রেমিট্যান্সের রেকর্ড নয়, রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের প্রতি সুদৃষ্টি অব্যাহত রাখতে হবে

0

বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের চলমান সংকটের মধ্যেও প্রবাসী আয়ে ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। করোনা মহামারির মধ্যেই চলতি বছরের নভেম্বরের মাত্র ১২ দিনে ১.৬৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স আসার রেকর্ড হয়েছে। দেশের ইতিহাসে একক মাসের মাত্র ১২ দিনে এর আগে কখনো এত পরিমাণ রেমিট্যান্স আসেনি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি একটি বিরল ঘটনা। চলতি ২০২০-২০২১ অর্থবছরে জুলাই থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৪ কোটি ১৬ লাখ ডলার (১০.১৬ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার। যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৪২ শতাংশ বেশি। গত ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে এ একই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ৭০৭ কোটি ৩০ লাখ (৭.৩০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার।

মূলত বিদেশে কর্মরত মানুষেরা তাদের উপার্জিত টাকা নিজ দেশে পাঠালে সেই টাকাকে রেমিট্যান্স বলে। রেমিট্যান্স হলো দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি এবং উন্নয়নের ভিত্তি, স্বপ্নের সোনালী সোপান ও অন্যতম চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশের জন্য বৈদেশিক সম্পদ অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস হল রেমিট্যান্স। বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা থেকে পাওয়া উন্নয়ন সহায়তার চেয়ে এর ভূমিকা ও গুরুত্ব অনেক বেশি এবং বেসরকারি ঋণ সংস্থান ও পোর্টফোলিও ইকুইটি প্রবাহের চেয়েও অনেক বেশি স্থিতিশীল। অর্থনৈতিক উন্নয়নে রেমিট্যান্সের অবদান মোট জিডিপির ১২ শতাংশের মতো।

বিগত চল্লিশ বছরে প্রায় ১ কোটি ২৫ লক্ষ প্রবাসী বিদেশে গমন করেছে এবং তা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিজেদের কষ্টার্জিত উপার্জনের অর্থ নিয়মিত পাঠিয়ে তাঁরা এ দেশকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষে গড়ে তোলেন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১৬.৪২ বিলিয়ন ডলার এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৮.২০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আহরণ। তৈরী পোশাকের পরে অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অবদান সবচেয়ে বেশী অর্থাৎ দ্বিতীয় স্থান যা দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে রাখতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। প্রবাসীদের কারণে এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ রেকর্ড পরিমানে আছে এবং যার পরিমান অক্টোবর ২০২০ শেষে ৪০.৮২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের অক্টোবরে রেমিট্যান্স এসেছে ২১১.২৪ কোটি ডলার এবং জুলাইয়ে ২৫৯.৯৬ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১০০.১৯ কোটি ডলার বেশি। চলতি বছরের জুলাই একক মাস হিসা‌বে স‌র্বোচ্চ রে‌মিট্যান্স আহরণ হ‌য়ে‌ছে। রেমিট্যান্সের বিদ্যমান ধারা অব্যাহত থাকায় অক্টোবর ২০২০ মাসের শেষে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪০.৮২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছছে।

মহামারির মধ্যে অবৈধ পথ (হুন্ডি) প্রায় বন্ধ হওয়ায় ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানো বাড়ার কারণ হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তাছাড়া দেশে স্বজনদের বাড়তি চাহিদা পূরণে এবং অনেকে চাকরি হারিয়ে বা ব্যবসা গুটিয়ে নিয়ে দেশে ফিরতে জমানো সব অর্থ দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। তাই বৈশ্বিক আর্থিক সঙ্কটের মধ্যেও রেমিট্যান্স আন্তঃপ্রবাহ বেড়েছে।

এদিকে প্রবাসী আয়ের এ ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকার জন্য সরকারের ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, অপ্রত্যাশিত অভিঘাত কোভিড-১৯-এর প্রভাবে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে সারা বিশ্ব। এ সময়টাতে আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা কষ্ট করে অর্থ প্রেরণ করে আমাদের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে চালকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে বিদেশ থেকে বৈধপথে রেমিট্যান্স তথা প্রবাসী আয় পাঠালে ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেয়া হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। এর পরপরই রেমিট্যান্স বাড়তে শুরু করলে অনেকেই বলতে শুরু করেন- ‘এগুলো ঠিক নয়, থাকবে না, টেকসই নয়’। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাস যখন অসাধারণ এবং অবিশ্বাস্য গতিতে রেমিট্যান্স অর্জিত হচ্ছিল তখন কর্মীরা তাদের কাজকর্ম বা ব্যবসা গুটিয়ে দেশে ফিরে আসছে বলে বিভিন্ন মন্তব্য করতে শুরু করে। সেই সমস্ত লোকদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থাও তাল মিলিয়ে বলতে শুরু করে এ প্রবাহ ঠিক নয়, টেকসই হবে না। কিন্তু প্রণোদনা ঘোষণার পর থেকে আজ পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধির যে প্রবাহ, তাতে তাদের ভবিষ্যদ্বানী ভুল প্রমাণিত হয়েছে এবং আমরা যে সঠিক ছিলাম আরও একবার তা প্রমাণিত হলো। সরকারের এ অভূতপূর্ব সাফল্যে অর্থমন্ত্রী প্রবাসীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান।

প্রবাসীদের অর্জিত অর্থের একটা অংশ ব্যাংকের মাধ্যমে পরিবারের কাছে পাঠায়। এই অর্থ কেবল তাদের পরিবারের প্রয়োজনই মেটায় না, তাদের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি করে, অবকাঠামো উন্নয়ন, সঞ্চয়ে উদ্ভূদ্ধকরণ এবং নানা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ হয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমাদের অর্থনৈতিক গতিশীলতার ক্ষেত্রে রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ নিউক্লিয়াস হিসাবে কাজ করে। জাতীয় অর্থনীতির তাই অন্যতম চালিকাশক্তি এই রেমিট্যান্স। রেমিট্যান্সের উপর ভর করেই এখন আমরা পদ্মা সেতুসহ অনেক বড় বড় প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করার সাহস দেখাচ্ছি। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের জন্য আমাদের আত্মবিশ্বাস ও সামর্থ্য বেড়েছে। আমরা এতদিন সহজ শর্তে ছোট ছোট ঋণ নিতাম। এখন আমরা বড় ঋণ নেয়ার সাহস অর্জন করেছি। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে বলে অনেকে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এবং রেমিট্যান্স এক্ষেত্রে বড় সাহস ও নিয়ামক হিসাবে কাজ করবে।

রেমিট্যান্স একই সঙ্গে দেশের বেকার সমস্যা ও কর্মসংস্থান নিরসনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাছাড়া জনশক্তি রফতানির ফলে বিরাট সংখ্যক জনগণের দৈনন্দিন চাহিদা ও খাদ্যসামগ্রীও স্থানীয়ভাবে জোগাড় করতে হচ্ছে না। সারা বিশ্বের দেড় শতাধিক দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে প্রায় সোয়া কোটি বাংলাদেশি, যারা সার্বিকভাবে আমাদের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছেন।

আমাদের অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এই জনসংখ্যা রফতানি নিশ্চিত বিনিয়োগ হিসাবে বিবেচিত। শুধু নিশ্চিত বিনিয়োগ নয়, নিরাপদ বিনিয়োগ হিসাবেও জনসংখ্যা রফতানিকে বিবেচনা করা যায়। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে জনসংখ্যা রফতানির যেমন প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে, তেমনি বিদেশে কর্মরত জনশক্তির পারিশ্রমিক যাতে কাজ ও দক্ষতা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়, সেজন্যেও সরকারকে উদ্যোগী ভূমিকা রাখতে হচ্ছে। মনে রাখতে হবে যে, জনসংখ্যা রফতানি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সরকার যদি কূটনীতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করে, তাহলে জনসংখ্যা রফতানির সুফল ও রেমিট্যান্স প্রবাহ আমাদের অর্থনীতির ইতিবাচক খাতের সঙ্গে একই ধারায় প্রবাহিত হবে।

বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানি খাতে রেমিট্যান্স আয় আরো বাড়ানোর জন্য হুন্ডি প্রতিরোধ করার জন্য সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক নানামুখি পদক্ষেপ নিয়েছে কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। বর্তমানে মোট উপার্জিত রেমিট্যান্সের বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও কোরিয়ার রেমিট্যান্সের ২৩.৩০ শতাংশই হুন্ডির মাধ্যমে দেশে আসছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণ করার ক্ষেত্রে নানা ঝামেলা থাকায় প্রবাসীদের অনেকেই হুন্ডির মাধ্যমে তাদের টাকা দেশে প্রেরণ করছে। তবে গত অর্থবছরে চালু করা ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনা হুন্ডি প্রতিরোধে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।

প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের কারণে শত সমস্যা কিংবা প্রতিকূলতার মধ্যেও বৈদেশিক মুদ্রায় বাংলাদেশ তুলনামূলক নিরাপদ অবস্থানে আছে। পৃথিবীর ১৬৯টি দেশে বাংলাদেশের প্রায় সোয়া কোটি প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা কাজ করছে। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশেরই কর্মসংস্থান মধ্যপ্রাচ্যে। করোনায় যখন সারা বিশ্বের বৃহৎ অংশ লকডাউনে ছিল, তখন প্রবাসী বাংলাদেশিরাও সমূহ বিপদে পড়েছিল। আমেরিকা, ব্রিটেন, ইতালি, মধ্যপ্রাচ্য ও সিঙ্গাপুরে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি করোনায় আক্রান্ত হয়েছিল। নিউ ইয়র্ক, লন্ডন, ইতালির বিভিন্ন শহরসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে অসংখ্য প্রবাসী মারা গেছে। এই মৃত্যু একদিকে যেমন আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির, তেমনি কাজকর্মের বিভিন্ন জটিলতায় ঝুঁকির মধ্যে আছে প্রবাসী আয়-উপার্জনে।

আমাদের জিডিপিতে প্রবাসী আয়ের অবদান অন্তত ১২ শতাংশ। কাজেই আমাদের প্রবাসী আয় যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে তা দেশের অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত হিসাবে দেখা দিবে। বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির প্রভাবে ভবিষ্যতে প্রবাসীদের টাকা পাঠাবার পরিমাণ কমে যেতে পারে, সে আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

করোনা সুনামি আর কতদিন অব্যাহত থাকবে, এখনও তা কেউ বলতে পারছে না। প্রথম ঢেউ শেষ হতে না হতেই দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। সুতরাং আমরা এখনও জানি না আমাদের কী পরিমাণ প্রবাসী শ্রমিক তাদের কাজ হারাবে। করোনা পরবর্তী আগামী বিশ্ব হবে অত্যন্ত জটিল। তা মোকাবিলার জন্য সঠিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন দরকার। রেমিট্যান্সের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য তাদের প্রতি সুদৃষ্টি অব্যাহত রাখতে হবে।

Leave a Reply