এবার যুক্তরাষ্ট্রে জনতা ব্যাংকের ডলার চুরি

0

কেলেঙ্কারির জন্য দেশের সীমানা ছাড়িয়ে জনতা ব্যাংক লিমিটেডের নাম এখন যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত গড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জনতা ব্যাংকের ‘জনতা এক্সচেঞ্জ কোম্পানি আইএনসি’ নামে একটি এক্সচেঞ্জ কোম্পানি রয়েছে। সংক্ষেপে এটি ‘জেইসিআই, ইউএসএ’ নামে পরিচিত।

জেইসিআই, ইউএসএ থেকে ৬ লাখ ৩ হাজার ৯৪৭ মার্কিন ডলার চুরি হয়ে গেছে। প্রতি ডলার ৮৫ টাকা দরে হিসাব করলে বাংলাদেশি মুদ্রায় তা দাঁড়ায় ৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা। জেইসিআইয়ের সুস্মিতা তাবাসসুম নামের এক কর্মচারীকে সন্দেহ করছে জনতা ব্যাংক। ২০১৫ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকেই সুস্মিতা তাবাসসুম জেইসিআইয়ে টেলিফোন অপারেটর কাম টেলার হিসেবে চাকরি করে আসছিলেন। তিনি এখন পলাতক।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং জনতা ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। চুরি হয়ে যাওয়া অর্থকে ‘মিসিং ফান্ড’ হিসেবে বিবেচনা করছে জনতা ব্যাংক। জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়, জেইসিআই, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ১০ মাস ধরে চিঠি চালাচালি করলেও কোনো সুরাহা হয়নি। তবে জেইসিআই অর্থ উদ্ধারে নিউইয়র্কে মামলা করেছে, আইনজীবীও নিয়োগ করেছে।

জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুছ ছালাম আজাদ এ নিয়ে গত মাসে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা বিব্রত। তবে অর্থ উদ্ধারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছি। করোনার কারণে দেরি হচ্ছে।’

চিঠিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, জেইসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ছিলেন জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম, ২০১৯ সালের ২৭ জুলাই যিনি অবসরে গেছেন। তাঁর অবসরে যাওয়ার পর জনতা ব্যাংক ঢাকা থেকে মাহবুবুর রহমান নামের একজনকে জেইসিআইয়ের নতুন সিইও প্রেসিডেন্ট ও সিইও হিসেবে নিয়োগ দেয়।

কিন্তু মাহবুবুর রহমানের ভিসা পেতে দেরি হচ্ছিল বলে জনতা ব্যাংক জেইসিআইয়ের টেলিফোন অপারেটর কাম টেলার সুস্মিতা তাবাসসুমকে কাজ চালিয়ে যেতে বলে।

জনতা ব্যাংক এখন বলছে, বিদায়ী সিইও নজরুল ইসলামও সুস্মিতাকে দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। গত বছরের ২৭ জুলাই থেকে এ বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জেইসিআইয়ের দায়িত্ব পালন করেন সুস্মিতা তাবাসসুম। এই ফাঁকেই অর্থ চুরির ঘটনা ঘটে।

কিন্তু সুস্মিতা তাবাসসুম জনতা ব্যাংকের নিয়মিত বা স্থায়ী কর্মচারী নন। ব্যাংকের বাইরের একজন ব্যক্তিকে কেন এক্সচেঞ্জ হাউস পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হলো, এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুছ ছালাম আজাদ বলেন, ‘এই জটিলতা হবে আমরা বুঝতে পারিনি।’ কে এই সুস্মিতা তাবাসসুম, এই প্রশ্নের কোনো জবাব নেই আব্দুছ ছালাম আজাদের কাছে।

প্রথম আলো খোঁজ নিয়ে জেনেছে, ১৯৮২ সালে জন্ম নেওয়া সুস্মিতা তাবাসসুম ঢাকা বারের সদস্য। বারে থাকা সদস্যদের বিশদ বিবরণের তালিকা অনুযায়ী তিনি বারের ১৬ হাজার ৭৭ নম্বর সদস্য। তাঁর গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ায়। ঢাকার মোহাম্মদপুরের খিলজি রোডের একটি বাসা তাঁর বর্তমান ঠিকানা। বারে সংরক্ষিত তাঁর গ্রামীণফোনের ০১৭১৫ সিরিজের মোবাইল নম্বরে ফোন করে তা বন্ধ পাওয়া গেছে।

চুরি ধরা পড়ল যেভাবে:

ঘটনাটি উদ্‌ঘাটিত হয়েছে জেইসিআই, ইউএসএর বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও সিইও মাহবুবুর রহমান যোগ দেওয়ার পর। তিনি যোগ দিয়েছেন চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি। যোগ দেওয়ার পরদিনই তিনি দেখতে পান জেইসিআইয়ের তহবিলে গরমিল।

মাহবুবুর রহমান প্রথম দিনই দেখতে পান শুরু থেকেই জেইসিআই লোকসানি প্রতিষ্ঠান। ২০১৫ সালে এর আয় ছিল ৩ হাজার ৪৫ ডলার, ব্যয় ছিল ৫৪ হাজার ৯৫৭ ডলার। প্রতিবছর আয়ের তুলনায় ব্যয় হয়েছে ১০ থেকে ১৫ গুণ বেশি। এমনকি চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০ জুন পর্যন্ত আয় ছিল ১০ হাজার ৫৪০ ডলার। আর ব্যয় ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৪৪০ ডলার।

মাহবুবুর রহমান গত ১৫ ও ২০ ফেব্রুয়ারি দুই আলাদা ই-মেইল বার্তায় জনতা ব্যাংককে পুরো ঘটনার বিবরণ উল্লেখসহ জানান, জেইসিআইয়ের তহবিল থেকে ৬ লাখ ৩ হাজার ৯৪৭ মার্কিন ডলার চুরি হয়ে গেছে।

ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহেই জনতা ব্যাংকের নিয়মিত পর্ষদে তহবিল চুরির ঘটনা নিয়ে আলোচনা হয়। এরপর গত ১ মার্চ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলামকে পুরো ঘটনা তুলে ধরে চিঠি দেয় জনতা ব্যাংক।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এ বি এম রুহুল আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি এবং অর্থ উদ্ধারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে জনতা ব্যাংককে বলে দিয়েছি।’

পুরো বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে গত ১৯ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরকেও চিঠি পাঠিয়েছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ব্যবস্থা না নেওয়ায় গত ১৩ অক্টোবর আবার তাগিদপত্র দেওয়া হয় গভর্নরকে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে জানা গেছে।

ধরা পড়ার পর:

জেইসিআইয়ের ব্যাংক হিসাব পরিচালিত হচ্ছিল হাবিব আমেরিকান ব্যাংকের (হাব ব্যাংক) নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস শাখায়। প্রথম দিনই সুস্মিতা তাবাসসুমের কাছে ঘটনার আদ্যোপান্ত জানতে চান মাহবুবুর রহমান। সুস্মিতা তাঁকে জানান, তিনি অসুস্থ থাকায় জেইসিআইয়ের তহবিল হালনাগাদ করতে পারেননি এবং হিসাব মিলিয়ে দেওয়ার জন্য ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় চান।

চিঠিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সুস্মিতা হাব ব্যাংকে ৫ লাখ ৯ হাজার ৮২০ ডলার জমা দিয়েছেন বলে তিনটি রসিদ জমা দেন মাহবুবুর রহমানের কাছে। রসিদের তথ্য অনুযায়ী ১৪ জানুয়ারি ১ লাখ ৯৭ হাজার ১০ ডলার, ১৫ জানুয়ারি ১ লাখ ৪৮ হাজার ২০৩ ডলার এবং ২১ জানুয়ারি ১ লাখ ৬৪ হাজার ৬০৭ ডলার জমা হয় হাব ব্যাংকে।

পরদিন ১৮ ফেব্রুয়ারি তিন রসিদের কপিসহ সুস্মিতাকে নিয়েই মাহবুবুর রহমান হাব ব্যাংকের জ্যাকসন হাইটস শাখায় যান। কিন্তু ব্যাংকের শাখাটি তাঁদের জানায়, জেইসিআইয়ের হিসাবে এই তিন রসিদে উল্লিখিত কোনো অর্থ জমা হয়নি।

জমা না হওয়ায় হাব ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ওই দিনই লিখিত অভিযোগ দেন সুস্মিতা তাবাসসুম। এরপর ২১ ফেব্রুয়ারি হাব ব্যাংক তাঁর সাক্ষাৎকার নেয়। ২৫ ফেব্রুয়ারি ই-মেইলে সুস্মিতাকে হাব ব্যাংক জানায়, তিন রসিদে উল্লিখিত অর্থ জেইসিআইয়ের হিসাবে জমা হয়নি এবং সুস্মিতার দাবি তাঁদের কাছে অগ্রহণযোগ্য। মাহবুবুর রহমান এ তথ্য তখন ঢাকায় জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়কে জানিয়ে দেয়।

সুস্মিতা তাবাসসুমের যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহার করা সেল নম্বরে কয়েক দিন ধরে ফোন করলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। ব্যাংক থেকে পাওয়া তাঁর ই-মেইল ঠিকানায় গত ২৪ নভেম্বর দুই দফা মেইল পাঠিয়ে জানতে চাইলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে জবাব আসে মেইল ঠিকানাটি তিনি ব্যবহারের অনুপযোগী করে রেখেছেন। তাঁর ফেসবুক আইডিও অচল বা ডিঅ্যাক্টিভেটেড।

সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা বলতে মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ২৬ ফেব্রুয়ারি অর্থ উদ্ধারে আইনজীবী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। পাশাপাশি সুস্মিতা যাতে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ না করতে পারেন, এ ব্যাপারে আইনি ব্যবস্থা নিতে রেমন্ড জে অ্যাব নামের একজন আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয় ৭ মে।

গত ১৬ আগস্ট বাংলাদেশ দূতাবাস, ওয়াশিংটন এবং নিউইয়র্কের কনস্যুলেট অফিসের সহায়তা চায় জেইসিআই, ইউএসএ। একই দিন পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেনকেও চিঠি দিয়ে পুরো ঘটনার বিবরণ জানান জেইসিআইয়ে সিইও মাহবুবুর রহমান। কিন্তু অর্থ উদ্ধারের কোনো অগ্রগতি নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা খুবই দুঃখজনক। আমি বলব পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দায় আছে এতে। একজন টেলার যিনি কিনা ব্যাংকের নিয়মিত কর্মচারীও নন, তাঁকে কীভাবে এক্সচেঞ্জ হাউসের কাজ চালিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হলো—এটাই তো বড় রহস্য। এর সঙ্গে একটা চক্র জড়িত। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হবে এটা তদন্ত করে দোষীদের চিহ্নিত করা এবং দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনা।’ প্রথম আলো।

Leave a Reply