এজেন্ট ব্যাংকিং সেবায় সঠিক পথে কোন ব্যাংক?

0

ব্যাংকিং সেবা শুধু শহরে নয়, প্রত্যন্ত গ্রামেও এখন ছড়িয়ে পড়ছে। এজেন্ট শাখা নামে চলছে এই ব্যাংকিং সেবা। তবে ব্যাংকিং এর মতো গুরুত্বপূর্ণ এই সেবা যত্রতত্র ও যাকে-তাকে দিয়ে করানোর মতো ঘটনাও ঘটছে। ব্যাংকগুলো বিভিন্ন এলাকায় মোবাইলের ফ্ল্যাক্সি লোড দোকানদার, বিকাশের দোকানদার, মুদিখানার দোকানদার, ওষুধের দোকানদারসহ বিভিন্ন পেশার লোকদের মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালিয়ে যাচ্ছে। কোনও কোনও ব্যাংক এনজিও’র আদলে ঋণ বিতরণ করছে। কোনও কোনও ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংক বিকাশের আদলে টাকা পাঠানোকেই প্রধান কাজ হিসেবে মনে করছে। কোনও কোনও ব্যাংকের এজেন্টশিপ গ্রহণ ও আউটলেট তৈরিতে উদ্যোক্তাদের ১৫-৩০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। আবার কোনও ব্যাংকের এজেন্ট নিতে কোনও টাকাই লাগছে না। কোনও কোনও এজেন্টেরর মাসে ২ হাজার টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে না, আবার আউটলেট পরিচালনা, ভাড়া পরিশোধসহ অন্যান্য ব্যয় সংযুক্ত করে প্রতি মাসেই কোনও কোনও এজেন্টদের ব্যয় হচ্ছে ৩০-৫০ হাজার টাকা। এভাবেই চলছে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম।

ঢাকার বাইরে বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, একই ব্যক্তি মাত্র ২০ থেকে ৩০ ফিট জায়গার একটি দোকানে বসে বিভিন্ন মোবাইলে ফ্ল্যাক্সিলোড দিচ্ছেন, তিনিই রকেট, বিকাশ, নগদ, শিওরক্যাশ করছেন। শুধু তাই নয়, তিনি একই দোকানে বসে ফটোকপির ব্যবসাও করছেন। স্টেশনারি দোকানও চালাচ্ছেন। তিনি আবার ডাচ বাংলা ব্যাংকও চালাচ্ছেন। যদিও ব্যাংকিং করার জন্য তার কোনও প্রশিক্ষণ নেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডাচ বাংলা ব্যাংকের ওই এজেন্ট বলেন, সবাই আমার কাছে বিকাশ করতে আসে। অধিকাংশই আমার দোকানে আসে ফ্ল্যাক্সিলোড করতে। কেউ ডাচ বাংলা ব্যাংক করতে আসে না। ডাচ বাংলা এখানে চলেও না। আর আমাকে সবাই চেনে বিকাশ হিসেবেই। তাহলে ডাচ বাংলা ব্যাংকের সাইনবোর্ড টাঙানো কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই বাজারে অন্য কেউ যাতে ডাচ বাংলা ব্যাংকের এজেন্ট নিতে না পারে, সে জন্য নিয়ে রেখেছি।

ঢাকার বাইরের একটি এলাকার এজেন্ট শাখার কার্যক্রমের ছবি পাঠিয়ে এত অল্প যায়গায় নানা ধরনের ব্যবসা করা ব্যক্তিকে কেন এজেন্ট দেওয়া হয়েছে জিজ্ঞাস করলে কোনও জবাব দেননি ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম শিরিন।

শুধু ডাচ বাংলা ব্যাংকই নয়, আরও দু-একটি ব্যাংক বিভিন্ন এলাকায় বাছ-বিচার না করেই এজেন্ট দিয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে এক কর্মকর্তায় এক শাখা এমন আউটলেটের সংখ্যাই বেশি।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, একই দোকানে বসে নানা ধরনের ব্যবসার পাশাপাশি এজেন্ট ব্যাংকিং করাটা দোষের কিছু না। তবে গ্রাহক সেটাকে ভালোভাবে না নিলে সে এমনিতেই পিছিয়ে পড়বে। যেসব এজেন্ট ব্যাংক প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষদেরকে ঋণ দিচ্ছে না তারাও সঠিক কাজ করছেন না বলে মনে করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষদের ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্র হাতে নেওয়া হয়েছে। এতে লাখ লাখ মানুষ উপকৃত হচ্ছে। তবে যারা নীতিমালা মানছে না, তাদের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক নজরদারি করবে বলেও জানান তিনি।

অবশ্য এজেন্ট ব্যাংক হলেও ব্যতিক্রম কেবল ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে। ঢাকার বাইরের বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মুল ব্যাংকের আদলেই ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড তাদের প্রশিক্ষিত এজেন্টদের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে প্রায় সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিচ্ছে। ব্যাংকটির ২ হাজারের বেশি আউটলেটের মাধ্যমে স্বল্প সময়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে দেশ এগিয়ে চলছে। ইসলামী ব্যাংকের কয়েকটি আউটলেট ঘুরে দেখা যায় এলাকার মানুষজন ব্যাংকের মতোই লেনদেন করছেন। গ্রাহকদের সেবা যারা দিচ্ছেন, তাদের আচরণই বলে দিচ্ছে এরা সবাই ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট শাখা থেকে মূল ব্যাংকের মতোই সেবা পাচ্ছেন। ব্যাংকটির প্রতি মানুষের আস্থাও বেশি। এ কারণে এলাকার মানুষজন ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট শাখাগুলোতে একাউন্ট খুলছেন। টাকা জমা করছেন। বিদ্যুৎ বিল জমা দিচ্ছেন। ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট শাখায় সব ধরনের লেনদেন করছেন।

এ প্রসঙ্গে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাহবুব উল আলম বলেন, দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী এখনও ব্যাংকিং সেবার বাইরে রয়েছে। তাদেরকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে বড় ভুমিকা রাখছে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম। ইসলামী ব্যাংক এরই মধ্যে ২ হাজারের বেশি এজেন্ট নিয়োগ দিয়েছে। অনেকে এরই মধ্যে মুনাফায় চলে এসেছে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসীরা বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। আস্থার শীর্ষে থাকায় আমাদের এজেন্টদের আমানত সংগ্রহও অন্যদের তুলনায় বেশি।

প্রসঙ্গত, দেশে ১৫তম ব্যাংক হিসেবে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করে ইসলামী ব্যাংক। কিন্তু স্বল্প সময়ে ব্যাংকটির এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার বিপুল বিস্তৃতি হয়েছে। এজেন্ট নিয়োগ ও হিসাব খোলার দিক থেকে তৃতীয় স্থানে থাকলেও আমানত সংগ্রহ ও রেমিট্যান্স আহরণে ইসলামী ব্যাংকের অবস্থান সবার শীর্ষে। এরই মধ্যে এজেন্টদের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকে ৩ হাজার ৭৯১ কোটি টাকার আমানত জমা হয়েছে, যা মোট আমানতের ২৯ শতাংশ। আমানত সংগ্রহে দ্বিতীয় স্থানে আছে ব্যাংক এশিয়া। এজেন্টদের মাধ্যমে সংগৃহীত মোট আমানতের ১৭ দশমিক ৩১ শতাংশ নিয়ে ডাচ-বাংলা ব্যাংক রয়েছে তৃতীয় স্থানে।

প্রসঙ্গত, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে ২০১৪ সালে চালু হয় এজেন্ট ব্যাংকিং। ব্যাংক এশিয়া প্রথম এ সেবা চালু করলেও পরবর্তী সময়ে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের ২৮টি সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক।

দেশে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সূচনা হয়েছিল মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ইসলাম শেখ ছিলেন দেশের প্রথম এজেন্ট। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে তাকে প্রথম এজেন্ট নিয়োগ দিয়েছিল ব্যাংক এশিয়া। এরই মধ্যে দেশে ব্যাংকগুলোর এজেন্টের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। দেশব্যাপী এজেন্ট আউটলেট সংখ্যা গিয়ে ঠেকেছে ১৪ হাজারে।

এজেন্টদের মাধ্যমে আমানত ও রেমিট্যান্স সংগ্রহে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে ইসলামী ব্যাংক। আর এজেন্ট আউটলেট চালুর ক্ষেত্রে সবার শীর্ষে আছে ডাচ-বাংলা ব্যাংক। আর এজেন্টদের মাধ্যমে হিসাব সংখ্যা চালুর ক্ষেত্রে শীর্ষস্থান দখলে রেখেছে ব্যাংক এশিয়া। এজেন্টদের মাধ্যমে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানটি দখলে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংকের।

মূলত এজেন্ট ব্যাংকিং ধারণার সূত্রপাত ব্রাজিল। দ্রুততম সময়ে এ ব্যাংকিং ধারণা ছড়িয়ে যায় চিলি, কলম্বিয়া, পেরু ও মেক্সিকোয় এমনকি কেনিয়াসহ আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলোতে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার এ সেবা চালু হয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারতেও।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা বিষয়ে নীতিমালা জারি করে। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে পাইলট কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রথম এজেন্ট নিয়োগ দেয় ব্যাংক এশিয়া। এরপর দ্রুততম সময়ে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে যুক্ত হয়েছে অন্য ব্যাংকগুলো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ২৮টি ব্যাংক লাইসেন্স নিয়েছে। এর মধ্যে সেবাটি চালু করেছে ২৪টি ব্যাংক। এ ব্যাংকগুলো নিয়োগ দিয়েছে ১০ হাজার ১৬৩ এজেন্ট। নিয়োগপ্রাপ্ত এজেন্টরা ১৪ হাজার ১৬টি আউটলেট চালু করেছে।

এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালুর ক্ষেত্রে তৃতীয় ছিল ডাচ-বাংলা ব্যাংক। কিন্তু এরই মধ্যে এজেন্ট আউটলেট চালুর ক্ষেত্রে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে ব্যাংকটি। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটি চালু করেছে ৪ হাজার ২৩৪টি আউটলেট, যা মোট আউটলেটের ৩০ দশমিক ২১ শতাংশ। ব্যাংক এশিয়া ২৮ দশমিক ৬০ শতাংশ আউটলেট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। তৃতীয় স্থানে থাকা ইসলামী ব্যাংক চালু করেছে মোট আউটলেটের ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ।

এজেন্টদের মাধ্যমে হিসাব চালুর ক্ষেত্রে সবার শীর্ষে আছে ব্যাংক এশিয়া। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটি খুলেছে ৩২ লাখ ৪৩ হাজার ৬৭৫টি ব্যাংক হিসাব। এ হিসাবে এজেন্টদের মাধ্যমে খোলা ব্যাংক হিসাবের ৩৯ দশমিক ৪৫ শতাংশ ব্যাংক এশিয়ার দখলে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ডাচ-বাংলা ব্যাংক মোট হিসাবের ৩৩ দশমিক ২৬ শতাংশ খুলেছে। ইসলামী ব্যাংকের এজেন্টদের মাধ্যমে খোলা হয়েছে ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ হিসাব।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেবে, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এজেন্টদের মাধ্যমে ব্যাংক হিসাব চালু করেছেন ৮২ লাখ ২১ হাজার ৮৯৩ গ্রাহক। এর মধ্যে নারী গ্রাহকের হিসাব সংখ্যা ৩৭ লাখ ৪৯ হাজার ৮৭টি। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ১৩ হাজার ৪০ কোটি টাকার আমানত দেশের ব্যাংকিং খাতে যুক্ত হয়েছে। ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ১ হাজার ৮৬ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এজেন্টদের মাধ্যমে ৩৮ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকার রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় দেশে এসেছে।

সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করা ব্যাংকগুলো হলো ব্যাংক এশিয়া, ডাচ্-বাংলা, ইসলামী ব্যাংক, দ্য সিটি, আল-আরাফাহ্ ইসলামী, সোস্যাল ইসলামী, মধুমতি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, এনআরবি কমার্শিয়াল, স্ট্যান্ডার্ড, অগ্রণী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, মিডল্যান্ড, প্রিমিয়ার, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল, এবি ব্যাংক, এনআরবি, ব্র্যাক, ইস্টার্ন, ওয়ান, মার্কেন্টাইল, শাহজালাল ইসলামী, এক্সিম ও পদ্মা ব্যাংক।

Leave a Reply