ক্যাপচা (CAPTCHA) কি? ক্যাপচা এর প্রয়োজনীয়তা এবং কাজ করার পদ্ধতি?

1
174

টিআইবিঃ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন কিন্তু “I am not a robot” লেখা চোখে পড়েনি এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবেনা। হয়ত আপনি কোন ওয়েবসাইটে কোথাও কমেন্ট করতে গেলেন বা আপনার কোন অনলাইন অ্যাকাউন্টে লগিন করতে গেলেন অথবা অনলাইনে কোথাও কিছু কিনতে গেলেন এবং ঠিক কনফার্ম করার আগের মুহূর্তে আপনার সামনে উপরের মত যেকোনো একটা পপআপ উইন্ডো দেওয়া হল এবং নিজেকে রোবট নয় মানুষ হিসেবে প্রমাণ করতে হয়।

ক্যাপচা কি?

ক্যাপচা বাংলা বা ইংলিশ কোন শব্দ নয়। এটি শুধুমাত্র একটি অ্যাব্রিভিয়েশন। অর্থাৎ কয়েকটি ইংলিশ শব্দের প্রথম অক্ষর নিয়ে তৈরি একটি শব্দ বা ওই শব্দগুলোর শর্ট ফর্ম। ক্যাপচা (CAPTCHA) শব্দটি Completely Automated Public Turing test to tell Computers and Humans Apart এর সংক্ষিপ্ত রূপ।

সোজা কথায় বলতে হলে, এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে মানুষ এবং বট বা রোবটকে আলাদা করা সম্ভব হয়। কম্পিউটার বা স্মার্টফোন স্ক্রিনের বাইরে বসে যে এটাকে অপারেট করছে সে কি কোনো সত্যিকারের মানুষ নাকি কোনো রোবট তা পরীক্ষা করার জন্যই এই ক্যাপচার সৃষ্টি।

ক্যাপচার জনক বা সৃষ্টিকর্তা হচ্ছেন, লুইস ভোন আহন (Luis Von Ahn)। এই ক্যাপচা সম্পর্কিত ঝামেলার জন্ম হয় ১৯৯৭ সালে কিন্তু এটির তখনো অফিশিয়ালি কোন নামকরণ করা হয়নি। এটির নাম CAPTCHA দেওয়া হয় ২০০৩ সালে।

ক্যাপচা এর প্রয়োজনীয়তা কি?

ক্যাপচা মুলত প্রথম তৈরি করা হয় স্প্যামিং আটকানোর উদ্দেশ্যে, যদিও এখন আরো অনেক উদ্দেশ্যেই ক্যাপচা ব্যবহার করা হচ্ছে। এখানে প্রশ্ন হতে পারে ক্যাপচা কিভাবে স্প্যামিং আটকাবে?

ধরুন, আজকে একটি নতুন জনপ্রিয় মুভি রিলিজ হয়েছে একটি সিনেমা হলে। নতুন মুভি হওয়ায় প্রথমদিন সাধারনের থেকে অনেক বেশি মানুষ আগ্রহী হবে সিনেমা হলে গিয়ে মুভিটি দেখার জন্য। যার ফলে প্রথমদিন মুভির টিকেটের চাহিদাও সাধারণের তুলনায় বেশি হবে।

এখন এই সুযোগে কোনো কম্পিউটার প্রোগ্রামার এমন কোন ইন্টেলিজেন্ট প্রোগ্রাম তৈরি করবে যার সাহায্যে সে প্রথমদিনই অনলাইন থেকে সবগুলো টিকিট একাই কিনে নেবে। এটা করতে হলে তার অবশ্যই একটি শক্তিশালী বট বা প্রোগ্রামের দরকার হবে, কারন সে একা এই কাজটি কখনোই করতে পারবে না। এই বট বা প্রোগ্রামের সাহায্যে সে সবগুলো টিকিট আগে থেকে কিনে নেবে এবং এরপরে শুরু করবে ব্ল্যাক মার্কেটিং। টিকিত আউট অফ স্টক হওয়ায় এবং টিকিটের চাহিদা বেশি হওয়ায় সে এই টিকিটগুলো নিজে যে দাম দিয়ে কিনেছে, তার থেকে আরও বেশি দামে বিক্রি করতে পারবে।

এই ধরনের অবৈধ কাজ আটকানোর জন্যই ক্যাপচার দরকার হয়। এই ধরনের কাজ আটকাতে হলে সার্ভারের বোঝা প্রয়োজন যে, যে ডিভাইস দ্বারা এই সার্ভারটি অ্যাক্সেস করা হচ্ছে সে কি কোনো সত্যিকারের মানুষ অপারেট করছে নাকি কোনো প্রোগ্রামারের তৈরি কোনো বট। এটা আগে থেকে বুঝতে পারলেই এই সম্পূর্ণ প্রোসেসটি আটকানো সম্ভব হবে। তার জন্য ঠিক সার্ভারটি অ্যাক্সেস করার আগের মুহূর্তে এমন কিছু টাস্ক দেওয়া প্রয়োজন যেগুলো মানুষের জন্য করা খুবই সহজ কিন্তু কম্পিউটার বা রোবটের জন্য করা খুবই কঠিন। ঠিক এই কনসেপ্ট থেকেই ক্যাপচার সৃষ্টি এবং ক্যাপচার ব্যবহার শুরু হয়।

ক্যাপচা কিভাবে কাজ করে?

ক্যাপচার কাজ অনেকটা টিউরিং টেস্ট এর মত। ব্যবহারকারীকে কিছু ছোট কাজ দেয়া হয়। যেটা কোনো সফটওয়্যার বা রোবট এর পক্ষে সম্ভব নয়। সাধারণত অনলাইনে একটি ফর্মের নিচের দিকে একটি বিকৃত ছবি তে কত গুলো বর্ণ বা অংক দিয়ে ব্যবহারকারীকে সেগুলোকে প্রবেশ করানোর জন্য বলা হয়। ক্যাপচার বর্ণ বা সংখ্যাগুলোও সাধারণত আমরা যেভাবে লেখি সেভাবে থাকেনা। বরং কিছুটা ঢেউ খেলানো কিংবা খুবই অবিন্যস্ত অবস্থায় থাকে। যা কোনো অটোমেটেড প্রোগ্রাম এর পক্ষে ডিকোড করা সম্ভব নয়।

ক্যাপচার শব্দ বা বর্ণগুলো মাঝে মাঝে এতটাই অবিন্যস্ত আকারে থাকে যে মানুষের পক্ষেও সেটা বোঝা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এজন্য অনেক সাইটে ক্যাপচা পরিবর্তনের কিংবা অডিও শোনার সুযোগ আছে। Luis von Ahn এর মতে প্রতিদিন অন্তত ৬০ মিলিয়ন ক্যাপচা সমাধান করা হয়। একজন মানুষের গড়ে ১০ সেকেন্ড সময় লাগে এই ক্যাপচা সমাধান করতে। সেই হিসেবে প্রতিদিন ক্যাপচা সমাধানে যে পরিমাণ সময় ব্যয় হয় তা ১৬০,০০০ ঘন্টার সমান বা প্রায় ১৯ বছরের সমান।

নো-ক্যাপচা রি-ক্যাপচা কি?

নো ক্যাপচা রি ক্যাপচা আগের মতই একটি ক্যাপচা, কিন্তু এটি আগেরটার থেকে অনেক বেশি স্মার্ট এবং ইন্টেলিজেন্ট। যখন গুগল দেখলো যে আগের পদ্ধতিটি আর কার্যকর নয়, তখন তারা ভাবতে শুরু করল যে, এর থেকেও কঠিন আর কি তৈরি করা যায় যেটা মানুষের জন্য হবে আরো বেশি সহজ এবং রোবটের জন্য আরও বেশি কঠিন? এবং তারা অনেক ভেবে এর একটা ভাল উপায়ও পেয়ে গেল।

এবার তারা চিন্তা করল যে ক্যাপচাতে টেক্সট এর পরিবর্তে তারা কিছু ছোট ছোট ছবি দেবে এবং সবাইকে বলা হবে ওই ছবিগুলো থেকে নির্দিষ্ট একটি অবজেক্ট খুঁজে বের করে মার্ক করতে। যেমন, হয়ত আপনাকে কিছু ছোট ছোট ছবি দেওয়া হবে এবং বলা হবে ওই ছবিগুলো থেকে যেসব ছবিতে কোনো রোড সাইন আছে সেগুলো মার্ক করতে হবে অথবা একটি বড় ছবির মধ্যে থেকে ছবির মধ্যে যে যে অংশে কোনো গাড়ি আছে, সেই অংশগুলো মার্ক করতে হবে। যতক্ষন না পর্যন্ত আপনি সঠিকভাবে এটা করতে পারছেন, ততক্ষন আপনাকে সাইটটি অ্যাক্সেস করতে দেওয়া হবে না। আপনি নিজেই ধারণা করতে পারছেন যে এটা মানুষের জন্য কতটা সহজ এবং রোবট বা অটোমেটেড প্রোগ্রামগুলোর জন্য কতটা কঠিন।

এই ক্যাপচা সিস্টেমটিই এখন সব থেকে বেশি ব্যবহার করা হয় এবং সব থেকে বেশি জনপ্রিয়। আপনি এই ক্যাপচাটিই বেশি দেখে থাকবেন।

আবার অনেক সময় এই ক্যাপচাটি আপনাকে পূরণ করার দরকারও হবেনা। অনেক সময় আপনাকে জাস্ট ক্যাপচাতে ক্লিক করতে হবে এবং কিছু সময় পরে কোন কিছু না করেই আপনাকে মানুষ হিসেবে অ্যাপ্রুভ করে দেওয়া হবে। এটা কিভাবে করা হয়? এই পদ্ধতিটি আরও বেশি স্মার্ট। এই পদ্ধতির পেছনে আছে গুগলের অসাধারন শক্তিশালী আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। এসময় যখন আপনি ক্যাপচার ওপরে ক্লিক করেন, তখন আপনার কাজকর্ম ট্র্যাক করা হয়। কাজকর্ম বলতে আপনার মাউস কার্সর মুভমেন্ট, আপনার ব্রাউজারের কুকি, আপনার আইপি অ্যাড্রেস, আপনার অভারল ব্রাউজিং হ্যাবিট এবং আরো অনেক কিছু যেগুলো গুগল গোপন রেখেছে। মেইনলি আপনার মাউস কার্সর মুভমেন্ট এবং আপনার ব্রাউজারের ডেটা চেক করা হয়।

আপনি যদি মানুষ হন, তাহলে আপনার মাউস কার্সর মুভমেন্ট নির্দিষ্টভাবে হবেনা। অর্থাৎ আপনার মাউস কার্সরটি বিভিন্নভাবে বিভিন্নদিকে মুভ করতে থাকবে। কিন্তু আপনি রোবট হলে আপনার মাউস কার্সরটি সোজাসুজি সরল রৈখিকভাবে ক্যাপচার দিকে যাবে এবং ক্লিক করবে। প্রধানত এইটুকু দেখেই বোঝা যাবে যে আপনি মানুষ নাকি রোবট। আপনি মানুষ কিনা এটা নিশ্চিত হলেই কোনরকম টাস্ক ছাড়াই আপনাকে যেতে দেওয়া হবে। কিন্তু এটা দেখার পরে এবং আপনার ব্রাউজিং হ্যাবিট লক্ষ্য করার পরেও যদি কোনো সন্দেহ থাকে, তখন আপনাকে ওই ছবি মার্ক করার টাস্কটি দেওয়া হবে।

এটাই ক্যাপচা সম্পর্কে আজকের পোস্ট। কার্টেসি সিয়াম একান্ত।

১টি মন্তব্য

Leave a Reply