ইসলামিক ধারার ব্যাংকগুলোয় খেলাপির হার অর্ধেক

0
খেলাপি ঋণ

দেশে ক্রমেই বাড়ছে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের জনপ্রিয়তা। বর্তমানে মোট আমানত ও ঋণ বিতরণের এক-চতুর্থাংশই ইসলামিক ধারার ব্যাংকের দখলে। খেলাপি ঋণের হারও অন্যান্য ব্যাংকগুলোর তুলনায় অর্ধেক। ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই এই ধারার ব্যাংকিং এগিয়ে চলেছে বলে মত বিশ্লেষকদের। তাই কনভেনশনাল থেকে ইসলামি ধারাতে চলে যাচ্ছে অনেকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল শেষে ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৮৮ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে পুরোপুরি ইসলামিক ব্যাংক নামে পরিচিত আটটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৩৪৪ কোটি। হিসাব বলছে, এই আটটি ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণকৃত ঋণের চার শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এসব ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণকৃত ঋণের অঙ্ক ছিল দুই লাখ ৮৩ হাজার ২৯২ কোটি টাকা। অন্যদিকে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে বিতরণ করা হয় আট লাখ ৭৫ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছিল ৭৭ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা। হিসাব অনুযায়ী এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার শতকরা আট দশমিক ৮৪ ভাগ।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অপর এক প্রতিবেদন বলছে, ২০২০ সালে বিতরণকৃত মোট ঋণের ২৫ দশমিক ৬৯ শতাংশ ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর দখলে। এছাড়া আমানত সংগ্রহের দিক থেকেও ইসলামি ব্যাংকের আওতায় রয়েছে ২৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ। রেমিট্যান্স সংগ্রহের দিক থেকেও ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে ইসলামি ব্যাংকগুলোর অংশগ্রহণ। কারণ ২০২০ সালে আহরিত মোট প্রবাসী আয়ের ৪০ দশমিক ৫১ শতাংশ সংগ্রহ করেছে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো।

নতুন বছরে স্ট্যান্ডার্ড ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকিং সেবা চালু করছে। এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক গত ৩১ ডিসেম্বর পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, নতুন বছরের জানুয়ারি থেকে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংককে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ধারার ব্যাংকে রূপান্তর করা হলো। আর এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের নাম পরিবর্তন করে ‘গ্লোবাল ইসলামি ব্যাংক লিমিটেড’ করা হলো। এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ছিল প্রবাসীদের উদ্যোগে গঠিত একটি ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দেশের বেশিরভাগ মানুষ ধর্মপ্রাণ। দিন দিন সুদভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের চেয়ে শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকে আগ্রহ বাড়ছে। ফলে ব্যাংকগুলো তাদের ব্যবসায়িক কৌশল পাল্টাচ্ছে। এছাড়া প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে ৮৫ টাকা ঋণ দিতে পারে, অন্যদিকে ইসলামি ব্যাংকগুলো সেখানে ৯০ টাকা দিতে পারে। এছাড়া প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর নগদ জমা সংরক্ষণ হার এসএলআর ১৩ শতাংশ রাখার বাধ্যবাধ্যকতা রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে ইসলামি ব্যাংকগুলোর জন্য এ হার মাত্র সাড়ে পাঁচ শতাংশ। ইসলামি ব্যাংকগুলো যে কোনো সময় আমানতে মুনাফার হার পরিবর্তন করতে পারে। প্রচলিত ধারার ব্যাংক মেয়াদপূর্তির আগে তা পারে না। এসব কারণে প্রচলিত ধারার ব্যাংকের তুলনায় শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংক বেশি লাভজনক। তাই ব্যাংকগুলো ইসলামি ব্যাংকিংয়ে রূপান্তরে আগ্রহ দেখাচ্ছে।

এ ছাড়া কনভেনশনাল বা সাধারণ ব্যাংকিং করা যমুনা ব্যাংকও ইসলামি ব্যাংকিংয়ে রূপান্তর হওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি পেয়েছে। ব্যাংক তিনটি পুরোপুরি ইসলামি ধারার কার্যক্রম শুরু করলে দেশে ইসলামি ধারার ব্যাংকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১১টিতে। ইসলামি ব্যাংকিং চালু করতে ১০টির বেশি আবেদনপত্র বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রয়েছে। বাকি কনভেনশনাল ব্যাংকগুলোও ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রতি গুরুত্ব বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে আমানত ও বিনিয়োগের দিক থেকে এক-চতুর্থাংশই ইসলামি ব্যাংকিংয়ের দখলে।

বর্তমানে দেশে মোট ৫৯টি তফসিল ব্যাংক কার্যক্রমে আছে। এর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক রয়েছে আটটি। আর ১৭টি ব্যাংকের ইসলামি ব্যাংকিং শাখা বা উইন্ডো রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, আল-আরাফাহ্?, শাহ্?জালাল ইসলামী, এক্সিম, এসআইবিএল, ফার্স্ট সিকিউরিটি, আইসিবি ইসলামিক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এ ছাড়া ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো রয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানার সোনালী ও অগ্রণী ব্যাংকের। তালিকায় আছে বেসরকারি খাতের পূবালী, এবি, দি সিটি, প্রাইম, সাউথইস্ট, ঢাকা, স্ট্যান্ডার্ড, প্রিমিয়ার, ব্যাংক এশিয়া, ট্রাস্ট ও যমুনা ব্যাংক। আর সর্বশেষ গত বছরের সেপ্টেম্বরে মার্কেন্টাইল ব্যাংক ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডোর অনুমতি পেয়েছে। এ ছাড়া বিদেশি মালিকানার স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, আল-ফালাহ ও এইচএসবিসি ব্যাংকে ইসলামি ব্যাংকিং রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ
ইসলামী ব্যাংকের ১০% ক্যাশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা
বর্ধিত লকডাউনে ব্যাংক লেনদেন চলবে আগের নিয়মেই

Leave a Reply