গ্রাফিক্স কার্ড কি? গ্রাফিক্স কার্ড কেনার আগে যে বিষয়গুলো আপনাকে জানতে হবে

0
290

টিআইবিঃ কম্পিউটারে গেম খেলা বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বিশেষ করে কিশোর ও তরুনদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি। বড়দেরও নিয়মিত খেলতে দেখা যায়। অনেকের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে কম্পিউটার গেম। আর কম্পিউটারে উন্নত গ্রাফিক্সের গেম খেলতে হলে দরকার গ্রাফিক্স কার্ড। গ্রাফিক্স কার্ড ছাড়া ভালো মানের গেমগুলো খেলা সম্ভব হয় না। তাই গেমারদের জন্য জরুরি একটি পণ্য হলো গ্রাফিক্স কার্ড।

গ্রাফিক্স কার্ড কি?

গ্রাফিক্স কার্ড হল মাদারবোর্ড এর সাথে সংযুক্ত এমন একটি ডিভাইস যা কম্পিউটার এর ভিডিও প্রসেস করে এবং আপনার কম্পিউটারের ভিডিও প্রসেসর এর দায়িত্ব অনেকটা কমিয়ে নেয়। কম্পিউটার দ্রুত সকল কাজ সম্পন্ন করতে পারে। গ্রাফিক্স কার্ডকে আমরা অনেকেই ভিডিও কার্ড, ভিডিও অ্যাডাপ্টার, গ্রাফিক্স এক্সেলেরেটর কার্ড, ডিসপ্লে অ্যাডাপ্টার ইত্যাদি নামে চিনি।

আপনি যদি সাধারন কাজ করার জন্য কম্পিউটার কিনে থাকেন যেমন, ওয়েব ব্রাউজিং, মুভি দেখা, মাইক্রোসফট অফিস, ছোট খাটো গেম খেলা। তাহলে আপনার গ্রাফিক্স কার্ড লাগবে না। কারণ এখন প্রায় সব কম্পিউটারেই বিল্ট ইন গ্রাফিক্স দেয়া থাকে যা দিয়ে আপনি কাজ চালিয়ে নিতে পারবেন।

কিন্তু যদি ভিডিও এডিটিং, হাই কোয়ালিটি ইমেজ এডিটিং, কিংবা লেটেস্ট হাই ডেফিনেশন গেমস এর স্বাদ নিতে চান তাহলে আপনাকে একটি গ্রাফিক্স কার্ড কিনতে হবে।

গ্রাফিক্স কার্ড কেনার আগে যে বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন?

গ্রাফিক্স কার্ড কেনার আগে যে বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন নীচে সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হল-

মডেল নাম্বার:
একটি গ্রাফিক্স কার্ডের পারফর্মেন্সের ব্যাপারে অনেকটাই আঁচ করা যায় এর মডেল নাম্বার থেকে। যা গ্রাফিক্স প্রসেসর ইউনিট (জিপিইউ), ক্লক রেইট আর মেমোরির ধারণক্ষমতার সমন্বয় নির্দেশ করে।

গ্রাফিক্স কার্ডের মডেল নাম্বারের ফরম্যাট হচ্ছে ব্র্যান্ডের নামের পর মডেল নাম্বার লেখা থাকে। উন্নত গেইমিং পারফর্মেন্সের জন্য বাজেটের মধ্যে যতটা সম্ভব নতুন মডেল বেছে নেওয়া ভালো।

মেমোরির চেয়ে ব্যান্ডউইথ বেশি গুরুত্বপূর্ণ:
গেইমারদের মধ্যে একটি ভুল অনেক বেশি দেখা যায়, পারফর্মেন্স বাড়াতে বেশি র‌্যাম চান তারা। এখানে মনে রাখতে হবে একই ক্লকরেটে ডিডিআর৩ র‌্যামের থেকে দ্বিগুণ ব্যান্ডউইথ দিয়ে থাকে ডিডিআর৫ র‌্যাম। সোজা কথায় বললে গ্রাফিক্স কার্ডের জন্য ৪ জিবি ডিডিআর৩ র‌্যামের থেকে ১ জিবি ডিডিআর ৫ র‌্যামই শ্রেয়।

মাথায় রাখতে হবে প্ল্যাটফরমের কথা:
যদিও গেইমিং পিসির ক্ষেত্রে গ্রাফিক্স কার্ড সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হার্ডওয়্যার, কিন্তু কম্পিউটারের অন্যান্য বিষয়গুলোও মাথায় রাখতে হবে। কারও কম্পিউটারে যদি সেলেরন, পেন্টিয়াম, সেম্পরন বা অ্যাথলন এক্স২-এর মতো পুরনো মডেলের ডুয়েল কোর প্রসেসর ব্যবহার করা হয়, তবে ওই কম্পিউটারের জন্য বেশি দামের গ্রাফিক্স কার্ড কেনা হবে অর্থের অপচয়। এক্ষেত্রে মধ্যম মানের গ্রাফিক্স কার্ড কেনাটাই সঠিক সিদ্ধান্ত হবে।

প্রসেসরের সঙ্গে ডিসপ্লে নিয়েও ভাবতে হবে। পুরনো মডেলের ১২৮০x১০২৪ মনিটরের জন্য দামী গ্রাফিক্স কার্ড কিনে লাভ নেই। অন্যদিকে, কেউ যদি তিনটি ১৯২০x১০৮০ মনিটর ব্যবহার করে থাকেন, তবে তার উচিত উন্নত মানের গ্রাফিক্স কার্ড বেছে নেওয়া।

সবসময় একের চেয়ে জোড়া ভালো নয়:
একসঙ্গে দুই গ্রাফিক্স কার্ড লাগালে কার্ডের পারফর্মেন্স দ্বিগুণ হবে না। বড়জোর ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। একাধিক কার্ড একসঙ্গে ব্যবহারের নানা ঝামেলাও আছে। জুড়ে দেওয়া দুই গ্রাফিক্স কার্ডের সম্পূর্ণ কার্যক্ষমতা নিশ্চিত করাও কঠিন কাজ। বিদ্যুৎ খরচ আর যান্ত্রিক জটিলতার আশঙ্কাও বাড়ে। সব মিলিয়ে ৪কে ডিসপ্লের তিন মনিটর নিয়ে খেলতে বসলে সেক্ষেত্রে একাধিক জিপিইউ কাজে আসবে। অন্যথায় একটি গ্রাফিক্স কার্ড থেকেই সব চাহিদা মেটান সম্ভব।

কেইসিং:
গ্রাফিক্স কার্ড কেনার আগে অবশ্যই কেসিংয়ের জায়গা দেখে নিতে হবে। শখ করে কেনা গ্রাফিক্স কার্ডটি লাগানোর যদি জায়গা না থাকে কেইসিংয়ে তখন ‘নিজের চুল ছেড়া’ ছাড়া আর কোনো গতি নেই বললেই চলে। সেই সঙ্গে রাখতে হবে একটি ভালো পাওয়ার সাপ্লাই। মন মতো গ্রাফিক্স কার্ডের পারফর্মেন্স পেতে হলে, কার্ডের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহের সামর্থ্য রয়েছে এমন পাওয়ার সাপ্লাই বেছে নিতে হবে।

কুলিং সিস্টেম:
উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন গ্রাফিক্স কার্ড অনেক বেশি শক্তি ব্যবহার করে থাকে। এর অনেক বেশি তাপ উৎপন্ন হয়। একটি ভালো কুলার না থাকলে যে কোনো সময় গ্রাফিক্স কার্ড পুড়ে যেতে পারে।

বাজারে সাধারণত দুই ধরনের কুলার পাওয়া যায়- রেফারেন্স আর আফটারমার্কেট। রেফারেন্স কুলার কম খরচের জন্য ভালো পছন্দ। এটি কম্পিউটারের কেইসের পেছন দিয়ে গরম হাওয়া বের করে দেয়। কিন্তু, এই কুলারগুলো একটু অতিরিক্ত আওয়াজ সৃষ্টি করে।

একটু বেশি খরচ করলে উচ্চ-ক্ষমতার কুলারযুক্ত গ্রাফিক্স কার্ড কেনা যাবে। এক্ষেত্রে, আসুসের ডিরেক্টসিইউ, ইভিজিএ-এর এসিএক্স, গিগাবাইটের উইন্ডফোর্স, এইচআইএসের আইসকিউ, স্যাফায়ারের ডুয়েল-এক্সের মতো গ্রাফিক্স কার্ড কেনা যেতে পারে।

ট্রানজিস্টর সংখ্যা:
কার্ডে যত বেশি ট্রানজিস্টর থাকবে, নয়েজ তত কম হবে, ভিডিও তত বেশি ভালোভাবে ফিল্টার হবে।

ক্লক স্পীড:
এটা যত ভালো এবং বেশি হবে তত ভাল পারফরমেন্স পাবেন। এটার দিকে নজর দিন।

মেমোরি:
এটাও আগে আলোচনা করেছি। এখন ১ জিবি থেকে ৪ জিবি পর্যন্ত কার্ড পাওয়া যাচ্ছে। আপনার কাজের ধরন অনুযায়ী দেখুন কোনটা লাগে।

মেমোরি টাইপ:
DDR, DDR2, GDDR3, GDDR4, নাকি GDDR5 তা দেখে নিন। যত ভালো হবে, তত ভালো পারফরমেন্স পাবেন। অবশ্য GDDR5 এর দাম একটু বেশি। জেনে রাখুন যে আপনার মাদারবোর্ড এর র‍্যাম DDR2 না DDR3 তার সাথে এটার কোন সম্পর্ক নেই।

বাস স্পীড:
মেমরি বাস হল প্রসেসরটি একবারে কতটুকু ডাটা নিয়ে কাজ করে। বাস বেশি হলে খুব দ্রুত আউটপুট পাবেন। আবার বাস খুব বেশি হলে পাওয়ার খরচ তো বেশি হবেই, তার উপর আপনার মনিটর ছোট হলে বাস অব্যাবহৃত থাকবে।

পিসিআই ভার্সন:
আপনার মাদারবোর্ড এর স্লট কোনটি তা দেখে কিনবেন। ধরুন আপনার PCIe x8, কিন্তু আপনি PCIe x16 2.0 কিনে আনলেন। তাহলে সেটা কাউকে দিয়ে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

ডিরেক্ট এক্স সাপোর্ট:
ডিরেক্ট এক্স হল মাইক্রোসফট এর অনন্য সংযোজন। নতুন নতুন হার্ডওয়্যার, ভিডিও এক্সিলারেশানের জন্য এটি অপরিহার্য। এর নতুন ভার্সন ১১। তাই গ্রাফিক্স কার্ড নতুন ভার্সন এর ডিরেক্ট এক্স সাপোর্ট করে কিনা দেখে নিন।

পিক্সেল শেডার:
ভিন্ন মাত্রার পিক্সেল এবং আলোর তুলনামূলক প্রসেসিং এবং বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে পিক্সেল শেডার প্রয়োজন। আপনার গ্রাফিক্স কার্ড কত সাপোর্ট করে তা দেখে নিবেন। বর্তমানে এর ৫ ভার্সন রয়েছে।

ওপেন জি-এল:
এটি হল ভিডিও প্রসেসিং-র জন্য অসংখ্য লাইব্রেরি ফাংশনের সমাহার, যেটা আউটপুটকে আরো দ্রুততর করে। কেনার সময় এটা সাপোর্ট করে কিনা এবং কত ভার্সন তা দেখে নিবেন।

অ্যান্টি-অ্যালাইজিং:
এটা ব্যবহার করে ছবির ফেটে যাওয়া বা ঘোলাটে ভাব দূর করা যায়। বিভিন্ন গেম ও অ্যাপ এ এটা খুবই ব্যাবহৃত হয়। তাই এই ফিচার আছে কিনা দেখে নিন।

ম্যাক্স আউটপুট:
আপনার মনিটর যদি ১৬০০ বাই ১২০০ রেজোলিউশানের হয় তাহলে নিশ্চয়ই ১০২৪ বাই ৭৬৮ আউটপুটের গ্রাফিক্স কিনবেন না। বর্তমানে সব কার্ডের আউটপুট ১৬০০ বাই ১২০০ থেকে ২৫৬০ বাই ১৬০০ এর মাঝে। তাই এটা আপাতত অত ভাবনার বিষয় না।

পাওয়ার ফ্যাক্টর:
কার্ডটি কত ওয়াট সাপ্লাই চায় তা দেখুন। প্রয়োজনীয় পাওয়ার দিতে না পারলে কাজ করতে যেয়ে আটকে যাবে। ক্ষতিও হতে পারে। সাধারনত ৪০০ থেকে ৮০০ ওয়াট সাপ্লাই দরকার। লাগলে আপনার পিএসইউ আপডেট করুন।

মাল্টি আউটপুট:
আপনি যদি একসাথে দুই বা ততোধিক মনিটরে দেখতে চান তাহলে এটা আপনার দরকার। খেয়াল করে দেখবেন যে প্রায় সব কার্ডেই দুই বা তিনের বেশি পোর্ট থাকে। এগুলো দেওয়া হয় যেন একই সাথে সকল মনিটরে দেখা সম্ভব হয়।

রিফ্রেশ রেট:
আউটপুট কত রেটে পাবেন, অর্থাৎ মনিটরে কত হার্টজে ভিডিও আসবে তা দেখে নিন। এর ডিফল্ট মান ৬০। তবে সিআরটি মনিটরে ৬০ এর নিচে দাগ বা ফ্লিকিং দেখা যায়। কিছু মনিটর ৭৫ হার্টজ এর নিচে দেখাতে সক্ষম না। তাই আপনার মনিটর এর জন্য কোনটা দরকার তা দেখে নিবেন।

মাল্টি-জিপিইউ:
এটা ডাই-হার্ড গেমারদের জন্য। যদি একটা ভিডিও কার্ড নিয়ে আপনার মন না ভরে তাহলে একের বেশি কার্ড লাগানো সম্ভব এরকম কার্ড কিনুন। আর সেই সাথে মাল্টি-জিপিইউ সাপোর্ট করে এরকম মাদারবোর্ডও কিনতে হবে আপনাকে। এনভিডিয়া আর এএমডি দুটাই মাল্টি-জিপিইউ সিস্টেম সাপোর্টেড চিপ তৈরী করে।

এনার্জি সেভিং:
আপনার চিপটি কাজের পাশাপাশি দূর্ণীতি করে আপনার বিদ্যুৎ বিল উঠাচ্ছে কিনা তার দিকে খেয়াল রাখবেন। এই জন্য এনার্জি স্টারের রেটিং দেখে কার্ড কিনুন।

সফটওয়্যার সাপোর্ট:
আপনি যে সিস্টেম এ কাজ করেন সেই সিস্টেমে কার্ড এর ড্রাইভার পাবেন কিনা তা দেখে নিন। এখন এএমডি উইন্ডোজ, লিনাক্স আর ম্যাকের জন্য অফিসিয়ালি ড্রাইভার দিচ্ছে। তাই পছন্দ আপনার।

এই হল গ্রাফিক্স কার্ড কেনার আগে বিবেচ্য বিষয় সমূহ। আশা করি পোস্টটি আপনাদের ভালো লেগেছে।

Leave a Reply