অর্থ ও বাণিজ্য

বিদায়ী বছরে ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা বেড়েছে, শীর্ষে ইসলামী ব্যাংক

মহামারী করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে ২০২২ পার করেছে দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য। অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ডলার সংকট ও টাকার অবমূল্যায়ন। এর প্রভাব দেখা গেছে দেশের আমদানি-রফতানিতেও। সব মিলিয়ে দেশের ব্যাংক খাতের ব্যবসার জন্য অনেকটাই প্রতিকূলে ছিল ২০২২ সাল। তার পরেও বছর শেষে দেখা যাচ্ছে ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফা বেড়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিছাড় বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্যমতে, সুবিধাপ্রাপ্ত ঋণের অনাদায়ী সুদকে আয় হিসেবে দেখানোর সুযোগ পাওয়ায় ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফা বেড়েছে।

টেকনো ইনফো বিডি‘র প্রিয় পাঠক: প্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও চাকরির গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ টেকনো ইনফো বিডি তে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন।

আয় থেকে ব্যয় বাদ দিয়ে যে মুনাফা থাকে, সেটিকেই বলা হয় পরিচালন মুনাফা। পরিচালন মুনাফা কোনো ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা নয়। এ মুনাফা থেকে খেলাপি ঋণ ও অন্যান্য সম্পদের বিপরীতে প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) সংরক্ষণ এবং সরকারকে কর পরিশোধ করতে হয়। প্রভিশন ও কর-পরবর্তী এ মুনাফাকেই বলা হয় ব্যাংকের প্রকৃত বা নিট মুনাফা।

২০২১ সালে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে বড় ধরনের উল্লম্ফন হয়েছিল। এর সুবাদে সে সময় ব্যাংকগুলো ভালো ব্যবসা করতে পেয়েছে। পরিচালন মুনাফাও ভালো হয়েছে। কিন্তু ২০২২ সালে বৈদেশিক বাণিজ্য কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো আগের বছরের মতো ব্যবসা করতে পারেনি। আবার ঋণগ্রহীতাদের বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিছাড় দেয়ায় ঋণের বিপরীতেও ব্যাংকগুলোর আদায় কমেছে। এতে ব্যাংকের মুনাফা কমেছে। নেতিবাচক কিছু খবরের কারণেও এ সময় খাতটির ব্যবসা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে যেসব ব্যাংকের কাছে ডলারের জোগান ভালো ছিল তারা এ সময়ে ভালো ব্যবসা ও মুনাফা করেছে।

গত ২২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সুবিধাপ্রাপ্ত ঋণের বিপরীতে অনাদায়ী সুদকে ব্যাংকের আয় হিসেবে দেখানোর সুযোগ দিয়ে ব্যাংকগুলোর কাছে চিঠি পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সুদের কিস্তি পরিশোধের সুবিধাপ্রাপ্ত মেয়াদি ঋণের ওপর বকেয়া সুদ আয় হিসেবে দেখাতে পারবে ব্যাংক। এতে ব্যাংকগুলোর আয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়।

ব্যাংকাররা বলছেন, ব্যাংকগুলো পরিচালন মুনাফা বাড়ানোর সুযোগ পেলেও তা প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়েনি। এর মধ্যে কিছু ব্যাংক ভালো পরিমাণে পরিচালন মুনাফা করেছে। আবার কাঙ্ক্ষিত মুনাফা অর্জন করতে না পারায় অনেক ব্যাংকই এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য প্রকাশ করতে চায়নি।

আগের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে সদ্যসমাপ্ত বছরেও সবচেয়ে বেশি পরিচালন মুনাফা করেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। ব্যাংকটি ২০২২ সালে ২ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা অর্জন করেছে। আগের বছর ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ২ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা।

OPERATING PROFIT 2022

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক দেশের বৃহত্তম ব্যাংক। পরিচালন মুনাফার দিক থেকে আমরা বরাবরই শীর্ষস্থানে থাকি। ২০২২ সালেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আশা করছি, নতুন বছরে ইসলামী ব্যাংক আগের চেয়েও ভালো করবে।’

রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক ২০২২ সালে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা অর্জন করেছে। ২০২১ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ২ হাজার ৯০ কোটি টাকা।

সদ্যসমাপ্ত বছরে হাজার কোটি টাকার বেশি পরিচালন মুনাফা অর্জন করেছে সাউথইস্ট ব্যাংক। ২০২২ সাল শেষে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৩৫ কোটি টাকায়। ২০২১ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ১ হাজার ১৬ কোটি টাকা। ২০২২ সালে ৮৪৫ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে মার্কেন্টাইল ব্যাংক, আগের বছরে যা ছিল ৭২২ কোটি টাকা।

যমুনা ব্যাংক বিদায়ী বছরে ৮৩০ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা অর্জন করেছে, যেখানে আগের বছরে ছিল ৭৫০ কোটি টাকা।

সদ্য শুরু হওয়া ২০২৩ সালকেই ব্যাংক খাতের জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বছর হিসেবে দেখছেন ব্যাংকাররা। তাদের ভাষ্যমতে, কভিডের প্রাদুর্ভাবের পর ঋণগ্রহীতাদের দেয়া নীতিছাড়গুলোর মেয়াদ এ বছরেই শেষ হচ্ছে। এ ছাড় আরো বাড়ানো হলে তা ব্যাংক খাতের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে।

শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ২০২২ সালের প্রথম ছয় মাস ব্যাংকগুলো হাত খুলে ব্যবসা করেছে। কিন্তু সেপ্টেম্বরের পর পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে। ভালো-খারাপ মিলে বিদায়ী বছর ছিল মন্দের ভালো। কিন্তু ২০২৩ সাল হবে ব্যাংকের জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বছর। ২০২০ ও ২০২১ সালে ঋণগ্রহীতাদের যেসব ছাড় দেয়া হয়েছে, সেগুলোর মেয়াদ ২০২৩ সালে শেষ হবে। এরপর আরো ছাড় দেয়া হলে সেটি হবে ভয়াবহ।

সদ্যসমাপ্ত বছরে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের ৮১০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা হয়েছে। এর আগের বছরে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৭৫০ কোটি টাকা। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা ২০২২ সাল শেষে দাঁড়িয়েছে ৫৫০ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছরে ছিল ৫০১ কোটি টাকা। বিদায়ী বছরে এনআরবিসি ব্যাংক ৪৫৫ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা অর্জন করেছে। আগের বছরে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৪৪৪ কোটি টাকা। ইউনিয়ন ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা ২০২২ সালে ৪৫০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ২০২১ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৩৭৫ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক ২০২২ সাল শেষে ২১১ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা করেছে। ২০২১ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ১৪৭ কোটি টাকায়।

সদ্যসমাপ্ত বছরে সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স (এসবিএসি) ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা কমেছে। ২০২২ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২০০ কোটি টাকায়, যেখানে আগের বছরে ছিল ২১০ কোটি টাকা। ২০২২ সালে কার্যক্রম শুরু করা সিটিজেনস ব্যাংকের বছর শেষে ২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা পরিচালন মুনাফা হয়েছে।

গত তিন বছরে বারবার ঋণের কিস্তি পরিশোধে নীতিগত ছাড় দেয়ার কারণে ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় কমছে। বিপরীতে বাড়ছে মেয়াদোত্তীর্ণ ও খেলাপি ঋণের পরিমাণ। ঋণপত্রের দায় সমন্বয়ের সময়সীমাও কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে। ব্যাংকগুলোর ক্যাশ ফ্লোর ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া নীতিছাড়ের প্রভাব পড়েছে। ব্যাংকঋণ বাড়াতে না চাইলেও অসমন্বিত এলসি দায় ফোর্স লোন হয়ে মেয়াদি বিনিয়োগে রূপান্তর হচ্ছে। গত বছর প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৬ টাকার নিচে। এখন তা ১০৭ টাকায় কিনতে হচ্ছে। বেশি দামে ডলার কেনার কারণেও ব্যাংকের ক্যাশ ফ্লো পরিস্থিতি অবনতি ঘটছে। সব মিলিয়ে বিদায়ী বছরটি ব্যাংক খাতের জন্য খুব একটা ভালো যায়নি বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে ২০২২ সালজুড়ে দেশের অর্থনীতিসহ ব্যাংক খাত চাপের মধ্যে কাটিয়েছে। কভিড থেকে উত্তরণকে কেন্দ্র করে বছরের শুরুটা ভালোই ছিল। কিন্তু এর পরই এল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এ যুদ্ধ বাংলাদেশসহ বিশ্ব অর্থনীতির অনেক হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছে। দেশের ব্যাংক খাত বৈদেশিক মুদ্রার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ তারল্য সংকটের মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছে। এ কারণে বিদায়ী বছর প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বিরাট ফারাক তৈরি করেছে। বছরের শেষের দিকে কিছু ব্যাংকের নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ পেয়েছে। এ কারণে ব্যাংক খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের এক ধরনের অস্বস্তি দেখা গেছে। আশা করছি ২০২৩ সাল ব্যাংক খাতসহ সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে। তবে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, নতুন বছর হবে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।’

আরও দেখুন: ২০২১ সালের ব্যাংক সমূহের পরিচালন মুনাফা

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button