ন্যাশনাল ব্যাংক চালাচ্ছে কারা?

0
NATIONAL BANK

ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন বেসরকারি খাতের প্রথম প্রজন্মের ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালকরা। জয়নুল হক শিকদারের মৃত্যুর পর এ সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। অভিযোগ উঠছে ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের মান নিয়ে। আলোচনায় উঠে এসেছে প্রস্তাবে থাকা ঋণের পরিমাণ নিয়েও। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি গড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত। একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে এমন তথ্য।

যদিও ব্যাংকের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, পরিচালকদের মধ্যে কোনো বিবাদ বা দ্বন্দ্ব নেই। ব্যাংক ভালো অবস্থায় চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে নিরীক্ষা করে দেখতে পারে।

জানা গেছে, দেশের ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে বেসরকারি খাতের প্রথম ব্যাংক হচ্ছে ন্যাশনাল ব্যাংক। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকেই ব্যাংকটির আর্থিক স্বাস্থ্য ভালো মানের ছিল। এ ব্যাংকের কাছ থেকেই ঋণ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন অনেক ব্যবসায়ী। বর্তমানেও ঋণের প্রায় অর্ধেকই ছোট-বড় শিল্প খাতেই। এজন্য সুদ আয়ের সিংহভাগই আসে করপোরেট প্রতিষ্ঠান থেকে। সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ব্যাংকটি এক হাজার ৪২ কোটি টাকা সুদ আয় করে। বর্তমানে ঋণ স্থিতি ছাড়িয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা।

জানা গেছে, ২০০৯ সালে ব্যাংকটিতে পারিবারিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন জয়নুল হক সিকদার। এরপরই ব্যাংকটিতে পরিচালক হন সিকদার পরিবারের সদস্যরা। তখন থেকেই ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বৃদ্ধি পায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ। ২০০৯ সালে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৮৮ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে তা দাঁড়ায় দুই হাজার ৮৫ কোটি টাকা। ১১ বছরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচগুণ। খেলাপির ভারে প্রভিশন ঘাটতিতে পড়েছে ব্যাংকটি। যদিও ২০১৯ সালে ব্যাংকটি ৪১২ কোটি ৩২ লাখ টাকা কর-পরবর্তী মুনাফা করেছে।

ব্যাংকটির ঋণ ও পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন সদস্যদের নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও আর্থিক স্বাস্থ্যে এখনও বেসরকারি খাতের মধ্যে প্রথম সারিতে অবস্থান করছে। ঋণ মান নিয়ে প্রশ্ন উঠায় ব্যাংকের স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। জয়নুল হক সিকদারের নেতৃত্বে ব্যাংকটি চলাকালে কোনো বিবাদ দৃশ্যমান হয়নি। তার নেতৃত্বেই চলেছেন সবাই।

গত ১০ ফেব্রুয়ারি মারা যান জয়নুল হক সিকদার। তার মৃত্যুর পর স্ত্রী মনোয়ারা সিকদার বর্তমানে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন গত ২৪ ফেব্রুয়ারি। এরপর থেকেই ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে পরিচালকদের মধ্যে বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ব্যাংকটির পর্ষদে থাকা সিকদার পরিবারের সদস্যরা এক অবস্থানে থাকলেও বিপরীতে চলে গেছেন বাকিরা।

ঋণ অনুমোদনের চেয়ে এখন ব্যাংক নিয়ন্ত্রণই মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিবাদে ব্যাংকের কর্মকর্তারাও জড়িয়ে পড়েন। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত গড়ায়। নিয়োগ ও কর্মতৎপরতায় প্রশ্ন উঠায় ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে চলতি দায়িত্বে থাকা অতিরিক্তি ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম বুলবুলের মেয়াদ বৃদ্ধিকে অনুমোদন দেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক।

জানা গেছে, বেসরকারি খাতের প্রথম প্রজন্মের ব্যাংক হচ্ছে ন্যাশনাল ব্যাংক। বর্তমানে ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণ ৪৬ হাজার কোটি টাকার ওপরে। এর বিপরীতে ঋণ স্থিতি হচ্ছে ৪২ হাজার কোটি টাকার মতো।

গত জানুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত সময়ে ব্যাংকটির মাধ্যমে ৪৫০ কোটি টাকার নতুন ঋণ বিতরণ হয়েছে। আরও কিছু ঋণ প্রস্তাব বিবেচনা করে দেখছে ব্যাংক। এসব ঋণের অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। অভিযোগ উঠেছে, এসব ঋণ যথাযথ অনুমোদন না নিয়েই বিতরণ করা হয়েছে। অভিযোগ পেয়ে তদন্তে নামে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণ তথ্য চেয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চিঠি দেয় ন্যাশনাল ব্যাংকে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘গত ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত বিতরণকৃত ঋণের সব তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাতে হবে। এর মধ্যে ঋণ আবেদনপত্র ও মঞ্জুরিসহ সব তথ্য চাওয়া হয়। একইসঙ্গে পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত নতুন করে ঋণ মঞ্জুর স্থগিত করতে বলা হয়। অর্থাৎ এই সময়ে ন্যাশনাল ব্যাংক কোনো নতুন ঋণ বিতরণ করতে পারবে না।

এ বিষয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক মো. নাইমুজ্জামান ভুঁইয়া মুক্তা শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ব্যাংকের পর্ষদের মধ্যে কোনো পর্যায়ে দ্বন্দ্ব নেই। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ব্যাংকিং খাতে সর্বোচ্চ করদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে মনোনীত হয়েছে। এর মানে হচ্ছে ব্যাংক ভালোভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। গত ২৬ ডিসেম্বরের পর থেকে এ পর্যন্ত ব্যাংকের দুটি পর্ষদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঋণ নিয়ে কোনো অনিয়ম হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে নিরীক্ষা করতে পারে। আমরা সহযোগিতা করব। বিনিয়োগকারীদের বলতে চাই, উদ্বিগ্ন না হতে।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরেক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৮৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকটি প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখতেও ব্যর্থ হয়েছে। এ পর্যন্ত ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৮৭ কোটি টাকা। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এ ব্যাংকের শেয়ারটি অভিহিত মূল্যের নিচে লেনদেন হচ্ছে। সর্বশেষ ব্যাংকটির শেয়ার হাতবদল হয়েছে সাত টাকায়। সর্বশেষ ২০১৯ সালের জন্য বিনিয়োগকারীদের ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে। শেয়ার বিজ।

আরও দেখুনঃ
আগামীকাল থেকে নন ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান খোলা
লকডাউনে ব্যাংকে লেনদেন চলবে আগের মতোই

Leave a Reply