেতনের প্যাকেজ উল্লেখ করেন, তবে সবাই বেতনের শীর্ষ অংশটিই দাবি করবেন। যদিও সেটা নির্ধারিত থাকে সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থীর জন্য।

কিন্তু এই গোপনীয়তার নীতি একজন চাকরি প্রত্যাশীর কাছে নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে। তারা ভাবতে পারে, প্রতিষ্ঠানগুলো যোগ্যতা অনুসারে তাদের বেতন দিতে ইচ্ছুক নয়। কিংবা এসব প্রতিষ্ঠানে আইন অনুসারে বেতন কাঠামো অনুসরণ করা হয়নি।

এদিকে প্লে-স্কেলের চিপ পিপলস অফিসার শেলি হল্ড বলেন, বেতনের স্বচ্ছতা নিয়ে যেসব প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ কম, তাদের প্রতিই চাকরি প্রত্যাশীদের আস্থার অভাব রয়েছে।

আরও দেখুন:
– সমন্বিত ব্যাংক নিয়োগের ভাইভা প্রস্তুতি

তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে বেতনের স্কেলের কথা উল্লেখ করলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পুরো দৃশ্যটাই ভিন্ন। নামেমাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তাদের নীতিমালা অনুসারে বেতনের কথা উল্লেখ করে দেয়। কিন্তু বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই আলোচনা সাপেক্ষে লিখে দায় মেটায়।

সূত্র: ওয়ার্ক-লাইফ, বিবিসি।

Leave a Reply

Back to top button