টিআইবিঃ আসসালামু আলাইকুম। বন্ধুরা কেমন আছেন? আশা করি আল্লাহর রহমতে সবাই ভাল আছেন। সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের রুচিরও পরিবর্তিত হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাল মিলিয়ে পডকাস্ট এখন বাংলাদেশেও অনেক বেশি জনপ্রিয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, আমেরিকায় প্রায় ৬৭ মিলিয়ন মানুষ প্রতি মাসেই পডকাস্ট শোনেন। পডকাস্ট কি, কেন এর পডকাস্টের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে তা অনেকেই জানলেও যারা জানেন না তাদের জন্য আজকের এই পোস্ট।

পডকাস্ট কি?

Podcast দুটি শব্দ থেকে থেকে তৈরি। অ্যাপলের জনপ্রিয় পোর্টেবল মিউজিক ডিভাইস “iPod” থেকে “পড” এবং “Broadcast” থেকে “কাস্ট”। এই দুটো মিলিয়ে তৈরি হয়েছে “Podcast বা পডকাস্ট।” ২০০৪ সালে ব্রিটিশ তথ্য প্রযুক্তিবিদ, সাংবাদিক, লেখক এবং ব্রডকাস্টার বেন হ্যামার্সলি (Ben Hammersley) গার্ডিয়ান পত্রিকার একটি আর্টিকেলে প্রথম “পডকাস্ট” শব্দটির ব্যবহার করেন।

পডকাস্ট হল এক ধরনের অডিও শো বা সিরিজ যা মোবাইল বা কম্পিউটার ডিভাইসে ধারণ করে যেকোন সময় বা যেকোন পরিস্থিতিতে শোনা যায়। তাই পডকাস্ট ফাইলগুলো ফেসবুক এবং ইউটিউবেও আপলোড করা যায়।

অন্যভাবে বলা যায়, ধরুন আপনি ডিজিটাল মার্কেটার। ডিজিটাল মার্কেটিং সম্পর্কে আপনার নলেজ খুব ভাল। এখন আপনি চাচ্ছেন আপনার এই নলেজ অনলাইনে আপনার যে ভিজিটর/ফলোয়ার/স্রোতা আছে তাদের সাথে শেয়ার করবেন।পডকাস্ট আপনাকে এই শেয়ার করার খুব সুন্দর একটি ডিজিটাল মাধ্যম হিসেবে ভূমিকা রাখবে।

অর্থাৎ পডকাস্ট এমন একটি মাধ্যম যার মাধ্যমে আপনি আপনার স্রোতাদের সাথে অডিও ভয়েসের মাধ্যমে কানেক্টিবিটি বাড়াতে পারেন।

পডকাস্ট একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের উপরে তৈরি করা হয়। একটি বিষয়ের উপরে সিরিজ আকারে অনেকগুলো পডকাস্ট তৈরি করা হয়। পডকাস্টের বাঁধা শ্রোতা আছেন। তারা নিয়মিত শোনেন এবং সাবস্ক্রাইব করেন। বিষয় ভিত্তিতে এই শ্রোতার সংখ্যা বেশি অথবা কম হতে পারে।

আগে বিনোদন বা নিউজ পাওয়ার জন্য রেডিও ছিল অন্যতম একটি মাধ্যম কিন্তু বর্তমানে তথ্য-প্রযুক্তির উদ্ভাবনে রেডিওর স্থলে পডকাস্টের উত্থান বেশ আশাব্যঞ্জক। রেডিও প্রোগ্রামের জন্য একটি নির্দিষ্ট স্টুডিও ও একটি টিমওয়ার্কের প্রয়োজন ছিল কিন্তু পডকাস্টের জন্য আপনি চাইলে আপনার ব্যক্তিগত কক্ষকেই স্টুডিও হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। আপনি চাইলে তা একাকী করতে পারেন অথবা কয়েকজনের টিমওয়ার্কেও করতে পারেন।

ই-লার্নিং এবং সাহিত্যের প্রসারে পডকাস্ট সবচেয়ে বেশি কার্যকরি ভূমিকা রাখবে। পডকাস্ট তৈরি করার জন্য আপনাকে অডিও, ভিডিও এডিটিং, অডিও মিক্সিংসহ বিভিন্ন ডিজিটাল মিডিয়া ম্যানুপুলেশনের উপর দক্ষতা থাকতে হবে।

পডকাস্ট এর সুবিধাঃ

পডকাস্ট এর প্রধান সুবিধা হল এটা সংক্ষিপ্ত ও সহজ এবং পডকাস্ট ব্যবহারকারীরা ভ্রমণে বা বাসায় কোন কাজ করতে করতে নিজের পছন্দের বিষয় সম্পর্কে শুনতে পারে। বর্তমান সময়ে ইন্টারনেটে কোনো কিছু পড়ার থেকে এই পডকাস্ট বেশি জনপ্রিয়। খুব সহজেই অল্প সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় বিষয় সম্পর্কে জেনে নেওয়া যায় পডকাস্টের মাধ্যমে।

পডকাস্টের অপর একটি সুবিধা হল যেকোনো জায়গায় যেকোনো পরিস্থিতিতে পডকাস্টের মাধ্যমে প্রোগ্রাম তৈরি করতে বা শ্রবণ করতে পারবেন। এই সুবিধাটিই রেডিও প্রযুক্তি থেকে পডকাস্টকে পৃথক এবং অনন্য করেছে। পডকাস্টকে আপনি বিনোদন কিংবা শিক্ষামূলক যেকোনো মাধ্যমেই কাজে লাগাতে পারবেন। যেকোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর সিরিজ আকারে প্রোগ্রাম প্রচার করতে পারবেন।

আপনার ব্যক্তিত্বকে অডিয়েন্সের কাছে তুলে ধরার জন্য পডকাস্টই সেরা মাধ্যম হতে পারে। এছাড়াও মত প্রকাশের খুব স্বাধীন একটি মাধ্যম হচ্ছে পডকাস্ট যেখানে কন্টেন্ট প্রচারের জন্য আপনি সর্বোচ্চ স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারবেন। পডকাস্টের মাধ্যমে আপনি যা ইচ্ছে তাই শুনাতে পারেন এবং যা শুনতে চান তাই শুনতে পারেন মানে উভয়ের জন্য রয়েছে অফুরন্ত স্বাধীনতা।

কেন পডকাস্টের জনপ্রিয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে?

মানুষ প্রতিনিয়ত বিভিন্ন কাজ নিয়ে ব্যাস্ত থাকে। তাই সময় বের করে টিভি চ্যানেল দেখা বা রেডিও শোনা অনেক সময় ইচ্ছা থাকলেও করা হয় না। পডকাস্ট শুনতে কোন অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন হয় না। যে কোন কাজ করার পাশাপাশি করা যায়। যে কোন ধরনের ডিভাইস থেকে খুব সহজে পডকাস্ট শোনা যায়। এটি শোনার জন্য নির্দিষ্ট কোন সময়ের প্রয়োজন হয় না।

রেডিওতে কোন অনুষ্ঠান যেমন নির্দিষ্ট সময়ে হয়। তাই রেডিও শুনতে হলে সেই সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। সেখানে পডকাস্ট যে কোন সময় ইচ্ছা মত শোনা যায়। আবার ডাউনলোড করে রাখলে নিজের যখন শুনতে ইচ্ছা হবে তখন শোনা যাবে। তাই পডকাস্ট দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

২০১৭ সালের জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি মাসে এডিসন রিসার্চ The Podcast Consumer 2017 শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। গত বছরের জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের ১২ বছর এবং তদুর্ধ্ব বয়সের ২০০০ লোকের উপরে টেলিফোনের মাধ্যমে একটি জরিপ পরিচালনা করে। এই জরিপে যেসব বিষয়গুলো উঠে আসে তা হলো-

  • প্রতি বছরে মাসিক পডকাস্ট শ্রোতার সংখ্যা ২১% থেকে ২৪% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
  • পডকাস্ট শ্রোতাদের বেশির ভাগ ১৮-৫৪ বছর বয়সী এবং মেয়েদের তুলনায় ছেলে শ্রোতার সংখ্যা একটু বেশি।
  • পডকাস্ট শ্রোতারা শিক্ষিত ও স্বচ্ছল পরিবারের সদস্য। তারা বিজ্ঞাপন-বিহীন বা অল্প বিজ্ঞাপন দেয়া হয় এমন ধরণের পডকাস্ট বেশি শোনেন।
  • জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৬০% বলেন যে তারা পডকাস্ট কি তা জানেন এবং ৪০% পডকাস্ট শুনেছেন।

২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পডকাস্টে ৪৩ মিলিয়ন ডলারের বিজ্ঞাপন আসে। ২০১৫ সালে এটি বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১৩৩ মিলিয়ন ডলার, ২০১৬ সালে ১৬৭ মিলিয়ন ডলার এবং ২০১৭ সালে ২০৭ মিলিয়ন ডলার। ধারণা করা হচ্ছে এ বছরে পডকাস্টে ২৫৬ মিলিয়ন ডলারের বিজ্ঞাপন আসবে।

এক সময় টিভি চ্যানেল ছিল ভিডিও দেখার এক মাত্র মাধ্যম। কিন্তু ইউটিউবসহ বিভিন্ন ভিডিও শেয়ারিং সাইট যেমন টিভি চ্যানেলের জায়গা দখল করে নিয়েছে। ঠিক তেমনি পডকাস্ট রেডিও এর জায়গা দখল করতে চলেছে।

ছোট একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিস্কার হবে। আজ টিভিতে খুব ভাল একটি ছবি হচ্ছে। ছবিটি দেখতে খুবই মন চাচ্ছে। কিন্তু উপায় নেই ঠিক এই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকায় ছবিটি দেখতে পারছি না। তাই বলে মন খারাপ হওয়ার কোন কারণ নেই। কারন আমি সময় পেলে ইউটিউব থেকে যে কোন সময় মুভিটি দেখে নিতে পারব।

পডকাস্ট এর ক্ষেত্রেও ঠিক একই রকম। একসময় বিজ্ঞাপনের জন্য শুধু টিভি চ্যানেল এর উপর নির্ভর করত বিজ্ঞাপন দাতারা। কিন্তু এখন টিভি চ্যানেল থেকে ইউটিউব, বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয় সাইট গুলোরতে বিজ্ঞাপনের হার অনেক বেশি। সব কোম্পানি তাদের পণ্যের ডিজিটাল মার্কেটিং করে থাকে।

পডকাস্ট সাইট খুবই জনপ্রিয় হলে বিজ্ঞাপন দাতারা বিজ্ঞাপন দিবে। বর্তমানে ই-কমার্স ব্যবসার খুব রমারমা অবস্থা। ই-কমার্স ব‍্যবসায়ীরা পণ্য সেল করার জন্য অ্যাফিলিয়েট কমিশান দিয়ে থাকে। ওয়েবসাইট, সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউব এর মাধ্যমে পণ‍্যের প্রচার করে ক্রেতাকে পণ্য কিনতে আগ্রহী করে। সামনে দিন আসছে ই-কমার্স ব্যবসায়ীরা পডকাস্ট এর মাধ্যমে তাদের পণ‍্য আকর্ষণীয় ভাবে ক্রেতার নিকট উপস্থাপন করবে। তাই পডকাস্ট এর দিকে নজর দেওয়ার সময় এসে গেছে। এটি একদিন বিলিয়ন ডলারের ইন্ডাস্ট্রি হবে।

কার্টেসিঃ ডিজিটাল স্কিল ফর বাংলাদেশ।

১টি মন্তব্য

Leave a Reply