ব্যাংক ইচ্ছে করলেই শতভাগ মুনাফা দেখাতে পারবে না

0
BANGLADESH BANK

করোনার প্রভাবে ঋণ শ্রেণীকরণ থেকে অব্যাহতির বছরে ব্যাংক ইচ্ছে করলেই শতভাগ মুনাফা দেখাতে পারবে না। কৃত্রিম মুনাফা থেকে শেয়ারহোল্ডারদের মাঝে বণ্টন করে ব্যাংকের মূলধন দুর্বল হওয়া ঠেকাতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বছর শেষে ব্যাংকগুলো কিভাবে মুনাফা দেখাতে পারবে, তা থেকে বণ্টন কী প্রক্রিয়ায় হবে সেজন্য একটি নীতিমালা তৈরি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি মাসের শেষ দিকে তা পরিপালনের জন্য ব্যাংকারদের জন্য নতুন নির্দেশনা জারি করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

জানা গেছে, করোনার প্রভাবে সারা বছরজুড়েই ঋণ শ্রেণীকরণ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে। বলা হয়েছে, কেউ ঋণ পরিশোধ না করলে ওই গ্রাহকের ঋণকে শ্রেণীকরণ করা যাবে না। আর ঋণ শ্রেণীকরণ করতে না পারায় খেলাপি ঋণ না বেড়ে বরং কমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, গত সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ বাড়েনি, বরং আগের তিন মাসের তুলনায় প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা কমে গেছে। এ সুবাদে খেলাপি ঋণের হারও কমে নেমেছে মোট খেলাপি ঋণের ৮ দশমিক ৮৮ শতাংশে। যেখানে গত জুনে ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। খেলাপি ঋণ না বাড়ায় ব্যাংকগুলোকে বাড়তি প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে না। এতে বেড়ে যাচ্ছে কৃত্রিম মুনাফা।

ব্যাংকাররা জানান, গত জানুয়ারি থেকে ঋণ আদায়ের ওপর শিথিলতা আরোপ করায় ঋণ আদায় কার্যক্রম থেমে গেছে। যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করতেন তাদের অনেকেই ঋণ পরিশোধ বন্ধ করে দেন। এতে ব্যাংকের ঋণ আদায়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। ব্যাংকগুলোতে মোটা দাগে দুই ধরনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। প্রথমত, ঋণ আদায় কমে যাওয়ায় বিনিয়োগ থেকে প্রকৃত মুনাফা কমে যাচ্ছে। অপর দিকে ঋণ আদায় না হলেও সংশ্লিষ্ট গ্রাহককে ঋণখেলাপি করা হচ্ছে না। এতে এক দিকে ব্যাংকের প্রকৃতপক্ষে পুঞ্জীভূত খেলাপি ঋণ বেড়ে গেলেও নীতিমালার কারণে খেলাপি ঋণ দেখানো সম্ভব হচ্ছে না। এ সুযোগটি অনেক ব্যাংক নিচ্ছে। কারণ খেলাপি ঋণের শ্রেণীভেদে শতভাগ পর্যন্ত প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। আর এ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয় ব্যাংকের মুনাফা থেকে। কিন্তু যেখানে নীতিমালার কারণে ঋণখেলাপি করা যাচ্ছে না, এতে ঋণ আদায় না হলেও খেলাপি ঋণ না বাড়ায় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে না। এতে ব্যাংকগুলো কৃত্রিম আয় বাড়িয়ে দেখানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আর এ কৃত্রিম আয়ের ওপর ভিত্তি করেই ৪০ শতাংশ পর্যন্ত সরকারের করপোরেট ট্যাক্স পরিশোধ করতে হবে। সরকারের কর পরিশোধ করার পর যে অংশ বাকি থাকবে তা থেকে শেয়ারহোল্ডারদের মাঝে মুনাফা বণ্টন করতে হবে। এতে ব্যাংকের ভিত্তি আরো দুর্বল হয়ে পড়বে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, করোনার নেতিবাচক প্রভাব থেকে ব্যবসায়ীদের কিছুটা রেহাই দিতে এক বছরের জন্য ঋণশ্রেণীকরণ থেকে অব্যাহতি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রথমে জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত, এরপর আরো দুই ধাপে তা বাড়িয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। এ সময়ের মধ্যে কোনো গ্রাহক ঋণ পরিশোধ না করলে তাকে ঋণখেলাপি বলা যাবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্দেশনা কার্যকরের সময় আগামী ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ নির্দেশনা দেয়ার পর গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের অপেক্ষায় রয়েছে আরো সাড়ে ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এ অর্থ খেলাপি ঋণের ঘরে পৌঁছানোর আগের ধাপে অবস্থান করছে। আগামী জানুয়ারি থেকে ৬ মাস পার হলেই সংশ্লিষ্ট অর্থ খেলাপি ঋণের নিম্ন স্তর অর্থাৎ নিম্ন মানের (এসএস) খেলাপি ঋণের ঘরে চলে যাবে।

সূত্র জানিয়েছে, কৃত্রিম মুনাফার ওপর ভর করে ব্যাংকগুলোর ভিত্তি যাতে দুর্বল না হয় সে জন্য মুনাফা থেকে বণ্টনের জন্য কিছু নির্দেশনা ব্যাংকগুলোর জন্য দিতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে। চলতি মাসের শেষ দিকেই ব্যাংকগুলোর জন্য তা পরিপালনে সার্কুলার জারি করা হবে।

Leave a Reply