কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় ছাড়ে কৃত্রিম মুনাফায় ব্যাংক খাত

0

তারল্য সংকট কাটিয়ে ওঠাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে একাধিক ছাড় দিয়ে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই ছাড়ের পেছনে করোনা মহামারিকে সামনে নিয়ে আসা হয়। সর্বশেষ ভোক্তা ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণে বড় ছাড় দিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এমন সিদ্ধান্তে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন সংরক্ষণ কমে যাবে। এ অর্থ যোগ হবে ব্যাংকের মুনাফায়।

এটিকে কৃত্রিম মুনাফা হিসেবে দেখছেন ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ব্যাংক ঋণের ঝুঁকি কমিয়ে আনতে বিভিন্ন হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। কিন্তু প্রভিশন কমিয়ে আনলে ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমে যাবে কিন্তু ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে।

যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক দাবি করছে, এতে ভোক্তা ঋণ বিতরণ বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ছাড়ে গ্রাহক পর্যায়ে কোনো লাভ হবে না। শুধু এক তরফাভাবে ব্যাংকের মুনাফা বাড়বে।

জানা গেছে, আবাসন, গৃহসামগ্রী, গাড়ি, পেশাদার ও ব্যক্তিগত ঋণ ইত্যাদি ভোক্তা ঋণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এর মধ্যে আবাসন ছাড়া সব ঋণের অশ্রেণিকৃত অংশের বিপরীতে মুনাফা থেকে পাঁচ শতাংশ হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হতো। শুধু ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে দুই শতাংশ ও আবাসনে এক শতাংশ হারে প্রভিশন রাখতে হতো।

গত সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। তাতে উল্লেখ করা হয়, এখন থেকে আবাসন খাত ছাড়া সব ধরনের ভোক্তা ঋণের বিপরীতে দুই শতাংশ হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে।

জানা গেছে, ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহ করে ঋণ বিতরণ করে থাকে। বিতরণ করা ঋণের বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয় ব্যাংকগুলোকে। আমানতের নিরাপত্তা ও ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য রক্ষায় এমন নির্দেশনা দিয়ে থাকে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে অধিক সতর্ক থাকে। কিন্তু প্রভিশনের হার কমিয়ে দেওয়ার ফলে ব্যাংকগুলোকে এখন থেকে আগের চেয়ে কম অর্থ সংরক্ষণ করতে হবে। এই অর্থ চলে যাবে ব্যাংকের মুনাফায়। এটিকে কৃত্রিম মুনাফা হিসেবে চিহ্নিত করছেন ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেন, ‘আমানতকারীদের অর্থ নিরাপদ করার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। ভোক্তা ঋণ বিতরণ বাজার ব্যবস্থার ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ কেন উৎসাহিত করবে। ব্যাংকের প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয় ঝুঁকি বিবেচনা করে। কোনো কারণে ঋণ আদায় না হলে প্রভিশন থেকেও সমন্বয় করতে পারে ব্যাংকগুলো। এখন সেটি কমে গেলে আর্থিক ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে। কৃত্রিম মুনাফা বাড়বে ব্যাংকগুলোর। এতে আমানতকারীদের আমানত অরক্ষিত হয়ে পড়বে।’

সূত্রমতে, টিভি, ফ্রিজ, গাড়ি, আবাসনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ভোক্তা ঋণগুলো সাধারণত জামানতবিহীন হয়ে থাকে। এ খাতের ঋণ দেওয়ার বেলায় কোনো নিরীক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান দিয়ে সম্পদের মূল্যায়ন করা হয় না। এজন্য এসব ঋণের ঝুঁকিও বেশি থাকে। সরকারি কর্মচারীরা চাইলেও এ ঋণ নিতে পারেন। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো ও ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখেই ঋণের আকার নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে করোনায় শুধু সরকারি ছাড়া সব খাতের কর্মজীবীদের আয় কমেছে। এতে অধিকাংশ গ্রহীতাই ঋণ কিস্তি পরিশোধ করছেন না।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেসরকারি খাতের এক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘গাড়ি বা ভোক্তা পর্যায়ের ঋণগুলো সাধারণত বিলাসী হয়ে থাকে। এসব ঋণের বিপরীতে তেমন জামানত থাকে না। বর্তমানে এসব ঋণও খেলাপি হয়ে পড়ছে। আমাদের পর্যবেক্ষণে বেরিয়ে এসেছে ভোক্তা ঋণের ১০ শতাংশই আদায় করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, এসব যা প্রভাবশালীদের দখলে যায়। ব্যাংকও কিছুই করতে পারে না অনেক ক্ষেত্রে। আবার ভোক্তা ঋণ ব্যবহৃত হচ্ছে অন্য খাতে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেকেই পণ্য ক্রয়ের বিপরীতে ভোক্তা ঋণ নিয়ে থাকে। পরে পণ্যই বিক্রি করে অর্থ অন্য খাতে নেয়। এজন্য আমরা ভোক্তা ঋণ কমিয়ে দিয়েছি। শুধু ভালো গ্রাহকদের বাছাই করে দিচ্ছি।’

ভোক্তা ঋণ বিতরণে এগিয়ে থাকা ব্যাংকগুলোর একটি হচ্ছে দি সিটি ব্যাংক। এ বিষয়ে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তে আমাদের এসব ঋণের বিপরীতে তহবিল ব্যয় কমে আসবে। ঋণ বিতরণের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। সুদহার ৯ শতাংশে নেমে আসায় কিছুটা কমে গিয়েছিল। এখন নতুন উদ্যমে ঋণ বিতরণ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করি।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিল-জুনে ব্যাংকগুলোর ভোক্তা ঋণ বিতরণে লক্ষ্যমাত্রা ছিল পাঁচ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে তিন হাজার ৭০৭ কোটি টাকা। গত জুন শেষে ভোক্তা খাতে বিতরণকৃত ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে অনাদায়ী হয়ে পড়েছে চার হাজার ২৩৮ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জারি করা নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের মধ্যে অশ্রেণিকৃত বা নিয়মিত ঋণের বিপরীতে দশমিক ২৫ থেকে পাঁচ শতাংশ হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। এছাড়া নি¤œমান বা সাব-স্ট্যান্ডার্ড ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনকের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা কুঋণের (আদায় হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই ধরে নেওয়া হয়) বিপরীতে ১০০ শতাংশ হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়।

এছাড়া কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে হারে আয় বৃদ্ধি না হলে প্রভিশন ঘাটতি দেখা দেয়। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, প্রভিশন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংক শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারে না। শেয়ার বিজ।

Leave a Reply