বিসিএসের ভাইভা নিয়ে নতুন করে ভাবুন

0
192

যে কোনো চাকরিতে নিয়োগে ক্ষেত্রে ‘ভাইভা (VIVA) একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বের সব দেশেই নিয়োগ পরীক্ষায় ভাইভা থাকে। উন্নত বিশ্বে একাডেমিক সাবজেক্টের গুরুত্ব থাকলেও বাংলাদেশে নিয়োগ পরীক্ষায় একাডেমিক সাবজেক্টের গুরুত্ব খুব একটা নেই বললেই চলে।

চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে শেষ ধাপে ভাইভার সম্মুখীন হতে হয়। তবে এ ক্ষেত্রে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা যুক্তিযুক্ত নয়। কেননা, অন্যান্য দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের হার শতকরা ৪ থেকে ৭ ভাগের মধ্যে সীমিত।

আমাদের এখানে উচ্চশিক্ষিত বেকারের হার কমপক্ষে ৩৪ শতাংশ। ফলে চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা নেহায়েত কম নয়; প্রায় ৪ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এমন অবস্থায় ২০০ নম্বরের ভাইভা ‘প্রিয়জনপ্রীতি’ বা ‘দুর্নীতি’ বাড়াবে- এটাই স্বাভাবিক।

ভাইভার মাধ্যমে একজন ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা যায়, যা কর্মজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশে ভাইভার উদ্দেশ্যও কি তাই? উত্তরটা সবার জানা। নিয়োগকর্তাদের বক্তব্য বলেন বা সফলদের গল্প বলেন বা প্রচলিত ভাইভা গাইড বলেন; সবার উত্তর একটাই।

দেশের সবচেয়ে সম্মানিত চাকরি বিসিএসের ভাইভার উদ্দেশ্য হচ্ছে, অনুগত কর্মচারী নির্বাচন করা। অর্থাৎ যোগ্যতা হচ্ছে লেজুড়বৃত্তি করতে পারা। সৃষ্টিশীলতা, সততা, নৈতিকতা এগুলো বরং বিবর্জিত বিষয়। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হয় এদেশের ইতিহাস; আর পরিবর্তিত ইতিহাসের সাফাই গেয়ে যারা সরকারের তোয়াজ করতে পারবে; তারাই চাকরিতে প্রবেশের অধিকার রাখে।

পিএসসির ভাইভা বোর্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর প্রফেসর ড. লুৎফর রহমান। প্রক্টরের প্রশ্ন- পিএসসির ভাইভা বোর্ডে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষককে রাখা হয়, কিন্তু অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজনও রাখা হয় না; কেন?

ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিতে যথাসম্ভব ‘হিউম্যান টাচ’ কমানোর চেষ্টা করে; বিজ্ঞাপনেও তা ফলাওভাবে প্রচার করা হয় (শতভাগ মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সম্পূর্ণ স্বয়ক্রিয় পদ্ধতিতে তৈরি ইত্যাদি)।

প্রশ্ন হল, হিউম্যান টাচে সমস্যাটা কোথায়? ভাইবাতে হিউম্যান টাচ এসে যায়, যখন কোনো পরীক্ষক পরীক্ষার্থীকে ব্যক্তিগতভাবে বিবেচনায় নেয় এলাকা; স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বদৌলতে। ভাইভাতে প্রশ্নের ধরন, মান, মূল্যায়ন মাত্রা, প্রশ্নকারীর ব্যক্তিগত মানসিক অবস্থা এবং ভাইভার সময় (কেউ নেন ৫ মিনিট, কেউ নেন ২৫ মিনিট) ভাইবার নম্বর বণ্টনে ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করবে, এটাই স্বাভাবিক।

প্রশ্নের মানোন্নয়নে সাদিক স্যার প্রথম ২০ জনের সমন্বিতভাবে ভাইভা নেন, যেটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু এর পরেও প্রশ্ন থেকে যায়, যখন কতিপয় সদ্য সাবেক পিএসসি মেম্বার কিছু বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টারে গিয়ে বলে আসেন- ভাইভা ভালো হলে আমি ১৭০ দিই। আবার অন্য একজন বলেন, ভাইভা ভালো হলে আমি ১৪০ দিই; তখন তা অতিশয় চিন্তার উদ্রেক করে।

এই যে মূল্যায়নে নম্বর দেয়ার মাঝখানে ২০ থেকে ৩০ নম্বরের ব্যবধান; একজন ভালো প্রার্থীকে তার যোগ্যতা অনুযায়ী ক্যাডার পদ থেকে বঞ্চিত করতে পারে শুধু ভুল শিক্ষকের কাছে ভাইভা দেয়ার কারণে।

এ ধরনের ভালো কাম্য নয়; যদি একজনের ভালো মূল্যায়ন (১৪০) অন্যজনের খারাপ মূল্যায়নের (১৪০) সমান হয়ে যায়। একইমানের লিখিত পরীক্ষা ও ভাইভা দিয়ে কেউ হবে ক্যাডার, কেউবা নন ক্যাডার; এই হিউম্যান টাচের বিষয়ে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়, যখন দেখা যায়- অধিকাংশ পিএসসি মেম্বার সুনির্দিষ্ট কোনো অঞ্চল বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রার্থীদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করেন।

এসব কারণেই বঙ্গবন্ধু জেলা কোটা চালু করেছিলেন। কিন্তু জেলা কোটাও আসলে সমাধান নয়; বরং সর্বোত্তম সমাধান হবে হিউম্যান ফ্যাক্টর কমানো। এটি কীভাবে কমানো সম্ভব, এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ভাইভার ক্ষেত্রে মাত্র ২৫ নম্বর বরাদ্দ করেছে। উত্তীর্ণ প্রার্থীদের নম্বর প্রদানের মাত্রা ১৮ থেকে ২২-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। ২০০ নম্বরের ভাইভা অধিকাংশের জন্যই সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং অবিচার।

ভাইভার নম্বর ৫০ নম্বর হলে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বৈষম্য কমবে। পিএসসি কি পারে না একই পথে হাঁটতে? সাদিক স্যার বৈষম্য কমানোর জন্য মডেল ভাইভা বোর্ড চালু করেছেন, লিখিত পরীক্ষার খাতায় ৩য় পরীক্ষক দিয়েছেন। আশা করি, এ ব্যাপারেও তিনি কাজ করবেন।
কার্টেসি: আশাদুল ইসলাম। [email protected]