ব্যাংকারদের সর্বনিন্ম ও সর্বোচ্চ বেতন কাঠামোর ব্যবধান ৫৮ গুণ

বর্তমানে ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের আকার ১৫ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। শিল্পায়নসহ অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তিই হচ্ছে ব্যাংক খাত। এই বিশাল কর্মকাণ্ডে জড়িত প্রায় দুই লাখ ব্যাংকার। কিন্তু ব্যাংকারদের সর্বনিন্ম ও সর্বোচ্চ বেতন কাঠামোর ব্যবধান ৫৮ গুণ। এক ধাপ থেকে আরেক ধাপের বেতনের পার্থক্যও অনেক। বেতন বৈষম্যর এ হারকে অমানবিক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

টেকনো ইনফো বিডি‘র প্রিয় পাঠক: প্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও চাকরির গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ টেকনো ইনফো বিডি তে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন।

বাংলাদেশের ব্যাংকারদের বেতন বৈষম্য কেমন তা জানতে একাধিক ব্যাংকের বেতন কাঠামো নিয়ে একটি পর্যালোচনামূলক প্রতিবেদন তৈরি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বিদ্যমান বেতন কাঠামো নিয়ে একটি গড় প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

আরও দেখুন:
চাকরিচ্যুত ব্যাংকাররা ঘুরছেন দ্বারে দ্বারে
চাকরিচ্যুত ব্যাংকারদের পুনর্বহালে ব্যাংকার্স ওয়েলফেয়ারের আহ্বান

প্রবেশকালীন ব্যাংকারের বেতন যেখানে মাত্র ২৬ হাজার টাকা, সেখানে সর্বোচ্চ পদে থাকা ব্যবস্থাপনা পরিচালক পাচ্ছেন মাস শেষে ১৫ লাখ টাকা। সর্বনিন্ম পদে থাকা ব্যাংকারের চেয়ে সর্বোচ্চ পদধারীর বেতন প্রায় ৫৮ গুণ বেশি। এটি একটি গড় হিসাব। কয়েকটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বেতন ও সুবিধাদি ২০ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে।

জানা গেছে, বর্তমানে দেশে ৬১টি তফসিলি বা বাণিজ্যিক ব্যাংক রয়েছে। এর মধ্যে ৫১টি বেসরকারি। এর মধ্যে ৯টি বিদেশি মালিকানাধীন। দেশীয় উদ্যোক্তাদের ব্যাংকের সংখ্যা হচ্ছে ৪২টি। এসব ব্যাংকের কর্মীদের মধ্যে পদ-বিন্যাস রয়েছে ১৫টি। অর্থাৎ ব্যাংকে এন্ট্রি লেবেল বা প্রবেশকালীন ও সর্বোচ্চ পদ ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মধ্যে পদ পার্থক্য হচ্ছে ১৫ ধাপের। একজন প্রবেশকালীন ব্যাংকারকে এই ১৩টি ধাপ পার করেই ব্যবস্থাপনা পরিচালক হতে হয়।

বেতন কাঠামোতে পদে পদে বৈষম্য তৈরি হয়েছে। বিশাল এ বৈষম্য দূর করে একটি ভারসাম্য ও যৌক্তিক পর্যায়ের বেতন কাঠামো তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই পদক্ষেপ বাস্তবায়নে উঠে এসেছে বেতন বৈষম্যের একটি চিত্র।

জানা গেছে, ব্যাংকভেদে এন্ট্রি বা প্রবেশকালীন একজন ব্যাংকারের পদবি হয় অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার। এ পদে চাকরির শর্ত হচ্ছে, শিক্ষাজীবনে দ্বিতীয় শ্রেণি নিয়ে ন্যূনতম স্নাতক পাস। এরপর লিখিত ও মৌখিক সাক্ষাৎকার দিয়ে টিকতে হয় বাছাইয়ে। সেই তরুণ ব্যাংকারের সাকুল্যে বেতন হচ্ছে ২৬ হাজার টাকা। কোনো কোনো ব্যাংকে এ বেতন মাত্র ১৬ হাজার টাকা।

সম্প্রতি এরকম একটি নিয়োগপত্রেরও সন্ধান পায় বাংলাদেশ ব্যাংক। যেখানে বেসরকারি একটি ব্যাংক অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার পদে নিয়োগ দিয়েছে মাত্র ১৬ হাজার টাকায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে এক স্নাতক পাস তরুণের বেতন এটি।

এর পরে ধাপ হচ্ছে অফিসার। বেতন ধরা হয়েছে ২৮ হাজার। পরের ধাপে কয়েক বছর চাকরি করার পর পদোন্নতি পেয়ে হন সিনিয়র অফিসার। তখন বেতন গিয়ে দাঁড়ায় ৩২ হাজারে। অবশ্য আর্থিক স্বাস্থ্যগত দিক দিয়ে ভালো অবস্থানে থাকা কয়েকটি ব্যাংক এখনও এসব পদে এর চেয়ে বেশি বেতন দিচ্ছে। আবার বিপরীত দিকে গত চার বছর ধরে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে না এমন ব্যাংকও আছে বাংলাদেশে।

সিনিয়র অফিসারের চেয়ে এক্সিকিউটিভ অফিসারের মধ্যে বেতন পার্থক্য হচ্ছে ১৮ হাজার। বর্তমানে একজন এক্সিকিউটিভ অফিসার পাচ্ছেন ৫০ হাজার টাকা মাসিক বেতন। সিনিয়র এক্সিকিউটিভের বেতন হচ্ছে ৬০ হাজার টাকা। পরের ধাপে অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট পান ৬৫ হাজার টাকা। এ পদ থেকে পদোন্নতি নিয়ে সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্টের বেতন ১০ হাজার টাকা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৭৫ হাজার টাকা। এর সঙ্গে ২০ হাজার টাকা যোগ করে ভাইস প্রেসিডেন্টের বেতন হয় ৯৫ হাজার টাকা।

এরপর ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্টের বেতন হচ্ছে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা। এখানে বেতনের পার্থক্য এক লাফে গিয়ে হয় ৩০ হাজার টাকায়। পদোন্নতি পেলে একজন ব্যাংকার পরের ধাপে হন সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট। তখন বেতন দাঁড়ায় এক লাখ ৫৭ হাজার টাকা।

এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট হলে বেতন দুই লাখ টাকায় উন্নীত হয়। সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে গেলেই বেতন পান তিন লাখ ৫১ হাজার টাকা। এখানে পার্থক্য দাঁড়ায় এক লাখ ৫১ হাজার টাকা। পরের ধাপ অর্থাৎ ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর বা উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পদের বেতন হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ, যা পাঁচ লাখ ২২ হাজার ৬০০ টাকা। পরের ধাপই হচ্ছে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এ পদের বেতন হচ্ছে ছয় লাখ ১২ হাজার ৬০০ টাকা। সর্বোচ্চ ধাপ ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদের বেতন হচ্ছে ১৫ লাখ টাকা মাস শেষে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে এ কাঠামো ঠিক রেখেই নতুন বেতন চালু করতে সর্বনিম্ন থেকে তিনটি ধাপের কর্মকর্তাদের সুবিধা বাড়াতে হবে। সে ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন বেতন ধরতে হবে ২৮ হাজার টাকা।

প্রসঙ্গত, গত ২০ জানুয়ারি বেসরকারি ব্যাংকের প্রবেশকালীন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সর্বনিন্ম বেতন নির্ধারণ করে নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেখানে উল্লেখ করা হয়, কর্মকর্তাদের শিক্ষানবিশকালে সর্বনিন্ম বেতন-ভাতা হবে ২৮ হাজার টাকা। আর শিক্ষানবিশকাল শেষ হলে বেতন-ভাতা হবে ৩৯ হাজার টাকা। আর ব্যাংকের অফিস সহায়কদের সর্বনিন্ম বেতন হবে ২৪ হাজার টাকা; যা আগামী মার্চ থেকে কার্যকর করতে হবে। এরপরই ব্যাংকগুলো এ নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা শুরু করেছে।

কর্মচারীদের বেতন কাঠামো-সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন জারির পর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে ব্যাংক খাতে। ব্যাংকগুলো এখন পর্যালোচনা ও হিসাব-নিকাশ করছে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে কত খরচ বাড়বে। এ ক্ষেত্রে প্রবেশকালীন কর্মকর্তাদের ও অফিস সহায়কদের (পিয়ন, ক্লিনার, মেসেঞ্জার, গার্ড ও চুক্তিভিত্তিক) বেতন বৃদ্ধিতে কত টাকা বাড়তি খরচ হবে। আর বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাস করতে গিয়ে খরচের পরিমাণ কত বাড়বে সে হিসাবটি কষছেন ব্যাংকাররা। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে ব্যাংক খাতের প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচ হবে।

Related Articles

২ Comments

  1. বাংকারদের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের বেতন খুবই কম দেওয়া হয় একজন সিকিউরিটি গার্ড বেতন পায় ১০ হাজার টাকা কিন্তু তার মাস শেষে দেখা যায় বাজার খরচ বাসা ভাড়া সব মিলিয়ে 15 হাজার টাকার মতো খরচ হয় অথচ সে প্রায় 10,000 এখানে । ৫০০০ হাজার টাকা প্রতিমাসে ঋণগ্রস্ত থাকা যায়

Leave a Reply

Back to top button