পরিচালকদের বেনামি ঋণে অস্থির ব্যাংকিং খাত

0

সরকারের কাছ থেকে সকল সুবিধা আদায় করার পরও সিঙ্গেল ডিজিট কিংবা সিম্পল রেট সুদ দুটোর কোনােটাই বাস্তবায়ন করেনি ব্যাংকগুলাে। বিশেষত বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলাে এই দুটো সুবিধা দেওয়ার কথা বলে নিজেরাই সুবিধা নিয়েছে, দেয়নি কিছুই। অথচ ব্যাংক মালিকদের নেতাদের আনুষ্ঠানিক ঘােষণা অনুযায়ী ২০১৮ সালের ১ জুলাই থেকে সিঙ্গেল ডিজিট কার্যকর হওয়ার কথা। আর অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের ঘােষণা অনুযায়ী মে ২০১৯ পরিচালকদের বেনামি ঋণে থেকেই সরল সুদ বা সিম্পল রেট কার্যকর হওয়ার কথা। আদতে কোনােটাই হয়নি। এ নিয়ে আর কোনাে পদক্ষেপও নেই। সরকারি ব্যাংকগুলাে ক্ষেত্রেভেদে নির্দেশনা প্রতিপালন করলেও বেসরকারি ব্যাংকগুলাে উল্টো সুদের হার বাড়িয়েছে।

ব্যাংক মালিকরা এত সুবিধা নেওয়ার পরও কেন কথা রাখেননি-এমন প্রশ্নের জবাবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলাে বলেছে, ব্যাংকিং খাত এখন হাতেগােনা কয়েকজনের কাছে জিম্মি। তারা এতটাই দাপুটে যে, এদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাধ্য কারাে নেই। নইলে কথা দিয়েও কেন তারা সুদের হার কমায়নি। তারা রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।

বিশিষ্ট ব্যাংকার খােন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেছেন, ক্যাসিনাের মতাে এখানেও প্রভাবশালীদের দাপট স্পস্ট। শুধু তা-ই নয়, নানারকমের লুক্কায়িত চার্জ আরােপের মাধ্যমে ব্যাংকগুলাে গ্রাহকদের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলেও অভিযােগ রয়েছে। ব্যাংকগুলাে যেভাবে চার্জ করে, তাতে কার্যকর সুদ হার দ্বিগুণেরও কাছাকাছি হয়ে যায়। কোনাে কোনাে ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংক আগেই সুদের অঙ্ক কেটে রাখে। কিস্তির সিংহভাগই সুদ হিসাবে কর্তন করে। শেষ দিকে এসে আসলের অংশ বেশি করে কাটা হয়। অর্থাৎ ব্যাংক আগেই তার মুনাফা নিশ্চিত করে ফেলে।

ব্যাংকিং সূত্রগুলাে বলেছে, একেক ব্যাংকের একেক রকম সুদ, চার্জ আর ব্যাংক পরিচালকদের নানা কর্মকাণ্ড স্পর্শকাতর হলেও এখন শৃঙ্খলাহীন এক সেক্টরের নাম ব্যাংকিং খাত। একেক জন ঋণ নিয়ে নানা কৌশলে কিস্তি বিলম্বিত করা বা না দেওয়ার ফন্দিফিকির করা এবং সময় বাড়িয়ে নেওয়াসহ নানা আয়ােজন করেই যাচ্ছে। একের পর এক সৃজনশীল ‘নীতি আবিষ্কার ও প্রয়ােগের মাধ্যমে টাকা ফেরত দিতে গড়িমসির এক উদ্ভাবনী পন্থা নিয়ে এসেছে তারা। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দিয়ে সেসব জায়েজ করা হচ্ছে। নির্দেশনা আকারে পাঠানাে হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলােতে। অথচ সাধারণ গ্রাহক, সং ঋণগ্রহীতা যারা নিয়মিত কিস্তি পরিশােধ করছেন তাদের ওপর বরং ব্যাংকগুলাে খড়গহস্ত হচ্ছে। অনিচ্ছাকৃতভাবে কিংবা পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে যদি কোনাে উদ্যোক্তা বা ভােক্তা ঋণগ্রহীতা দুই-এক কিস্তি দিতে ব্যর্থ হন, তাকে দণ্ডসুদ গুণতে হচ্ছে। তার দায়দেনা বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

ইচ্ছেকৃত খেলাপিদের তথা বড় ঋণগ্রহীতাদের সুদের একটি বড় অংশ মওকুফ করে দেওয়া হচ্ছে। এক ব্যাংকের পরিচালকরা অন্য ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছে। নিয়মনীতির তােয়াক্কা না করেই একাজটি করছে পারস্পরিক যােগসাজশে। বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছে। এমনও ঘটনা ঘটছে যে, বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালকরা পরিচিতজনদের নামে ঋণ উত্তোলন করে নিজেরা নিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে জামানতের তােয়াক্কা করছে না। ব্যাংক পরিচালকদের বেনামি ঋণগ্রহণের ফলে গােটা ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। যাদের নামে ঋণ দেখিয়ে পরিচালকরা টাকা নিয়ে গেছেন, ঐসব গ্রাহকও হিমশিম খাচ্ছেন। মামলার ভয় তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাদের। মালিক-পরিচালক টাকা ফেরত না দেওয়ায় ব্যাংকে সুদাসলে কেলি বাড়িতেছে দেনা ” । এতে বেড়ে যাচ্ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণও।

এভাবে কারসাজি করে ব্যাংকের অর্থ লুটপাটকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এখাতে শৃঙ্খলা আসবে না। এমনকি আমানত পেতেও ব্যাংকগুলাের কষ্ট হবে। বর্তমানে ব্যাংকগুলােতে তারল্য সংকটের এটাও একটি কারণ। আস্থাহীনতার কারণে অনেকেই ব্যাংকে টাকা রাখতে আগ্রহী হচ্ছেন না। আর যারা ব্যাংক পরিচালনার নামে এমন কাজ করছেন তাদের অনেকেই নিয়মমাফিক নূন্যতম ২ শতাংশ শেয়ারের মালিকও নন। এদের অনেকেরই আবার দেশের বাইরে ব্যবসা, বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়ি রয়েছে বলে সূত্র জানায়। অনেকে যেন নিজ দেশেই আসেন বেড়াতে’। এগুলাের সঠিক তদারকি নেই।

ব্যাংকিং সূত্রমতে, প্রভাব খাটিয়ে নেওয়া ঋণের বেশির ভাগই খেলাপি হয়ে যায়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তার অন্য ব্যবসায় বিকাশ ঘটছে। কেউ দেশে-বিদেশে শিল্প গড়ছেন, কেউবা আবাস গড়ছেন। অথচ দেশে জনগণের আমানতের অর্থ ধার নিয়ে ফেরত দিতেই তাদের যত সমস্যা। এটি করতে গিয়ে ব্যাংকগুলােকে আবার মূলধনের যােগান দিতে হচ্ছে সরকারকেই। ইত্তেফাক।

Leave a Reply