অর্থ ও বাণিজ্য

দুঃস্বপ্নের বছর পার করলো ব্যাংক খাত

চলতি বছর ব্যাপক আর্থিক সংকটে ভুগেছে দেশের ব্যাংক খাত। বছরের শুরুতেই ডলারের সংকট দেখা দেয়। এর প্রভাবে এলসি খোলা বন্ধ হয়ে যায়। বাজার নিয়ন্ত্রণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কারসাজিতে জড়িত কয়েকটি এক্সচেঞ্জ হাউজের লাইসেন্স বাতিল করে আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ডলার কান্ডে ৬ ব্যাংকের এমডিকে শোকজ করা হয়। এসবের মধ্যেই খাতটিতে বেড়ে যায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ। আর্থিক প্রতিষ্ঠানকেও ছাড় দেয়নি খেলাপির মতো মহামারি।

টেকনো ইনফো বিডি‘র প্রিয় পাঠক: প্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও চাকরির গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ টেকনো ইনফো বিডি তে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন।

একই বছর ধারাবাহিকভাবে কমেছে রিজার্ভের পরিমাণ। চাপ বাড়তে থাকে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের রিজার্ভ সংরক্ষণের হিসাব পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে। বছরটিতে ব্যাপকহারে বেড়েছে সন্দেহজনক লেনদেন (এসটিআর) ও সন্দেহজনক কার্যক্রম (এসএআর)। এছাড়া এলসিতে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত ওভার ইনভয়েসিং করে অর্থ পাচার করা হয়েছে। এরই মধ্যে দেশের ১২তম গভর্নর হিসেবে আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান হিসেবে যোগ দেন।

করোনার পাশাপাশি বন্যা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ঋণ পরিশোধে ব্যাপক ছাড় দেওয়া হয়। এদিকে সংবাদকর্মীদের সঙ্গে তথ্য শেয়ার করার অভিযোগে বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্তত ১০ কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়। ডলার সংকট রোধে বিলাস পণ্য আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন সময় জব্দ করা স্বর্ণ নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

বছরটিতে ভয়বাহ ঋণ জালিয়াতিতে জড়িয়ে পড়ে দেশের ইসলামী ব্যাংকগুলো। এরপরে ব্যাপক তারল্য সংকট দেখা দেয় এসব ব্যাংকগুগলোতে। এরমধ্যে দুই ইসলামী ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। একইসঙ্গে কমতে থাকে রেমিট্যান্স। এছাড়া বাড়তে থাকে বাণিজ্য ঘাটতি।

জানা যায়, এক বছরে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩৩ হাজার কোটি টাকা। গত সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। এসময় খাতটিতে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। মোট ঋণের ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এসময় ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে (এনবিএফআইএস) মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৩২৭ কোটি ১০ লাখ টাকা। আর গত ৯ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪ হাজার ৩১১ কোটি টাকা।

এদিকে চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশের মধ্যে ব্যাপকহারে ডলার সংকট দেখা দেয়। চাপ সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের আমদানি দায় পরিশোধে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করা হয় ৬০৫ কোটি মার্কিন ডলার। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে রেকর্ড ৭৬২ কোটি ১৭ লাখ ডলার বিক্রি করে আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

ডলার সংকটকে পুঁজি করে বাড়তি সুবিধা নেয় দেশের ১২ ব্যাংক। অতিরিক্ত ডলার মজুত করে ৭৭০ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা কয়েকটি ব্যাংক। এসব অভিযোগের কারনে সিটি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ডাচ-বাংলা, প্রাইম ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক ও বিদেশি খাতের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের এমডিদের কারন দর্শানোর নোটিশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া খোলাবাজারে ডলার নিয়ে কারসাজি করায় অঙ্কন মানি এক্সচেঞ্জ, বিসমিল্লাহ মানি এক্সচেঞ্জ ও ফয়েজ মানি এক্সচেঞ্জসহ পাঁচটি মানি চেঞ্জারের লাইসেন্স স্থগিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া ৯টি প্রতিষ্ঠানকে সিলগালা ও ৪২ মানি এক্সচেঞ্জকে শোকজ করা হয়।

দেশে ডলার সংকট দেখা দিলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। এতে ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে রিজার্ভ। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলারের আশেপাশে ঘুরছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের রিজার্ভ সংরক্ষণের হিসাব পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

এসময় আন্তর্জাতিক মানদন্ডে রির্জাভের হিসাব রাখাসহ বেশকিছু সংস্কারের পরামর্শ দেয় আইএমএফ। বাংলাদেশ ব্যাংকও এসব পরামর্শ মেনে চলার চেষ্টা চালায়। রিজার্ভের ক্ষেত্রে আইএমএফ ও দেশীয় দুই হিসাবই থাকবে বলে জানায় অর্থমন্ত্রী।

এর ফলে আইএমএফ থেকে চার বিলিয়ন ডলারের ঋণ পাওয়ার পথটাও অনেকটা সহজ হয়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক মানদন্ডে রির্জাভের হিসাব পদ্ধতিতে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলসহ কয়েকটি তহবিলে বিনিয়োগ করা ৮ বিলিয়ন ডলার বাদ দিতে হবে। এটি বাদ দিলে রিজার্ভ থাকে ২৬ বিলিয়ন ডলার। যা দিয়ে বর্তমানে সাড়ে চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো যাবে। অর্থাৎ খরচ করার মতো এখন ২৬ বিলিয়ন ডলারের আশে পাশে রিজার্ভ রয়েছে।

বিএফআইইউর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে আর্থিক খাতে সন্দেহজনক লেনদেন বেড়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে সন্দেহজনক লেনদেন (এসটিআর) ও সন্দেহজনক কার্যক্রম (এসএআর) প্রতিবেদন হয়েছে ৮ হাজার ৫৭১টি। এর আগের অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ২৮০টি। এছাড়া দেশে এলসির ক্ষেত্রে ২০ থেকে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত ওভার ইনভয়েসিং করা হচ্ছে। ওভার ইনভয়েসিং করা ১০০ এলসি বন্ধ করা হয়। তবে ব্যবসায়ীরা চাইলে পরে তা সংশোধন করে প্রকৃত দরে আমদানি করতে পারবেন।

আর্থিক খাতের এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংকের ১২তম গভর্নর হিসেবে যোগ দেন আবদুর রউফ তালুকদার।

করোনার মধ্যে দেশের ব্যবসায়ী-শিল্পোদ্যোক্তাদের ঋণ পরিশোধে বেশ কয়েক দফা ছাড় বিশেষ ছাড় দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপরে বন্যা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আবারও এই ছাড় দেওয়া হয়। নিয়মিত থাকা ঋণে এসব সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

এদিকে সংবাদকর্মীদের সঙ্গে তথ্য শেয়ার করার অভিযোগে বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্তত ১০ কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়। এসময় বাংলাদেশ ব্যাংকে সাংবাদিক প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। বিষয়টি নিয়ে সব মহলের সমালোচনা শুরু হলে আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

ডলার সংকট প্রকট আকার ধারণ করলে আমদানি ব্যয় কমানোয় মনযোগী হয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এলক্ষ্যে মোটরকার, হোম অ্যাপ্লায়েন্স হিসেবে ব্যবহৃত ইলেকট্রিক্যাল এবং ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলার ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৭৫ শতাংশ নগদ মার্জিন সংরক্ষণ করার কথা বলা হয়। একই সঙ্গে অতি জরুরি পণ্য ছাড়া অন্য সকল পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নগদ মার্জিন সংরক্ষণ করতে বলা হয়।

এছাড়া বিভিন্ন সময় জব্দ করা স্বর্ণ নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রাথমিকভাবে ২ হাজার ১৭০ ভরি স্বর্ণ বিক্রির কথা রয়েছে। স্বর্ণ বিক্রির এই নিলামে লাইসেন্সধারী ব্যবসায়ীরা অংশ নিতে পারবেন।

আলোচ্য বছরটিতে ইসলামী ব্যাংকগুলোতে ব্যাপক ঋণ কেলেঙ্কারি হয়েছে। এসময় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড থেকে ১১টি অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে তিনটি প্রতিষ্ঠান নিয়েছে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে চারটি প্রতিষ্ঠান নিয়েছে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর নথিপত্র অনুযায়ী, এসব ব্যাংক থেকে অন্তত ৩০ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।

ব্যাপক ঋণ জালিয়াতির তথ্য প্রকাশ পেলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এতে আমানত তুলে নিতে শুরু করেন আমানতকারীরা। এসবের কারণে ইসলামী ব্যাংকগুগলোতে তারল্য সংকট দেখা দেয়। সাম্প্রতিক সময়ের চলমান তারল্য সংকট কাটাতে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে তারল্য সহায়তা হিসেবে নগদ টাকা বিতরণের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। অপরদিকে ব্যাপকহারে এসব ব্যাংকগুলোর আমানত কমছে।

এমন পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে দুইজন পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ পাওয়া আবুল কালাম কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক। আর ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকে নিয়োগ পাওয়া মোতাসিম বিল্লাহ পেমেন্ট সিস্টেম ডিপার্টমেন্টের পরিচালক। পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া এ দুই কর্মকর্তা ইসলামী ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদের সবগুলো সভায় অংশ নেবেন বলে জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

ডলার সংকটের মধ্যেই বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুটি খাতে ধাক্কা লাগে। কমতে থাকে রেমিট্যান্স ও বাড়তে থাকে বাণিজ্য ঘাটতি। আমদানির চেয়ে রপ্তানি আয় কম হওয়ায় চলতি (২০২২-২৩) অর্থবছরের শুরু থেকে বড় অঙ্কের বাণিজ্য ঘাটতি দেখা দেয়। গত অক্টোবর মাস নিয়ে টানা চার মাস বাণিজ্য ঘাটতিতে পড়তে হয় দেশকে। এ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) মোট বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৫৮ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার।

আরও দেখুন:
সীমা লঙ্ঘন করে আগ্রাসী ঋণ দিয়েছে ৯ ব্যাংক
তুলে নেয়া আমানত ফের জমা হচ্ছে ব্যাংকে
সংকটে ব্যাংকের ওপরই ভরসা রাখুন: মাসরুর আরেফিন

এছাড়া চলতি ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই ও আগস্ট) টানা ২ বিলিয়ন ডলার করে রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে। এর পরের মাস সেপ্টেম্বর থেকে টানা তিন মাস দেড় বিলিয়ন ডলারের ঘরে আসে রেমিট্যান্স। সবশেষ সদস্য বিদায়ী নভেম্বর মাসে রেমিট্যান্সন এসেছে ১৫৯ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। এদিকে চলতি মাসের প্রথম ২৩ দিনে রেমিট্যান্স এসেছে ১২৮ কোটি ৪১ লাখ ডলার।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button