ব্যাংকে গ্রাহকের নামে ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ

0

জমি ও ফ্ল্যাট বন্ধক রেখে প্রিমিয়ার ব্যাংকের রোকেয়া সরণি শাখা থেকে ঋণ নিয়েছিলেন ব্যবসায়ী মো. নাসিরউদ্দীন। সেই ঋণ শোধ করার পর ব্যাংকটির সঙ্গে বছরখানেক কোনো লেনদেন করেননি। গত অক্টোবরে অন্য একটি ব্যাংকে ঋণ নিতে গেলে তারা জানায়, প্রিমিয়ার ব্যাংকে তাঁর ঋণ রয়েছে। তাই তিনি নতুন করে ঋণ পাবেন না।

এ কথা শুনে তাজ্জব হয়ে যান নাসিরউদ্দীন। তিনি জানান, প্রিমিয়ার ব্যাংকে যোগাযোগ করলে তাঁকে বলা হয়, সফটওয়্যারের সমস্যার কারণে তাঁর আগের ঋণ শোধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি হালনাগাদ করা যায়নি। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারে গ্রহীতাদের ঋণের তথ্য থাকে। সেখান থেকে নানা তথ্য যাচাই করে ঋণ দেয় ব্যাংক।

নাসিরউদ্দীন জানান, কিছুদিন পর প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকেই তাঁকে ডাকা হয়। এবার ব্যাংকটির নিরীক্ষা বিভাগ জানায়, তাঁর নামে দুটি ঋণ আছে, পরিমাণ মোট ১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। তিনি বলেন, ‘আমি ব্যাংককে চ্যালেঞ্জ করলাম। তখন দেখা যায়, আমার নাম ও তথ্য ব্যবহার করে দুটি ভুয়া ব্যাংক হিসাব (অ্যাকাউন্ট) খোলা হয়েছে। এর বিপরীতে ঋণ তুলে আত্মসাৎ করা হয়েছে।’

গ্রাহকের অজান্তে এভাবে ব্যাংক হিসাব খুলে ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করার অন্তত ১০টি ঘটনা ঘটেছে বেসরকারি প্রিমিয়ার ব্যাংকের রোকেয়া সরণি শাখায়। এর মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে প্রায় ১১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ঘটনাগুলো ঘটেছে ২০০৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত। লোপাট হওয়া টাকার পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।

অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় বিষয়টি ধরা পড়ার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ গত ২১ অক্টোবর কাফরুল থানায় মামলা করে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ ব্যাংকটির সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার ও ক্রেডিট ইনচার্জ জুলফিকার আলী (৪০), ভাইস প্রেসিডেন্ট ও শাখা ব্যবস্থাপক মো. ফিরদৌস আলম (৫৯) এবং ব্যাংক কর্মকর্তা মো. মোস্তফাকে গ্রেপ্তার করেছে। এঁদের মধ্যে ফিরদৌস আলম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। আসামিরা এখন কারাগারে রয়েছেন।

মামলার এজাহারে বলা হয়, গত ১৫ অক্টোবর ব্যাংকটির নিরীক্ষা বিভাগ রোকেয়া সরণি শাখায় নিরীক্ষা চালানোর সময় বেশ কিছু নথি খুঁজে পাচ্ছিল না। নিরীক্ষা কর্মকর্তারা নথিগুলো কোথায় তা জানতে চান। একপর্যায়ে মামলার আসামি জুলফিকার আলী ওই শাখার কয়েকজন কর্মীর সহযোগিতায় ফাইল নিয়ে পালিয়ে যান।

মামলাটির তদন্ত করছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। এ ইউনিটের উপকমিশনার মাহফুজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এই চক্রে আরও কেউ আছেন কি না, তা খতিয়ে দেখতে আরও সময় ও নথিপত্র প্রয়োজন।

প্রিমিয়ার ব্যাংকের নিরীক্ষা বিভাগের নথিপত্র বলছে, আসামি জুলফিকার আত্মসাৎ করা টাকার একটা অংশ মিরপুরে তাঁর বাবার নামে থাকা ফ্যামিলি বাজার নামে একটি সুপারশপ এবং ব্লু মোটরস নামে একটি প্রতিষ্ঠানে খাটিয়েছেন। ব্যাংক লেনদেনের নথিতে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। পুলিশ সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে দুই নম্বর আসামি ফিরদৌস আলম নিজেকে নির্দোষ দাবি করে সব দায় চাপান জুলফিকারের ওপর। তবে তিনিও যে টাকার ভাগ পেয়েছেন, তা জানতে পেরেছে পুলিশ।

এ বিষয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম রিয়াজুল করিম বলেন, ‘কীভাবে একজন কর্মকর্তা এত টাকা তুলে নিলেন, তা আমরাও বুঝতে পারছি না। এর পেছনে গ্রাহকের সহায়তাও থাকতে পারে। তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁরাও আইনের আওতায় আসবেন।’ তিনি জানান, আসামিদের পরিবার টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। গ্রাহকদের পক্ষ থেকেও টাকা জমা হচ্ছে।

অবশ্য ভুক্তভোগী গ্রাহকেরা বলছেন, আসামিদের পরিবার তাঁদের (গ্রাহক) নাম দিয়ে টাকা জমা দিচ্ছে। অন্তত ছয়জন ভুক্তভোগী প্রিমিয়ার ব্যাংকের রোকেয়া সরণি শাখার ব্যবস্থাপককে উকিল নোটিশ পাঠিয়েছেন। তাঁদের একজন মো. আবদুস সালাম নোটিশে লিখেছেন, ব্যবস্থা না নিলে তিনি পরবর্তী আইনি পদক্ষেপে যাবেন।

Leave a Reply