ব্যাংকিং খাতকে উপযুক্ত শৃঙ্খলায় আনতে হবে

ব্যাংকিং খাতকে অর্থনীতির চালিকাশক্তি বলা হয়। ব্যাংকের অন্যতম কাজ হল, দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসার চাকা সচল রাখতে ঋণ দেয়া এবং সময়মতো সে ঋণ আদায় করা। ব্যাংকের প্রধান সম্পদই হল এ ঋণ। যে কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নিরাপদ, কল্যাণমুখী খাতে বিনিয়োগসহ শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা অপরিহার্য।

আরও পড়ুন: ব্যাংকে নারী কর্মী ও গ্রাহক উভয়ই বাড়ছে

ব্যাংকের সঙ্গে যাদের লেনদেনের সম্পর্ক তারা বেশির ভাগই শিক্ষিত, সচেতন; সবারই চোখ-কান খোলা। সবাই জানে ও বোঝে প্রশিক্ষিত ও সৎ কর্মকর্তার সমন্বয়ের সঙ্গে জনস্বার্থ, আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ ছাড়া কোনো ব্যাংক সাফল্য অর্জন করতে পারে না। অতীত ও বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে লুটপাটের প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব ছিল স্পষ্ট। দেশের ব্যাংকিং খাতে সমস্যার শেষ নেই। ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম, ঋণ বিতরণে রাজনৈতিক প্রভাব ইত্যাদি কারণে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এছাড়া বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে পরিচালকরা নিজেদের মধ্যে ঋণ ভাগাভাগিসহ আমানত খেয়ে ফেলায় সেখানেও খেলাপির সংখ্যা ভয়াবহ।

টেকনো ইনফো বিডি‘র প্রিয় পাঠক: প্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও চাকরির গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ টেকনো ইনফো বিডি তে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন।

ব্যাংক করার ব্যাপারে সরকারি ঘরানার ধনাঢ্যরা এতো আগ্রহী থাকে কেন? কী তাদের উদ্দেশ্য? কী বিধেয়? এসব নিয়ে সাধারণ মানুষ নানান প্রশ্ন করলেও তাদের কথা পাত্তা দেয়ার গরজ মনে করেনি কোন সরকারই। কিছুদিন আগে রাষ্ট্রের সাবেক প্রধান আইন কর্মকর্তা এটর্নী জেনারেল বলেছিলেন, এখন অনেকেই ব্যাংক করেন জনগণের টাকা লুটের জন্য। তা-ও মেঠো বক্তৃতায় নয়। তিনি কথাটা বলেন উচ্চ আদালতে শুনানিতে। যেখানে ছিলেন স্বয়ং তৎকালীন প্রধান বিচারপতি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের কথার ভ্যালু না দিলে সরকারের কিছু হয় না। কিছুই যায়-আসে না। কিন্তু এটর্নি জেনারেল নিশ্চয়ই কোন জেনারেল মানুষ নন। রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তার এ বক্তব্যকে বাতকা বাত বা কথার কথা মনে করে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ থাকে না। শুধু অ্যাটর্নি জেনারেল নন, হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ থেকেও কঠিন পর্যবেক্ষণ এসেছিল ব্যাংকিং খাত নিয়ে। একটি রিটের শুনানিতে বিচারপতিদের সমন্বিত বেঞ্চ বলেছে, দেশের ব্যাংক খালি হয়ে গেছে, হাজার হাজার কোটি টাকা দেশের বাইরে চলে গেছে। এখন বেসরকারি ব্যাংকের মতো সরকারি ব্যাংক থেকেও টাকা চলে গেলে এ খাতে ধস নামবে।

আরও দেখুন: ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে সোনালী ব্যাংকের চমক!

ব্যাংকিং খাতের লুটপাট, অর্থপাচার নিয়ে আদালতের মনোযোগ মহলবিশেষকে সেইসময় আশাবাদী করলেও এখন হোচট খেতে হচ্ছে। খোদ আদালত থেকেই বলা হচ্ছে, এমন ব্যাংক কিভাবে প্রতিষ্ঠা হয়? কারা ব্যাংকের অনুমোদন পান? কারা দেন অনুমতি? আবার চুরি বা লুট করার পরও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উপরন্তু প্রণোদনা কেন? আদালতের প্রশ্নগুলো কিছুদিন সাধারণ মানুয়ের মুখে মুখে ঘুরলেও এখন প্রায় অজানা।

বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে অনিয়ম রেখে সুষম উন্নয়ন ও উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। সুশাসনের অভাব, উচ্চ করহার, আর্থিক অপরাধ ও চুরি এবং নীতির ধারাবাহিকতা না থাকার কারণে ব্যবসার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দিনদিন। দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ব্যাংকিং খাতকে ইতিবাচক ধারায় রাখা এবং কোম্পানি, বীমাসহ সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের সৎ ও সহজ বোঝাপড়া দরকার, এটা যেন কেউই মনেই করেন না। দেশের ব্যাংকিংখাত লুটপাটের এমন নিরাপদ এবং অবৈধ পথ কিন্তু একদিনে হয়নি। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো দরকারের কথা মুখে বললেও কোন গরজ নেই বা থাকলেও তা অস্পষ্ট। লুটেরাদের পক্ষে সাফাই এবং তাদের বাঁচিয়ে দেয়ার চেষ্টা সব সময়ের জন্য স্পষ্ট।

অপরদিকে দেশের ব্যাংক পরিচালকদের ঋণকান্ড এখন আর তেমন কোন অপরাধের ঘটনা নয়। সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে শক্ত কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় একে এক প্রকার অধিকারের মধ্যে নিয়ে এসেছেন তারা। এ ব্যাপারে অবশ্য পরিচালকদের পারস্পরিক বোঝাপড়া কিন্তু চমৎকার। ভাগেযোগে তাদের মধ্যে বেশ মিলমিশ। তারা পরস্পর যোগসাজশে একে অন্যের ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন এক প্রকার মামাবাড়ীর মতো। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট- বিআইবিএমের গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাংকিং খাতে সংঘটিত ৯০ শতাংশ অনিয়ম অপরাধে জড়িত ব্যাংকের নিজস্ব লোকজন। কারণ, পরিচালকদের হাতেই রয়েছে ব্যাংকের বেশিরভাগ ক্ষমতা। ফলে খেলাপিরা শাসন বা বাধার পরিবর্তে উল্টো প্রণোদনা পেয়ে চলছেন। এটা ব্যাংক খাতকে বৈষম্যের খাদে ফেলে দিয়েছে। প্রকৃত বা ভালো গ্রাহকরা হচ্ছে নিরুৎসাহিত, হতাশ। ব্যাংক পরিচালকরা অন্য ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণে ঋণ নিচ্ছেন। স্বাভাবিকভাবেই এতে অন্য গ্রহীতা বঞ্চিত হচ্ছেন। বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালকদের বেশির ভাগই দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। ব্যাংক ব্যবসার পাশাপাশি অন্য ব্যবসাও তাদের কব্জায়। আগে পরিচালকরা নিজ ব্যাংক থেকেই বেশি মাত্রায় ঋণ নিতেন এবং পরিশোধ করতেন না। যখন খেলাপি হয়ে যেত, তখন বেনামি ঋণ সৃষ্টি করে ওই ঋণ পরিশোধ দেখাতেন। আবার অনৈতিকভাবে নিজেদের ঋণের সুদ মওকুফ করে নিতেন। পরিচালকদের এ অনৈতিক কার্যক্রম ঠেকাতে নিজের ব্যাংক থেকে কী পরিমাণ ঋণ নেওয়া যাবে তার একটি সীমা বেঁধে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমানে একজন পরিচালকের নিজের ব্যাংক থেকে শেয়ার পরিশোধিত মূলধনের ৫০ শতাংশ ঋণ নেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে এক ব্যাংকের পরিচালকের অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে এ রকম কোনো সীমা টানা নেই। তাই পরিচালকরা কাজে লাগিয়েছেন এই সুযোগ। নিজেদের ব্যবসার প্রয়োজনে দেখিয়ে তারা অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন ফ্রিস্টাইলে।

স¤প্রতি খেলাপি কমিয়ে আনতে এই খেলাপিদের ২ শতাংশ হারে ডাউন পেমেন্টের সুবিধা দিয়ে ঋণ নিয়মিতকরণসহ আরও নানান সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এতে খেলাপি ঋণ কমেনি। আরো বেড়েছে। তাদের ঋণ দেওয়ার সময় যাচাই-বাছাই থাকছে না। রাজনৈতিক সংযোগ থাকা ঋণগ্রহীতারা এমনিতেই প্রভাবশালী। ব্যাংকের পরিচালক বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের শুধু ঋণের ব্যবস্থাই করেন না, ক্ষেত্রবিশেষে তোয়াজও করেন।

এ সংক্রান্ত তথ্য বড় ভয়াবহ। দেশে বর্তমানে তফসিলি ব্যাংক ৬০টি। এগুলোতে ঋণগ্রহীতা এক কোটি ছয় লাখ ৫৫ হাজার ৪৫৯ জনেরও বেশী। আর পরিচালক প্রায় এক হাজারের মতো। এর মধ্যে ৫৫টি ব্যাংকের পরিচালকরা অন্য ব্যাংক থেকে এবং ২৫ ব্যাংকের পরিচালকরা নিজ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন। দেশে বর্তমানে মোট আমানতকারী ১০ কোটি তিন লাখ ৩৭ হাজার ১৯৬ জন। মোট আমানতকারীর তুলনায় পরিচালকের সংখ্যা একেবারে সামান্য। অথচ ঋণ হাতানোতে তারাই শীর্ষে। মাত্র গুটিকয়েক এই ব্যাংক পরিচালক বিভিন্নভাবে ও মিলেমিশে ঋণ নিয়েছেন প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকাও বেশী। এসব ঋণের বড় অংশ খেলাপি হলেও বছরের পর বছর তা নিয়মিত হিসেবে প্রদর্শন করে যাচ্ছেন তাঁরা। এভাবে খেলাপি হয়েও ব্যাংক পরিচালক পদে বহাল তারা। নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও চলছে এমন ঋণ কব্জার মহাযজ্ঞ।

সা¤প্রতিক এক তথ্যে তাদের ঋণ হাতানোর ভয়ানক খবর প্রকাশ হয়েছে। এতে দেখা যায়, দেশের ১০ কোটি আমানতকারীর ব্যাংকে জমানো লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে নিয়ে নিজেদের পকেটে পুরেছেন মাত্র কয়েক শ ব্যাংক পরিচালক। দেশের উন্নয়নে অবদান রাখার বাহানায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে এই দুষ্কর্মটি চালিয়েছেন তারা। এসব ঋণের বড় অংশ খেলাপি হলেও বছরের পর বছর তা নিয়মিত হিসেবে প্রদর্শন করা হচ্ছে। তারা ব্যাংকের পরিচালক হনই ব্যাংক থেকে ঋণ হাতিয়ে নিতে। ডিভিডেন্ড পাওয়ার আশায় তারা ব্যাংকের শেয়ার কেনেন না। ডিভিডেন্ড পাওয়ার আশায় শেয়ার কিনলে তাঁরা কখনো ঋণ নেওয়ার চিন্তা করতেন না। কয়েক কোটি টাকা পুঁজি নিয়ে ব্যাংকের পরিচালক হয়েছিলেন এমন অনেকেই এখন শত-হাজার কোটি টাকার মালিক। আর তা সম্ভব হয়েছে ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ঋণ বের করে নেওয়ার কারণেই। শুধু পরিচালকরা নন, ব্যাংক থেকে তাঁদের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবও ক্ষমতার জোরে নিয়মবহির্ভূত ঋণ নিয়েছেন। অনৈতিক চাপ ও প্রভাব বিস্তার করে নেওয়া ঋণ তাঁরা ঠিকমতো ফেরতও দেন না। পুনঃ তফসিল করে বছরের পর বছর নিয়মিত রাখতে বাধ্য করেন।
স¤প্রতি আরেকটি বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ তিনজন পরিচালকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ২০৫ কোটি টাকা ঋণ অনিয়মের তথ্য উদ্ঘাটন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিজের খেলাপি প্রতিষ্ঠান বিক্রি ও নামস্বর্বস্ব প্রতিষ্ঠান বানিয়ে নামমাত্র জামানতে এই ঋণ বের করে নেওয়া হয়েছে। বেসরকারি একটি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে নতুন আরেকটি ব্যাংকে ১০ কোটি টাকার শেয়ারে বিনিয়োগ করার অভিযোগে স¤প্রতি এক ব্যাংক পরিচালক পদ থেকে একজনকে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই ব্যাংকের আরেকজন পরিচালক অন্য দুটি ব্যাংকে খেলাপি হয়েও দীর্ঘদিন পরিচালক পদে বহাল ছিলেন। এ ছাড়া কয়েকটি ব্যাংকের আরো কিছু পরিচালক খেলাপি হলেও আদালতে রিট করে পরিচালক পদে দিব্বি বহাল আছেন। এই নৈরাজ্যের প্রভাব পড়ছে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে। সৎ উদ্যোক্তা ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা পর্যাপ্ত ঋণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

যারা ব্যাংকের মালিক, তারাই ব্যবসায়ী। তাদের কেউ কেউ আবার আইন প্রণেতাও। এর ফলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। গত কয়েক বছরে ব্যাংকে পরিচালকদের হস্তক্ষেপে বেশ কিছু আলোচিত জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কিছু পরিচালকের স্বার্থসংশ্লিষ্টতায় সোনালী ব্যাংকে ঘটেছে হলমার্ক কেলেঙ্কারি। বেসিক ব্যাংকে হয়েছে নজিরবিহীন লুটপাট। কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালকদের সংশ্লিষ্টতায় ঘটেছে বিসমিল্লাহ গ্রæপের জালিয়াতি। পরিচালকদের হস্তক্ষেপে সরকারি ব্যাংকের সিএসআরের টাকা নিয়ে নয়ছয় হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকে পরিচালকরা প্রভাব খাটিয়ে জামানতের সম্পদ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে কয়েক গুণ বেশি দেখিয়ে শত শত কোটি টাকার ঋণ বের করে নিয়েছেন। এখনও নিচ্ছেন। সংঘবদ্ধ চক্রের সুকৌশলে ব্যাংকের টাকা লুট রুখতে তেমন বেগ পেতে হয় না। ভুয়া কাগজপত্র মর্টগেজ হিসেবে দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে যাচ্ছেন এই জালিয়াতরা। আবার কোনো মর্টগেজ ছাড়াই করপোরেট গ্যারান্টির নামে দেদার ঋণ দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। যা যাচ্ছে তা আর ফিরে আসছে না।
এমনিতেই ব্যাংক নিয়ে দিন দিন মানুষের মধ্যে ভীতিকর অবস্থা বিরাজ করছে আবার সেইসঙ্গে গুজবও কম নয়। কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে গ্রাহকরা সব টাকা পাবেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এমন আশ্বাসের পরও মানুষ উদ্বিগ্ন। টেনশন কাটছে না কিছুতেই। বাজারে চাউর হয়েছে, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে গ্রাহকের যতো সঞ্চয়ই থাকুক প্রাথমিক পর্যায়ে পাবেন মাত্র এক লাখ টাকা। পরবর্তীতে নানা হিসাব-নিকাশ করে ধীরে ধীরে বাকি টাকা ফেরত পাবেন এবং তা কতদিন লাগবে, আদৌ পুরো টাকা পাবেন কি-না, ভোগান্তির মাত্রা কোন পর্যয়ে যাবে- এসব প্রশ্নের কোন জবাব নেই।

স¤প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে সুরক্ষার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে এই ভাবে যে, প্রস্তাবনায় ‘তহবিল এর দায়’ বিষয়ক ধারা-৭ এর (১) উপধারায় বলা হয়েছে, কোনও ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান এর অবসায়নের আদেশ হলে, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ওই অবসায়িত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক আমানতকারীকে তার বীমাকৃত আমানতের সমপরিমাণ (যা সর্বাধিক এক লাখ টাকা অথবা সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক সময়ে সময়ে নির্ধারিত টাকার বেশি হবে না) তহবিল হতে প্রদান করবে। প্রস্তাবনার ৭ এর (২) এর ধারায় বলা হয়েছে, অবসায়িত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কোনও আমানতকারীর একাধিক হিসাব থাকলে ওই হিসাবে যদি একত্রে এক লাখ টাকার বেশি স্থিতি থাকে তবুও তাকে সর্বাধিক এক লাখ টাকা কিংবা সরকারের পুর্বানুমোদনক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক সময়ে সময়ে নির্ধারিত টাকার বেশি পরিশোধ করা হবে না।

কোনও ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে এক লাখ টাকার বেশি পাবে না, অন্যান্য দেশেও আমানত সুরক্ষা আইনে এমনটি থাকে। কিন্তু অন্যান্য দেশে ব্যাংক থেকে এভাবে টাকা লুটপাট হয় না। নতুন আমানত সুরক্ষা আইনে এ নিয়ে কিছু প্রস্তাবনা রয়েছে। তা আগেও ছিল। এমন কি একই ব্যাংকে একাধিক একাউন্ট থাকলেও প্রাথমিক পর্যায়ে গ্রাহক এক লাখ টাকাই পাবেন। ব্যাংকব্যবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহালরা বলছেন, ‘কোন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে ৯৫% আমানতই বেহাত হয়ে যাবে। ব্যাংকের আমানতের সুরক্ষা দিতে ১৯৮৪ সালে সর্বপ্রথম একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। অধ্যাদেশকে ২০০০ সালে ব্যাংক আমানত বীমা আইন ২০০০-এ পরিণত করা হয়। এতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানত এ আইনের বাইরে ছিল। ২০১৭ সালে আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। স¤প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং অবসায়নের উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের কোনও নিশ্চয়তা নেই সেখানে। এর আগে ওরিয়েন্টাল ব্যাংক এবং দ্য ফারমার্স ব্যাংকের ক্ষেত্রেও একই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। অথচ এই লুটপাট ঠেকাতে বা সেই টাকা ফিরিয়ে আনতে এখনো দেশে শক্ত কোন আইন হয়নি।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুরক্ষার জন্যও নেই কোন সঠিক পরিকল্পনা। মনে রাখতে হবে, আমানতকারীরা তখনই সুরক্ষিত থাকবে, যখন ব্যাংক থেকে লুটপাট বন্ধ হবে।

লেখক: রিন্টু আনোয়ার, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button