রুট কি? কেন রুট করবেন অার এর অসুবিধাই বা কি?

5

টেকনো ইনফোঃ আসসালামু আলাইকুম। বন্ধুরা কেমন আছেন। আশা করি আল্লাহ্‌র মেহেরবানিতে ভালই আছেন। আজ এন্ড্রয়েডের সম্পর্কিত কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো। বর্তমানে এন্ড্রয়েডের ব্যবহার প্রচুর বৃদ্ধি পাওয়ায় আমরা এন্ড্রয়েডের খুঁটিনাটি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠেছি। এর মধ্যে রুটিং, কাস্টম রম, ফ্রেমওয়ার্ক, পোর্টিং এ কথাগুলো প্রায় শুনে থাকবেন। যেহেতু জিনিসগুলো অনেক প্যাঁচ এবং ছোট খাটো লেখায় বুঝতে অসুবিধা হয় তাই সব একসাথে না বলে আলাদা আলাদা ভাবে তুলে ধরবো। আমরা আজকে রুট এবং এর সাথে সম্পর্কিত সব তথ্য জানার চেষ্টা করবো।

রুট শব্দটি অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীরা প্রায়ই শুনে থাকবেন। অ্যান্ড্রয়েড বিষয়ক অন্যান্য সাইট, ফোরাম, এমনকি গুগল প্লে স্টোরে অ্যাপ্লিকেশনও চোখে পড়বে যেগুলো ব্যবহার করতে হলে আপনার ফোন বা ট্যাবলেট রুট করা থাকতে হয়। প্রাথমিকভাবে অনেক অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইস ব্যবহারকারীরাই রুট কী এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানেন না।

ক৷ রুট কী?

রুট/Root শব্দটা এসেছে লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেমের ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে। লিনাক্স ব্যবহারকারীদের মধ্যে যাদের রুট প্রিভিলেজ বা সুপারইউজার পারমিশন আছে তাদেরকে রুট ইউজার বলা হয়। আমরা জানি এন্ড্রয়েড তৈরি হয়েছে লিনাক্স ভিত্তিক অপারেটিং সিস্টেম উপর ভিত্তি করে। এন্ড্রয়েড ডিভাইসে রুট পারমিশন মানে সিস্টেম ফাইল এডিট করার পারমিশন আদায় করাকে রুট করা বলে। এটাকে আপনার ফোন হ্যাক করাও বলতে পারেন। এই এক্সেস থাকলে আপনি সিস্টেমের যে কোন পরিবর্তন /পরিবর্ধন / পরিমার্জন করার পারমিশন পাবেন।

খ৷ Root করা বা Rooting কি?

আগেই বললাম রুট হল সিস্টেম ফাইল এক্সেস করার পারমিশন পাওয়া, এখন প্রত্যেক ম্যানুফ্যাচারার সিস্টেম পাথ গুলো Read-Only করে দেয় যাতে আপনি ঢুকতে না পারেন (এটা একচুয়ালি সিকিউরিটির জন্য করা হয়, আপনি ভুলভাল গুতাগুতি করে সিস্টেমের কোন ফাইল ডিলিট করে দিলে মোবাইল এর পরের বার অন ই হবে না)। আর রুটিং মানে এই সিস্টেম পাথের এক্সেস ফিরে পাওয়া মানে Read-Only থেকে Read-Write মডে পারমিশন পাওয়া।

গ৷ ডিভাইস কেন রুট করা থাকে না?

এখন কথা হচ্ছে নিজের ফোনের কেন এডমিনিস্ট্রেটর পারমিশন “আদায়” করে নিতে হবে? কেন ইচ্ছা করলেই একটা ফাইল ডিলিট করতে পারব না? পিসিতে তো এগুলো কিছু করতে হয় না। ফোন ম্যানুফ্যাকচাররা আপনাকে অনেক সুবিধা দিলেও কিছু সুবিধা/পারমিশন তারা দেয় না। এটা করা হয় ভালোর জন্যই। কারণ আগে থেকে আপনাকে ফোনের মধ্যে যা ইচ্ছা তাই করার অনুমতি দেওয়া থাকলে দেখা যাবে আপনি গুরুত্বপূর্ণ একটা ফাইল গায়েব করে দেবেন, অথচ আপনি শুধু চেয়েছিলেন আপনার ফোন মেমোরি বাড়াতে।

এছাড়া আপনি কাস্টমাইজ করতে গিয়ে বা রম ইন্সটল করতে গিয়ে ভুল করলে ফোন ব্রিক করে ফেলতে পারেন। শেষে এ বিষয়ে বলা হয়েছে। আর ভাইরাস/ম্যালওয়ারের কিছু ঝামেলা হতে পারে। কারণ রুট পারমিশন পেলে আপনি যা ইচ্ছা তাই ইন্সটল করতে পারেন, যার কারণে ম্যালওয়ার ফোনে ঢুকে পড়তে পারে।

ঘ৷ কেন রুট করবেন / রুট করার সুবিধাঃ

রুট ছাড়া আপনি ভালো থাকলে কোন সমস্যা নাই। রুট ফিয়েচারিং অনেক এপ্লিকেশন আছে যেগুলো অনেক উপকারী, আবার সেগুলো রুট ছাড়া চলে না! যেমনঃএন্ড্রয়েডে ইন্টারনেট ইউজ এক বিরাট সমস্যা, রাতে অন রেখে সকালে উঠলে ৫০ এমবি গায়েব, নিজে নিজে সব আপডেট হয়ে যায়! তো DroidWall এমন একটি আপস যা দিয়ে আপনি অন্য আপস গুলোর নেট ইউজ রেস্ট্রিক্টেড করে দিতে পারবেন, আপনি যদি শুধু অপেরা মিনি,ইউসি ব্রাউজার চালান তাইলে শুধু এগুলোতে টিক মার্ক দিবেন, বাকি যত এপ আছে কেউ আর নেট এর ‘ন’ ও ছুঁইয়ে দেখতে পারবে না! এবং অনেক হাজার হাজার আপস আছে যেগুলো ব্যবহার না করলে আপনার জীবন ষোল আনায় মিছে।

আপনি চাচ্ছেন মোবাইলের ‘লুক’টাই পাল্টে ফেলতে, স্ট্যাটাস বার, নেভিগেশন বার, সিস্টেম উইজার ইন্টারফেস সহ সব! আগে রুট করে আসেন। মাত্র গেল এপ্লিকেশনের কথা, মনে করেন আপনার মোবাইলের ম্যানুফ্যাচারার (say HTC) আপনার ফোনে ২.৩.৬ এর বেশি এন্ড্রয়েভ ভার্সনের আপডেট দিচ্ছে না। এখন HTC কেন দিচ্ছে না সেটা নিয়ে বালিশ ভিজাবেন নাকি নিজে কোন পথ খুঁজবেন? জ্বি, এন্ড্রয়েড ভার্সন আপডেট করা যায় কাস্টম রম ইন্সটল করে, যার জন্য প্রথম প্রয়োজন Root! আশা করি এবার ব্যাপারটা বুঝা গেসে।

রুট করার পর আপনি আপনার ফোনে এমন সব কাজ করতে পারবেন যা আগে কল্পনাও করতে পারেননি। যেমন

১৷ কাস্টম রমঃ

এন্ড্রয়েড ব্যবহারকারীরা এটাও হয়ত শুনে থাকবেন যে অনেকে কাস্টম রম (Custom ROM) ইন্সটল করে। অনেকে হয়ত কাস্টম রম ইন্সটল করা ফোন দেখে মনে মনে ভেবেছেন আপনিও করবেন। তাহলে আপনাকে রুট করতেই হবে। কাস্টম রম ইন্সটলের প্রধান শর্ত আপনাকে রুট করতে করতে হবে।

ROM হচ্ছে Read Only Memory যা আপনার ডিভাইসটিকে চালায়। নেটে অনেক কাস্টম রম পাবেন যা আপনার ফোনকে শুধু দৃষ্টিনন্দন করে তুলবে তাই নয় ফোনের পারফরম্যান্সও বাড়িয়ে তুলবে। কাস্টম রম ডেভেলপারদের মধ্যে CyanogenMod, Team Rouge, Team EOS, ParanoidAndroid, MIUI ইত্যাদির নাম বেশি শোনা যায়।

২৷ কাস্টম থিমঃ

থিম মানে আপনার ফোন যে গ্রাফিক্সটা প্রদর্শন করছে তা পরিবর্তন করার জন্যেও আপনাকে রুট করা লাগতে পারে।

৩৷ লেটেস্ট এন্ড্রয়েড ভার্সনঃ

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় ফোনের ম্যানুফ্যাকচারার ফোনের জন্য আপডেট বন্ধ করে দেয়। যেখানে সবাই এন্ড্রয়েড Oreo পাচ্ছে সেখানে হয়ত আপনাকে Nougat নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আপডেট বন্ধ করার যুক্তিযুক্ত কারণ থাকলেও আপনি কেন এন্ড্রয়েডের পুরান ভার্সন নিয়ে পড়ে থাকবেন? নতুন ভার্সন, এমনকি অনেক সময় অফিসিয়ালি রিলিজ হওয়ার আগেই যদি আপনি আপনার ফোনে সেটা ইন্সটল করতে চান, রুট করে ফেলুন।

৪৷ কাস্টম কার্নেলঃ

এন্ড্রয়েড ডিভাইস রম দিয়ে চললেও, কাজগুলোর কমান্ড বা নির্দেশ দেওয়া হয় কার্নেলের মাধ্যমে। আপনি যখন ফোনের স্ক্রিনে টাচ করেন তখন টাচ পয়েন্টের কো-অরডিনেট বা কোথায় টাচ করেছেন সে তথ্য যায় কার্নেলে। কার্নেল তখন সংশ্লিষ্ট এপ্লিকেশনকে টাচ অনুযায়ী কাজ করতে বলে। বুঝতেই পারছেন কার্নেল কত জরুরি। আপগ্রেডেড কার্নেল ব্যবহার করে আপনার ফোনের পারফরম্যান্স বাড়ানো সম্ভব।

৫৷ ব্যাটারি এবং সিপিউ স্পিডঃ

রুট করার পরে যদি কাস্টম রম ইন্সটল করেন তবে আপনার ফোন কিভাবে চালাবেন মানে সিপিউ ইউসেজ কেমন অ্যালাউ করবেন তার কিছু অপশন পাবেন যেমনঃ Governer, Performance ইত্যাদি। এগুলোর মাধ্যমে আপনার ফোনের সর্বোচ্চ স্পিড সর্বনিম্ন ব্যাটারি খরচে পেতে পারেন। এছাড়া ওভারক্লক করে স্পিড বাড়াতে পারেন( ব্যাটারি কনজিউম বেশি করবে) অথবা আন্ডারক্লক করে দিতে পারেন( ব্যাটারির লোয়েস্ট কনজিউম)।

৬৷ বেস ব্যান্ডঃ

বেসব্যান্ড আপনার রেডিও মানে ওয়্যারলেস সেটিংস (ফোন, ওয়াইফাই, রেডিও) নিয়ন্ত্রণ করেন। এটা আপগ্রেড করা মানে বেটার সার্ভিস পাওয়া। যদিও আমাদের নেটওয়ার্ক প্রভাইডারদের যে অবস্থা, তাতে বোধহয় খুব একটা লাভ হবে না।

৭৷ ব্যাকআপ তৈরিঃ

রুট করার সবচাইতে বড় সুবিধা হচ্ছে ব্যাকআপ তৈরি করা। গুগল হয়ত কিছু ব্যাকআপ সুবিধা দেয় কিন্তু সেটা কন্ট্যাক্টস, ক্যালেন্ডার, জি-মেইল পর্যন্তই। রুট করার মাধ্যমে আপনি আপনার ডিভাইসের সফটওয়ারের একটা হুবহু কপি করে রাখতে পারবেন এপ্লিকেশন সেটিংস সহ!! ধরুন রুট করার পর রম আপগ্রেড করবেন বা কাস্টম রম ইন্সটল করতে মন চাইলো। ইন্সটল করার পরে দেখলেন ভালো লাগছে না। তখন? ব্যাকআপ করা থাকলে সেই ফাইলটি ফ্ল্যাশ করুন, আপনার ডিভাইস ঠিক আগের মত অবস্থায় ফিরে যাবে। আপনার মেমোরি কার্ডের ফাইলগুলো পর্যন্ত ফিরে পাবেন একইরকম ভাবে। এজন্য রুট করার পর যা কিছু করার আগে ব্যাকআপ করে নিন।

৮৷ কাস্টম রিকভারীঃ

ফোন অন না হলে বুটলুপে পড়লে পাওয়ার বাটন এবং ভলিউম আপ/ডাউন বাটন চেপে ধরলে একটা মেনু আসে যার নাম রিকভারি মেনু। এটাতে ফোনের সিস্টেম অন না করেই ঢুকা যায়। এখন কাস্টম রিকভারি মানে এই জায়গায় নতুন একটা রিকভারি ইন্সটল করে দেয়া যেগুলোতে সিস্টেম ব্যাক আপ রিস্টোর করা সহ বিভিন্ন সুবিধা থাকে। এর সাহায্যে আপনি ভুলভাল কিছু করেও ফোন ঠিক করে ফেলতে পারবেন। আরো অনেক অনেক কাজ আছে কাস্টম রিকভারির।

৯৷ মেমোরি ম্যানেজমেন্টঃ

রুট করার পর আপনার ফোনের অপ্রয়োজনীয় ফাইল ডিলিট করতে পারবেন, ফোন মেমোরি থেকে স্টক অ্যাপস মেমোরি কার্ডে নিতে পারবেন। আপনার ফোন মেমোরি যত ফাঁকা করতে পারবেন ততই স্পিড বাড়বে। তাই বলে পুরা ফোন মেমোরি ফাঁকা করে দিয়েন না, তাহলে আমাকে গালি দেওয়া লাগবে!!

১০৷ ডেভেলপমেন্টঃ

আপনি যদি একজন এন্ড্রয়েড ডেভেলপার হন বা কাস্টম রম/রিকাভারি বানাতে চান তাহলেও আপনাকে রুট করতে হবে। কাস্টম রম/ রিকভারি স্টক রম/রিকভারির উপর ভিত্তি করেই বানানো হয়। আর স্টক ফাইল এক্সট্রাক্ট করতে আপনার সুপার ইউজার(SuperUser/SU) পারমিশন লাগবে।

ঙ৷ Rooting এর রিস্ক / রুট করার অসুবিধা?

রুটিং এর রয়েছে নানাবিধ ঝামেলা। এক্সপার্টরা সাধারণত রুট করার পরামর্শ দেন না। আপনি যদি না জানেন আপনি কি করছেন তাহলে রুট না করাই ভালো। শুধু ফান করার জন্য যদি রুট করতে চান তাহলে যে বিপদ গুলো হতে পারেঃ

১৷ ব্রিকিং/ ব্রিক ডিভাইসঃ

যদি ভুল রম ইন্সটল করেন যেটা আপনার ফোনের সাথে কম্প্যাটিবল না বা রুট প্রসেসের কোন ধাপ অসাবধানতাবশত ভুল করে ফেললে বা বাংলাদেশে যেটা হতে পারে- মাঝখান দিয়ে কারেন্ট চলে গেলে আপনার ডিভাইসটি ব্রিক হয়ে যেতে পারে। ব্রিক মানে হচ্ছে আক্ষরিক অর্থে যা বোঝায় তাই- ইটা। আপনার সাধের এন্ড্রয়েড ডিভাইসটি একটা দামি ইটের টুকরায় পরিণত হবে। সফট ব্রিক( Soft Brick) হলে তাও আশা আছে, হার্ড ব্রিক(Hard Brick) হলে মুড়ি ভাজেন!

২৷ ওয়ারেন্টি নষ্টঃ

কোন কোম্পানিই চায় না তাদের ডিভাইসটাকে কেউ কাস্টমাইজ করুক। যার কারণে ওয়ারেন্টি থাকাকালীন সময়ে রুট করলে আপনি আপনার ওয়ারেন্টি ভয়েড বা নষ্ট করে ফেলবেন। তবে একবার এক ফোরামে দেখেছিলাম চরম এক ডায়লগঃ “Remember it’s not yours until you voided its warrenty”

৩৷ স্লো স্পিডঃ

যদিও স্পিড বাড়ানোর জন্যই আপনার ফোন আপনি রুট করবেন, কিন্তু ঠিক ভাবে কনফিগার করতে না পারলে আপনার ডিভাইস ফাস্ট না হয়ে উল্টো স্লো হয়ে যাবে।

চ৷ রুট করার পদ্ধতিঃ

একেক ডিভাইস রুট করার পদ্ধতি একেক রকম। স্যামসাং গ্যালাক্সি ওয়াই রুট করার পদ্ধতির সঙ্গে এইচটিসি ওয়ান এক্স রুট করার পদ্ধতির কোনো মিল নেই। এইচটিসি কেন, গ্যালাক্সি ওয়াই-এর সঙ্গে স্যামসাং-এরই অন্য কোনো সেট রুট করার পদ্ধতি এক নয়।

এছাড়াও একই ডিভাইস রুট করার একাধিক পদ্ধতিও রয়েছে। আবার একটি পদ্ধতি দিয়ে একাধিক ডিভাইস রুট করা যায়।

ছ। শেষ কথাঃ

রুটের বিষয়টি এতোটাই জটিল ও বিস্তৃত যে, রাতারাতিই এ নিয়ে সব লিখে ফেলা যায় না। আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে, নিজেদের হাতে সেট না থাকলে রুট করার পদ্ধতি নিয়ে টিউটোরিয়াল লেখাও যায় না। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিভিন্ন সময় আমাদের হাতে আসা ও পরিচিতদের ডিভাইস রুট করার পদ্ধতি নিয়ে বিভিন্ন সময় পোস্ট প্রকাশ করবো ইনশাআল্লাহ৷ ধন্যবাদ৷

সুত্রঃ সংগৃহীত ও পরিমার্জিত৷

5 মন্তব্য

Leave a Reply