গরিলা গ্লাস কি? জেনে নিন গরিলা গ্লাসের পেছনের গল্প এবং কর্মপদ্ধতি?

0
352

টেকনো ইনফোঃ আসসালামু আলাইকুম। টেকনো ইনফো বিডিতে আপনাদেরকে স্বাগতম। আশা করি সবাই ভালো আছেন। তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে বদলে যাচ্ছে আমাদের মুঠোফোনগুলো। স্মার্টফোনের প্রসেসর গুলো আগের থেকে আরো এবং আরো বেশি ফাস্ট হচ্ছে, ক্যামেরা টেকনোলোজিতে আনা হয়েছে অস্বাভাবিক পরিবর্তন, ডিভাইজ গুলো ডিসপ্লে দিনের পর দিন আরো বেশি চকচকে ও স্পন্দনশীল হয়ে উঠছে!

আজকের প্রত্যেকটি মডার্ন ডিভাইজে গরিলা গ্লাসকে প্রোটেকশন হিসেবে ব্যবহার করা হয়, সেটা হোক কম্পিউটার স্ক্রীন, স্মার্টফোন স্ক্রীন, বা আলাদা যেকোনো গাজেটের স্ক্রীন।— কিন্তু কি রয়েছে এই গরিলা গ্লাসে? কেন এটি এতো শক্তিশালী? কেন গরিলা গ্লাস ব্যবহার না করে আলাদা টাইপের প্লাস ব্যবহার করা হয় না? বা কিভাবেই এই শক্তিশালী প্লাসটি কাজ করে?— যদি এই প্রশ্ন গুলো এতোদিন আপনাকে জ্বালিয়ে থাকে তো এই আর্টিকেলই সকল জ্বলনের অবসান হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে।

গরিলা গ্লাস কি?

গরিলা একটি স্পেশাল টাইপের প্লাস বা কাচ যা করনিং আইএনসি (Corning Inc) কোম্পানি দ্বারা প্রস্তুতকৃত এবং যেটাকে বিশেষ করে স্মার্ট ডিভাইজ গুলো, যেমন ল্যাপটপ, মনিটর, স্মার্টফোন, টিভি ইত্যাদির স্ক্রীন প্রটেক্ট করার জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

অন্যভাবে বলা যায়, গরিলা গ্লাস এমন একটি বিশেষ ধরণের গ্লাস যা সহজে ভাঙ্গে না, যাতে সহজে দাগ পড়ে না এবং যা টাচ স্ক্রিণের জন্যে সবচেয়ে বেশি উপযোগী। স্মার্টফোন, ট্যাবলেটসহ যাবতীয় টাচস্ক্রিন ডিভাইসকে দাগ পড়া থেকে বাঁচাতে, সামান্য আঘাতে ভেঙ্গে যাওয়া বা ফেটে যাওয়া থেকে প্রতিরোধ করতে গরিলা গ্লাস তৈরি করা হয়।

গরিলা নামের একটি বন্য প্রাণী রয়েছে যার গায়ের চামড়া ও শরীর ভীষণ শক্ত। সামান্য আঘাতে যার গায়ে তেমন কোন প্রভাব পড়ে না। মূলত, এই শক্তিশালী প্রাণীটির নামের সাথে মিল রেখেই টাচস্ক্রিন ডিভাইসগুলোর ডিসপ্লে গ্লাসের নাম দেয়া হয় গরিলা।

গরিলা গ্লাস কি দিয়ে তৈরি?

গরিলা গ্লাস মূলত আলকালি-অ্যালুমিনোসিলিকেট নামের এক ধরণের ম্যাটেরিয়্যাল, যা অ্যালুমিনিয়াম, সিলিকন আর অক্সিজেনের সমন্বয়ে তৈরি। এই ম্যাটেরিয়্যাল প্রকৃতিতে পাওয়া যায় না আর এটি তৈরি করা হয়েছে যে কোন গ্লাসকে, বিশেষ করে স্মার্টফোন আর ট্যাবলেটের স্ক্রিনকে শক্ত, মজবুত আর মসৃণ করার জন্য।

গরিলা গ্লাসের প্রধান উপাদান আলকালি-অ্যালুমিনোসিলিকেট মূলত গ্লাসের একটি শিট। এটি প্রাথমিক পর্যায়ে পোর্টেবল ইলেকট্রোনিক্স ডিভাইসের কাভারের জন্যে তৈরি হলেও, বর্তমানে বহুবিধ কাজে ব্যবহার করা হয়।

গরিলা গ্লাস তৈরির পেছনের গল্প

অনেক সায়েন্স ফিকশন মুভিতে দেখে থাকবেন, ভুল সায়েন্স এক্সপেরিমেন্ট থেকে সুপার হিরো তৈরি হয়ে যায়, গরিলা গ্লাসের ইতিহাস অনেকটা একই রকমের।

১৯৫২ সালের দিকে, করনিং কোম্পানির এক বিজ্ঞানী ডন স্টোকি এক টুকরা ফটোসেন্সিটিভ প্লাসকে পরীক্ষা চালানোর জন্য চুল্লিতে রেখে দেয়, একসময় চুল্লির তাপমাত্রা ৬০০ ডিগ্রী সেলসিয়াস থেকে ৯০০ ডিগ্রী সেলসিয়াসে উঠে যায়, ডন স্টোকি এতে আশা করেন টেস্টিং স্যাম্পলটি হয়তো ব্যর্থ হয়ে গিয়েছে কিন্তু তিনি লক্ষ্য করলেন আশ্চর্যজনকভাবে এটি সম্পূর্ণ আলাদা টাইপের একটি মেটালে পরিণত হয়েছে, এরপরে নমুনাটি হঠাৎ করে পরে যায়, আর পরে যাওয়ার পরে কাচটি ভেঙ্গে আলাদা না হয়ে গিয়ে মেঝে থেকে লাফিয়ে উপরে উঠে আসে।

ডন স্টোকি আবিস্কার করে ফেললেন পৃথিবীর প্রথম সিনথেটিক গ্লাস-সিরামিক, যার নাম পাইরোসিরাম। এটি অ্যালুমিনিয়াম থেকে হালকা, হাই-কার্বণ স্টিল থেকে শক্ত এবং সাধারণ সোডা-লাইম গ্লাস থেকে অনেক গুণ শক্তিশালী।

পরবর্তীতে পাইরোসিরাম থেকে আলকালি-অ্যালুমিনোসিলিকেট, আর এটি থেকে গোরিলা গ্লাস তৈরি করে কর্নিং ইনকর্পোরেশন। আইফোন দিয়ে শুরু হলেও এই গ্লাসটি এখন প্রায় ৮৫ ভাগ স্মার্টফোনেই ব্যবহার করা হয়।

গরিলা প্লাসের ইতিহাস

তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে গরিলা প্লাসের অনেক পরিবর্তন আনা হয়েছে আর বর্তমানে এটি আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। কর্নিং ইনকর্পোরেশন প্রথম গরিলা গ্লাস তৈরি করে ২০০৫ সালে। আর এটি প্রথম আইফোনের স্ক্রিনে ব্যবহার করা হয় ২০০৭ সালে এবং পরে ২০১২, ২০১৩, এবং ২০১৪ সালে এর টেকনোলোজিতে অনেক উন্নতি আনা হয় (যথাক্রমেঃ দ্বিতীয়, তৃতীয়, এবং চতুর্থ জেনারেশন প্লাস তৈরি করা হয়)। ২০১৬ সালের জুলাই মাসের দিকে এই প্লাসের ৫ম জেনারেশন রিলিজ করা হয়। যা আগের ৪ জেনারেশন থেকে অনেক বেশি কার্য্যকরী ও উপকারী।

তবে, প্রথম জেনারেশন মানে স্মার্টফোনে প্রথম গোরিলা গ্লাস ব্যবহারের পেছনেও রয়েছে আরেকটি গল্প, ঠিক গল্প নয়, অনেকটা ইতিহাস বলতে পারেন।

আইফোনে তখন প্লাস্টিকের গ্লাস ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এর স্থায়িত্ব ও স্ক্রেচ পড়া নিয়ে আইফোনের ডেভেলপার টিম দারুণ দুশ্চিন্তায় দিন পার করছিল। সবকিছু ঠিক আছে, শুধু ডিসপ্লেতে ব্যবহৃত গ্লাসের মানোন্নয়ের চিন্তা পেয়ে বসে তাদের।

এর মাঝে একদিন আইফোনের এক কর্মকর্তা নিউ ইয়র্ক টাইমস্ এ কর্নিং ইনকর্পোরেশনের গরিলা গ্লাস আবিস্কারের ঘটনাটি পড়লেন। সঙ্গে সঙ্গে এই ধরণের গ্লাস আইফোনের ডিসপ্লেতে ব্যবহারের কথা তাঁর মাথায় এলো। অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা শেষে সবাই মিলে কোম্পানীর চিপ এক্সিকিউটিভ অফিসার স্টিভ জবস্ এর কাছে গেলেন।

পরদিনই স্টিভ জবস্ নিজে কর্নিং ইনকর্পোরেশনের চেয়ারম্যানকে মেইল করলেন। আইফোন রিলিজ দেয়ার সময় যে দোর গোড়ায় এসে গড়াগড়ি খাচ্ছে, সেটাও তিনি মেইলে উল্লেখ করলেন। বিশ্ব বিখ্যাত কোম্পানী অ্যাপলের সিইও’র মেইল পেয়ে কর্নিং ইনকর্পোরেশনের কর্মকর্তারা যারপরনাই খুশি হলেও, চিন্তায় পড়লেন সময় নিয়ে। এত অল্প সময়ে কিভাবে কাজটি শেষ করবেন!

কিন্তু এমন লোভনীয় অফার হাত ছাড়া করতে রাজী নন কর্নিং ইনকর্পোরেশন। তাই, তারা রিস্কটি নিলেন এবং ‘প্রজেক্ট গরিলা গ্লাস’ নাম দিয়ে অ্যাপলের কাজটি হাতে নিলেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের ভেতরেই প্রজেক্টটি সফলভাবে শেষ করে ফেললেন। ব্যস, সেই থেকেই শুরু হল, স্মার্টফোনে গরিলা গ্লাস ব্যবহারের প্রচলন।

গরিলা গ্লাস কিভাবে কাজ করে?

গরিলা গ্লাসের সিক্রেট হলো এর কেমিকেল প্রসেস যাকে আইওএন পরিবর্তণ বলে। আইওএন মূলত একটা অ্যাটম যা হয় একটা ইলেকট্রনকে ধরবে অথবা নষ্ট করবে যা নেট চার্জ বহন করে থাকে। ইলেকট্রন আবার সাব-অ্যাটোমিক এর নেগেটিভ পারটিকল। একটা আইওএন নেট চার্জ তখনই পজিটিভ হয় যখন এটা একটা এক্সর্টা ইলেকট্রন পায়। আর এটি তখনই পজিটিভ হয় যখন একটি ইলেকট্রন হারায়।

অ্যাটোমিক ইলেকট্রনগুলোর নিউরাল চার্জ থাকে। কারণ, ইলেকট্রনগুলো প্রোটনগুলোর সাথে মিশে গিয়ে পজিটিভ চার্জ তৈরি করে। এখন দেখার বিষয়, আইওএন কিভাবে গ্লাসের উপর প্রভাব ফেলে।

অ্যালুমিনোসিলিকেট গ্লাস শুরু থেকেই উৎপাদন প্রক্রিয়াতে সোডিয়াম আইওএন নিয়ে থাকে। কর্নিং এই গ্লাস শিটগুলোকে পটাশিয়াম আইওএন এর সাথে মিশিয়ে দেয়। ফলে, একটা অ্যাক্টিভ মেটাল তৈরি হয় যা যে কোন মেটালের আঘাতকে প্রতিহত করতে পারে।

কাজেই, আমরা দেখি যে গরিলা গ্লাসযুক্ত স্মার্টফোনগুলো শক্ত ফ্লোরে পড়ে গেলেও সেগুলোর ডিসপ্লে গ্লাস কোন রকম ক্ষতিগ্রস্থ হয় না। আবার, অন্য কোন মেটালের আঁছড়েও গ্লাসের উপর কোন দাগ পড়ে না। কারণ, গরিলা গ্লাস তৈরিতে যে অ্যাটোমিক সোডিয়াম দেয়া হয়, তা অ্যাটোমিক পটাশিয়ামের চেয়ে ছোট।

আপনি হয়তো ভাবতে পারেন যে, সংখ্যায় কম/ বেশি কোন ব্যাপার নয়। কিন্তু খেলাটা এখানেই। আপনি যদি অ্যালুমিনোসিলিকেট গ্লাস থেকে সোডিয়াম আইওনগুলো বের করে আনেন আর সেগুলোকে পটাশিয়াম আইওএনের উপর রিপ্লেস করে দেন, তাহলেই দেখবেন যে গ্লাস শিটটি ক্রমশই সংকোচন হতে শুরু করেছে।

ধরুণ, আপনার একটি জাল আছে। জালের সূতোগুলো বেশ নমণীয় কিন্তু টান টান। জালের প্রত্যেকটা ফুটোতে একটা করে গল্ফ বল রয়েছে। এখন কল্পণা করুন যে আপনি সবগুলো গল্ফ বলকে বেস বল দিয়ে পাল্টে দিলেন। তাহলে, যা ঘটবে তা ঠিক আইওএন এর উপর অ্যাটোমিক পরিবর্তণের মতোই।

এখন, নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন, এটি কিভাবে কাজ করে। সোডিয়ামের উপর পটাশিয়ামের পরিবর্তণের সঙ্গে গ্লাসের আইওনিক লেবেল পাল্টে যায়। পটাশিয়াম অত্যন্ত গরম হওয়ার কারণ এটাই। কর্নিং কোম্পানীর ভাষ্য মতে, সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের মিশ্রণ ৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা অতিক্রম করলেই, এটি অ্যালুমিনোসিলিকেটে রুপান্তরিত হয়ে যায়। আর সেই সাথে, গ্লাসে এমন এক শক্তি তৈরি হয় যা যে কোন মেটালের আঘাতকে দারুণভাবে প্রতিহত করতে পারে।

গরিলা গ্লাসের সুবিধা সমূহঃ

  •  নখের আচর থেকে রক্ষা করে
  • দাগ, আঁচড়, ঘষা-মাজা থেকে রক্ষা করে
  • অপেক্ষাকৃত হালকা আঘাত থেকে ডিসপ্লেকে রক্ষা করতে পারে
  • ব্যাকটেরিয়া ঠেকাবে গরিলা গ্লাস
  • জীবাণুর বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে সক্ষম
  • অসাধারন টাচ রেসপন্স পাওয়া যায়

শেষকথা আশা করি আজকের পোস্টটি মাধ্যমে গরিলা গ্লাস সম্পর্কে আপনাদের বিস্তারিত ধারণা পেয়েছেন। পোস্টটি ভাল লাগলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করে আমাদের সাথে থাকুন।

Leave a Reply