টিআইবিঃ আসসালামু আলাইকুম। তথ্য প্রযুক্তির যুগে ওয়েবসাইট একটি নিত্য প্রয়োজনীয় বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। ওয়েব ডিজাইন একটি সময়োপযোগী পেশা। সময়ের প্রয়োজনে সবকিছু ডিজিটালাইজড হচ্ছে। সাথে সাথে ওয়েব ডিজাইনের চাহিদাও বাড়ছে। অনেকে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে ওয়েব ডিজাইন করে থাকে। আবার কেউ কেউ পুরোদস্তুর কোম্পানি খুলে বসে। আজ আমরা ওয়েব ডিজাইন কি এবং এর কিছু বেসিক বিষয়ে ধারনা লাভ করব।

ওয়েব ডিজাইন কি?

ডিজাইন বলতে কোন কিছু নকশা করা, রং করা, আঁকা, সুন্দরভাবে সমন্বয় করে সাজিয়ে উপস্থাপন করাকে বুঝায়। ওয়েব ডিজাইন বিষয় টা ঠিক তাই। ওয়েবসাইট এর বিভিন্ন বিষয় ও তথ্য সুন্দর ভাবে সাজিয়ে ঐ ওয়েবসাইটের ওয়েব পেজ এ উপস্থাপন করাই ওয়েব ডিজাইন।

ছবিঃ ওয়েব ডিজাইন কি?

সাধারণত ডিজাইন মানেই রং-তুলি, পেন্সিল ইত্যাদি দিয়ে কাজ কিন্তু ওয়েব ডিজাইনের আসল কাজ করতে এসব রং-তুলি বা পেন্সিলের দরকার হয় না। দরকার হয় ইন্টারনেট সংযুক্ত ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস। এক্ষেত্রে কম্পিউটার হলে কাজটা সাচ্ছন্দে করা যায়। আজ-কাল মোবাইল দিয়েও ওয়েব ডিজাইন করা যায়। আরও দরকার হয় জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা।

সহজভাবে বলতে গেলে ফটোশপ, HTML ও CSS এর সাহায্যে কিছু সংখ্যক লেখা ও ছবি কে পূর্নাঙ্গ ওয়েবসাইটে রুপ দেওয়াকেই ওয়েব ডিজাইন বলা হয়।

ওয়েব ডিজাইন জানার আগে তোমাকে কিছু বিষয়ে ধারণা রাখতে হবে। যেমন, ওয়েব পেজ (Web Page), ওয়েবসাইট (WebSite), ওয়েব পোর্টাল (Web Portal), আইপি অ্যাড্রেস (IP Address) , ডোমেইন নেইম , ওয়েব ব্রাউজার ইত্যাদি।

ওয়েব ডিজাইন করতে গেলে আপনাকে যা জানতেই হবে সেগুলো হচ্ছে-

ছবিঃ ওয়েব ডিজাইন করতে গেলে আপনাকে যা জানতেই হবে?
  • এইচটিএমএল (HTML)
  • সিএসএস (CSS)
  • জাভাস্ক্রিপ্ট (JAVASCRIPT)

এইচটিএমএল (HTML)

এইচটিএমএল হল হাইপারটেক্সট্ মার্কআপ ল্যাঙ্গুয়েজ। এটা কিন্তু কোনো প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ না। এর সাহায্যে কতোগুলো ইলেকট্রনিক ডকুমেন্ট তৈরী করা হয়, যাকে বলা হয় ওয়েব পেজ আর এই ওয়েব পেজ আমরা ওয়েবসাইটে দেখি। মনে করেন আপনি একটা ঘর বানাবেন, এর জন্যে  যা যা দরকার যেমন-ইট, বালু, সিমেন্ট ইত্যাদি। এসব দিয়ে কিন্তু ঘর তুলে ফেলতে পারবেন।

ঠিক এরকমই এইচটিএমএল দিয়ে ওয়েব পেজের কাঠামো তৈরী করা হয় এবং কতোগুলো ট্যাগ ব্যবহার করে এই কাজ করতে হয়। যেমন- কোনো কিছু লিখলে  <p></p> ব্যবহার করতে হবে।

সিএসএস (CSS)

সিএসএস হল ক্যাসকেডিয়ান স্টাইল সীট যার মাধ্যেমে আপনার ওয়েব পেজ দেখতে সুন্দর করতে পারবেন। ওই যে ঘর তুললেন মনে আছে? ঘর তোলার পর আপনি দেখতে সুন্দর করার জন্য রং করতে পারেন, দরজা-জানালা ভালোভাবে ঠিক জায়গায় লাগাতে পারেন। আর এই কাজটাই করে সিএসএস আপনার ওয়েব পেজের জন্যে। তাহলে ঘর তুললেই যে হয়ে গেলো এরকম না, ঠিক তেমনি এইচটিএমএল দিয়ে ওয়েব পেজ হবে কিন্তু সুন্দর করার জন্যে অবশ্যই সিএসএস ব্যবহার করতে হবে।

জাভাস্ক্রিপ্ট(JAVASCRIPT)

জাভাস্ক্রিপ্ট হলো স্ক্রিপ্টিং প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজ যার মাধ্যমে আপনি আপনার ওয়েব পেজের কঠিন কিছু কাজ খুব সহজেই করতে পারবেন। ওই যে আপনি ঘর তুললেন, রং করলেন  সবই হলো তাহলে আর বাকি কি? আপনি আপনার ঘরে বিদ্যুৎ নিবেন না? সুইচ দিলেই ফ্যান ঘুরা শুরু করে। এই যে কিছু ফাংশনাল কাজ এই কাজগুলোই করে জাভাস্ক্রিপ্ট।

ওয়েব ডিজাইন ব্যবসা শুরু করতে হলে যে বিষয়গুলো জানতে হবে?

ছবিঃ ওয়েব ডিজাইন ব্যবসা শুরু করতে হলে যে বিষয়গুলো জানতে হবে?

১. জটিল ব্যবসা

ওয়েবসাইট ডিজাইন খুবই জটিল একটি ব্যবসা। এই ব্যবসায় প্রবেশের জন্য খুব বেশি বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয় না। কিন্তু সফল হতে হলে কঠোর পরিশ্রমের প্রয়োজন আছে। অন্যান্য ঐতিহ্যগত ব্যবসায় পণ্য বিক্রি সম্ভাব্যতা যেমন চোখের সামনে দেখা যায়, এই ব্যবসায় এমন দৃশ্যমানতার কোনো সুযোগ নেই।

ওয়েব ডিজাইনের ব্যাপারে আপনার ক্লায়েন্টের অনেক রকম পছন্দ থাকবে। কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে কোন ডিজাইনটি তার পছন্দ তা তিনি নিজেই জানেন না। তাছাড়া ক্লায়েন্টের পছন্দ কোনো মৌলিক নকশার উপর ভিত্তি করেও হয়না। সুতরাং এক্ষেত্রে আপনি যত তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নিবেন ততই ভালো। কেননা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলে ডিজাইন অপছন্দ হওয়ার ফাঁদ থেকে রক্ষা পাবেন।

২. বিক্রয় দক্ষতা

এই ব্যবসায় সেবা বিক্রি করতে পারার দক্ষতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি ওয়েব ডিজাইন ব্যবসায় সফল হতে চান তবে ক্লায়েন্টের কাছে ডিজাইন বিক্রি করার দক্ষতা আপনার থাকতে হবে। কেননা এক্ষেত্রে ক্লায়েন্টরা নিজেরাই তাদের প্রত্যাশার ব্যাপারে দ্বিধান্বিত থাকে। কাজেই কাঙ্ক্ষিত ক্লায়েন্টের কাছে সেবা বিক্রি করতে হলে তাকে খুশি করার সব রকম দক্ষতা আপনার মধ্যে থাকতে হবে।

যদি আপনি ওয়েব ডিজাইনের ব্যবসা করতে চান, কিন্তু আপনার যথেষ্ট বিক্রয় দক্ষতা না থাকে তবে দ্রুত একজন ভালো বিক্রয় দক্ষতা সম্পন্ন কাউকে নিয়োগ করুন, অথবা ব্যবসায় অংশীদার হিসেবে গ্রহণ করুন। এই দক্ষতা ছাড়া আপনার ব্যবসা পুরোপুরি অচল।

৩. মৌখিক প্রচার

সেবা বিক্রি করতে পারাই এই ব্যবসায় সাফল্যের প্রধান চাবিকাঠি হলেও তা একটি নির্দিষ্ট সময় পর। শুধু অনলাইন নয়, অফলাইনেও এই ব্যবসার জন্য সমান প্রচেষ্টা চালাতে হবে। আপনার সাথে সাক্ষাৎ করে সেবা নিতে চাওয়া ক্লায়েন্টদের আলিঙ্গন করতে হবে। যদিও মানুষের মুখে মুখে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে আপনার ব্যবসার খবর পৌছে যাওয়া খুব সহজ কাজ নয়। কিন্তু এই আদর্শ আপনাকে ধরে রাখতে হবে এবং ক্রমাগত প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

ঠিক ইন্টারনেটে এসইও করার মত অফলাইনেও সমান এসইও করতে হবে। সুতরাং ওয়েব ডিজাইনের ব্যবসা ভেবে শুধুমাত্র ইন্টারনেটের উপর নির্ভর করলে চলবে না। মুখে মুখে প্রচারের ব্যবস্থাও করতে হবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের মাধ্যমে ক্লায়েন্টদের খুঁজে বের করতে হবে।

৪. কোল্ড কলিং

ওয়েব ডিজাইন যেহেতু একটি ইন্টারনেট নির্ভর কাজ তাই এই কাজের প্রচারের জন্য আপনাকে নতুন নতুন উপায় খুঁজে বের করতে হবে। এক্ষেত্রে তথাকথিত সেকেলে বিশেষজ্ঞদের দ্বারস্থ হওয়ার চেয়ে কোল্ড কলিং পদ্ধতি অনেক বেশী কার্যকর। ব্যবসা সম্প্রসারণ, নতুন ক্লায়েন্ট খুঁজে বের করা এবং এ সম্পর্কিত সকল প্রচারে কোল্ড কলিং পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।

মনে রাখবেন, নিজের প্রতিষ্ঠানের প্রচার নিজে না করলে ক্লায়েন্ট আপনা থেকে আপনার দরজায় এসে কখনো কড়া নাড়বে না। সুতরাং বিভিন্ন সম্ভাব্য প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করুন এবং তাদের সাথে যোগাযোগের চমৎকার উপায় হিসেবে কোল্ড কলিং পদ্ধতি ব্যবহার করুন। নিজ থেকে ক্লায়েন্টদের ফোন করে আপনার সেবা সম্পর্কিত তথ্য জানান এবং ভবিষ্যতে কখনো প্রয়োজন হলে আপনার সাথে যোগাযোগের পথ উন্মুক্ত রাখুন।

৫. প্রাথমিক অবস্থা

ঐতিহ্যবাহী এমন অনেক ব্যবসা আছে যা শুরু করলেই বিক্রয় নিশ্চিত করা যায় অর্থাৎ প্রথম দিন থেকেই উৎপাদিত পণ্য বা সেবা বিক্রি করা সম্ভব হয়। কিন্তু ওয়েব ডিজাইন ব্যবসা এমন একটি ব্যবসা যার শুরু করার কয়েক মাসের মধ্যে কোনো বিক্রি নাও হতে পারে অর্থাৎ আপনি কোনো ক্লায়েন্ট নাও পেতে পারেন।

সুতরাং এই ব্যবসায় সফল হতে হলে ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং ক্রমাগত ক্লায়েন্ট পাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। একবার ক্লায়েন্ট পেতে শুরু করলে তখন আর কাজ না পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না।

৬. ক্লায়েন্টের প্রত্যাশাই শেষ কথা

আপনি কী সেবা বিক্রি করছেন সেটা মুখ্য বিষয় নয়, মুখ্য বিষয় হলো ক্লায়েন্ট কী চায়। নিজের পছন্দমত সেবা বিক্রি করলে তা কিনতে কেউ আসবে না। বরং আপনাকে ক্লায়েন্টের পছন্দমত সেবা সৃষ্টি করতে হবে। কেননা বড় ব্যবসায়ীরা কখনোই আপনার এইচটিএমএল দক্ষতা বা আপনার সময়ের মূল্য নিয়ে ভাববে না। তারা সেইসব বিক্রেতাকে মূল্য দিয়ে থাকে যারা তাদের প্রত্যাশিত ফল দিতে পারে।

ব্যবসায়ীরা সবসময়ই চিন্তা করে কোন কাজ তাদের পকেটে বেশি টাকা এনে দিবে অথবা কিভাবে আরো টাকা আয় করা যায়। আপনার সেবা যদি তাদের এই প্রত্যাশাকে প্রভাবিত না করে তাহলে কখনই তারা যা কিনতে চাই আপনি তাদের কাছে বিক্রি করতে পারবেন না।

সুতরাং ওয়েব ডিজাইন ব্যবসায় সমৃদ্ধি আনার আরো একটি মূলমন্ত্র হলো নিজের ইচ্ছায় সেবা সৃষ্টি করা নয় বরং ক্লায়েন্টের প্রত্যাশা অনুযায়ী সেবা সৃষ্টি করতে হবে। সময় উপযোগী এই ওয়েব ডিজাইন ব্যবসার আরো অনেক খুঁটিনাটি দিক আছে। তবে ব্যবসা শুরু করার পূর্বে উপরিউক্ত বিষয়গুলো মাথায় রাখলে ব্যবসা শুরু করতে সহজ হবে।

কাটেসিঃ মোস্তাফিজুর রহমান

Leave a Reply