Tuesday, November 30, 2021

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফরেক্স রিজার্ভের সঞ্চয় রাখে কেন?

মোহাইমিন পাটোয়ারী

জনপ্রিয় পোস্ট

হরহামেশাই পত্রিকা খুলে আমরা দেখতে পাই বাংলাদেশের ফরেন রিজার্ভ রেকর্ড ছাড়াচ্ছে। আজকে ৪৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে তো তার কিছুদিন পরই দেখি ৪৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে! কিন্তু যে সম্পদ আমাদের দেশের প্রায় ৪৬ বিলিয়ন ডলার ছুঁয়েছে, সেটা হচ্ছে ফরেন এক্সচেঞ্জ, রিজার্ভ বা সংক্ষেপে ফরেক্স/ফরেন রিজার্ভ।

ধরা যাক, সোহেল ও রোকন এ দুই তরুণ বাংলাদেশে থাকেন। সোহেল যখন বাংলাদেশে কেনাকাটা করবেন, যেমন সোহেল তার ছোট ভাইয়ের জন্য রোকনের দোকান থেকে একটি পাঞ্জাবি কিনবেন, তখন তারা কোন মুদ্রা ব্যবহার বা বিনিময় করবেন? নিশ্চয়ই টাকা। কারণ বাংলাদেশের সব প্রান্তে টাকা একটি গ্রহণযোগ্য বিনিময় মাধ্যম।

কিন্তু সোহেল যদি আজকে ইংল্যান্ড থেকে একটা রোলস রয়েস গাড়ি কিনতে চান এবং রোলস রয়েস কোম্পানিকে ৪ কোটি ‘বাংলাদেশী টাকা’র তিন-চারটা ব্রিফকেস ধরিয়ে দেন, তাহলে কী হবে? এক কথায় রোলস রয়েস মহাফ্যাসাদে পড়বে। কোম্পানি গাড়ি বেচতে চাইবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই কিন্তু বিনিময়ে পাওয়া এ ‘বাংলাদেশী টাকা’ দিয়ে কোম্পানি তাদের খরচ, শ্রমিকদের বেতন বা ট্যাক্স কিছুই দিতে পারবে না। কারণ ইংল্যান্ডের দোকানপাট-বাজারঘাট বাংলাদেশী টাকায় চলে না, সেখানে চলে ইউরো। তাই গাড়িটা কিনতে হলে সোহেলের দরকার হবে প্রায় ৪ লাখ ইউরো।

এখন ঘটনা হলো, বাংলাদেশে তো ইউরো তৈরি হয় না। বাংলাদেশ তো দূরের কথা, আজকাল ইংল্যান্ড নিজেই ইচ্ছা করলে ইউরো ছাপাতে পারে না। ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের আওতায় বিভিন্ন দেশের সেন্ট্রাল ব্যাংক অনুমোদিত পরিমাণে ইউরো ছাপাতে পারে। এখন সোহেল যদি টাকার বিপরীতে ইউরো কিনতে চান, তিনি এদিক-সেদিক-বঙ্গবাজার-বসুন্ধরা শপিং মল—এ রকম কোথাও কোনো গ্রাহক পাবেন না। কারণ সোহেলের এমন একজন দরকার, যিনি ইউরো বিক্রি করে টাকা কিনবেন। আর যিনি টাকা কিনবেন, তিনি এ টাকা কোনো কাজে লাগাতে পারবেন না, যদি না বাংলাদেশ থেকেই কিছু কিনতে চান অথবা বাংলাদেশে ভ্রমণ করেন। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই রোলস রয়েসপ্রেমী সোহেলের সাধ অপূর্ণ থেকে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশে একটা এমন ব্যবসা আছে, যারা তাদের জিনিসপত্র সরাসরি ইউরোপের দেশগুলোর কাছে বিক্রি করে ইউরো পায়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক যখন আমরা ইউরোপে রফতানি করি তখন ওখানকার ব্যবসায়ীরা আমাদের ধরিয়ে দিতে চান ইউরো। কিন্তু এখন আবার উল্টা সমস্যা, ইউরো দিয়ে দেশের বাজারে কেনাকাটা করা বা শ্রমিকের বেতন পরিশোধ করা সম্ভব নয়। ইউরোপীয় ক্রেতার পক্ষেও এত এত তৈরি পোশাক কেনার জন্য দরকারি বাংলাদেশী টাকা জোগাড় করা সম্ভব নয়। এসব প্যাঁচে পড়ে আন্তর্জাতিক লেনদেনে মুদ্রার ভিন্নতা একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

আরও দেখুন: নোটের উপর লেখা-সিল ও স্ট্যাপলিং না করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশ

এ সমস্যা দূর করতে আগেকার দিনে আন্তর্জাতিক লেনদেনে ব্যবহার করা হতো স্বর্ণ বা রুপা। যেহেতু বিভিন্ন দেশের মুদ্রা ভিন্ন ভিন্ন, আর স্বর্ণ-রুপা ছিল সবার কাছে গ্রহণযোগ্য, তাই আন্তর্জাতিক লেনদেনের সাধারণ বিনিময় মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায় এ দুই ধাতব বস্তু। কোনো দেশ পণ্য রফতানি করলে সে দেশের কোষাগারে স্বর্ণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেত। আবার আমদানি করার সময় কোষাগারে থেকে স্বর্ণের পরিমাণ হ্রাস পেত। অর্থাৎ স্বর্ণই ছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা। এভাবেই চলছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত।

কিন্তু সমস্যা হয়ে গেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ঋণী হয়ে প্রচুর পরিমাণ স্বর্ণ হারিয়ে ফেলে। ফলে তাদের দ্বারা আর টাকার বিপরীতে স্বর্ণ মজুদ করে রাখা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই ১৯৪৪ সালে ব্রেটন উডস চুক্তির মাধ্যমে নতুন নিয়ম জারি করা হলো। একমাত্র মার্কিন ডলারের বিপরীতে স্বর্ণ মজুদ থাকবে আর বাদবাকি সব মুদ্রা ডলারের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখবে। এভাবে মার্কিন ডলার হয়ে উঠল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাধারণ মুদ্রা।

তখন থেকেই দুটি ভিন্ন দেশ তাদের নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য করত ডলারে। কারণ তাদের হাতে প্রয়োজনীয় স্বর্ণ ছিল না এবং ডলারের বিপরীতেই কেবল স্বর্ণ মজুদ ছিল। এক কথায় ব্রেটন উডস চুক্তির পরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলার হয়ে উঠল নতুন স্বর্ণ।

পরবর্তী সময়ে আমেরিকা তার প্রতিশ্রুতি রাখেনি, তারা চুক্তির উল্লিখিত পরিমাণের অতিরিক্ত ডলার ছাপাতে থাকে। এ ব্যাপারে অভিযোগ উঠলে ১৯৭১ সালে সবাইকে অবাক করে দিয়ে তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ডলারের বিপরীতে স্বর্ণের মজুদ ব্যবস্থা বাতিল ঘোষণা করেন। এভাবে গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডের ইতি ঘটে। বর্তমানে কোনো মুদ্রার বিপরীতেই স্বর্ণ মজুদ নেই।

কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে বাণিজ্যের জন্য একটি সাধারণ মুদ্রা প্রয়োজন, যা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। বর্তমানে সেই গ্রহণযোগ্য সাধারণ মুদ্রার রাজাসন ব্রেটন উডসের কল্যাণে দখল করে আছে মার্কিন ডলার। তাই কোনো দেশ যখন রফতানি করে বা রেমিট্যান্স আয় করে তখন আয় হয় ডলারে। আবার কোনো দেশ যখন আমদানি করে তখন ব্যয় হয় ডলারে। আর এ দুয়ের পার্থক্য কোষাগার থেকে যোগ-বিয়োগ করে নিতে হয়।

একটি পরিবারের আয় অপেক্ষা ব্যয় কম হলে যেমন সঞ্চয় বৃদ্ধি পায়, ঠিক তেমনি একটি রাষ্ট্রের ডলার আয় অপেক্ষা ব্যয় কম হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার সঞ্চয় বৃদ্ধি পায়। আর এ সঞ্চয়কেই ইংরেজিতে বলে রিজার্ভ। অনেক সময় একে ফরেক্স রিজার্ভও বলা হয়। ফরেক্স শব্দের অর্থ হচ্ছে ফরেইন এক্সচেঞ্জ বা বৈদেশিক লেনদেন। যেহেতু আমরা বৈদেশিক লেনদেনের মাধ্যমে এ সঞ্চয় বা রিজার্ভ অর্জন করেছি তাই একে বলি ফরেক্স রিজার্ভ।

রিজার্ভ যে সবসময় ডলারেই থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই। স্বর্ণের কোষাগার থেকে যেমন স্বর্ণ বিক্রয় করে অন্যান্য সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব, ঠিক তেমনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইলেই ডলার বিক্রয় করে ইউরো, ইয়েন বা স্বর্ণ, রুপা ইত্যাদি কিনে রাখতে পারে।

অনেক সময়ই ব্যাংক এ বিশাল অংকের রিজার্ভ কেবল ডলারে সঞ্চিত না রেখে সম্পদের ঝুলিতে বৈচিত্র্য বা ডাইভার্সিটি আনতে বিভিন্ন সম্পদ যেমন ইউরো, ইয়েন, স্বর্ণ ইত্যাদিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখে। এসব সম্পদের সম্মিলিত বাজারদরের পরিমাণই হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ।

মোহাইমিন পাটোয়ারী: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক, ডবল মাস্টার্স, নরওয়ে স্কুল অব ইকোনমিকস ও মানহাইম বিজনেস স্কুল, জার্মানি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ পোস্ট

উদ্বৃত্ত মূলধনে শীর্ষে ডাচ্‌–বাংলা ব্যাংক

করোনাভাইরাসের কারণে গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধে ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপরও ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ বাড়ছে। ফলে মুনাফা থেকে বাড়তি...

এ সম্পর্কিত আরও