থ্যাংক ইউ, বাংলাদেশ ব্যাংক

0

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক করোনার ঝুঁকিতে দায়িত্ব পালন করা ব্যাংক কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষনা করেছে। এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে ব্যাংকার এবং অন্যান্যদের মাঝে। অনেকেই এসবেও সন্তুষ্ট হতে পারছেন না। তাদের মত হলো কোনো প্রনোদনাই জীবনের ঝুঁকির মূল্যে যথেষ্ট নয়। তবে অধিকাংশই সন্তুষ্ট এ কারণে যে, এর ফলে জাতীয় প্রয়োজনে জরুরী সেবার পেশাজীবি হিসেবে ব্যাংকাদেরও স্বীকৃতি হলো। আমিও ব্যক্তিগতভাবে এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।

আমি নিজে ২৬ মার্চ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত নিজের টাইমলাইনে পোস্ট এবং ব্যাংকারদের বিভিন্ন পেজে শেয়ার দেয়া নিম্নোক্ত তিনটি লেখায় ব্যাংকারদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এসব বিষয় নিয়েই কথা বলার চেষ্টা করেছি। লেখাগুলো ছিল লাইক কমেট এবং শেয়ারে পাঠক সমাদৃত। যার অতি প্রাসঙ্গিক এবং প্রধান অংশগুলো নিম্নরূপ-

#২৬ মার্চ ২০২০:
করোনার প্রাদুর্ভাব : ঝুঁকিতে যখন ব্যাংকার” শিরোনামে লেখাটি ফেসবুকে পোস্ট দেই ২৬ মার্চ যেদিন থেকে দেশ সাধারণ ছুটিতে যায়। সে লেখায় আমার আলোচনার প্রধান বিষয়গুলো ছিলো সেসব বিষয় যেগুলোর কারণে ব্যাংকারগণ নিজেদেরকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন। যেমন-

০১) ব্যাংকে জনসমাগম: আমাদের দেশে ব্যাংকিং মানেই ভীড়, ব্যাংকিং মানেই জনসমাগম। নিরাপদ ব্যক্তিক দূরত্ব বজার রাখা এই পরিবেশে শুধু কঠিন নয় অসম্ভবও। বাংলাদেশে প্রথাগত ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল প্রোডাক্টের বেশ উন্নয়ন ঘটলেও এ গুলোর ব্যবহার এখনো ব্যাপক নয়। ফলে জনসমাগম এবং ভীড় ঠেলাঠেলি না হলে যেন কারো কাছে ব্যাংকিংয়ের মজাটা হয় না। এমনকি এই করোনা সময়েও কারো মাঝে ভ্রুক্ষেপ নেই। অনেকে ব্যক্তিগত সিকিউরিট প্রটেকশন ছাড়াই ব্যাংকে আসছেন মানে ব্যাংকারের জন্য ঝুঁকিটাও সাথে আনছেন।

০২) প্রবাসীদের আনাগোনা: বিশ্বব্যাপী করোনার ঢামাডোলের মাঝেই দেশে প্রবেশ করা লাখ লাখ প্রবাসী এখন সাধারণ জনস্রোতে মিশে গেছেন। এমনকি সদ্য বিদেশ ফেরতরা আছেন এই দলে। তারাও ব্যাংকে আসেন সেবা নিতে এবং সঙ্গত কারণেই ব্যাংকারদের কাছে ভিড়েন। এদের মাঝে করোনা বহনের ঝুঁকি আছে এমন লোকও যে নেই তার নিশ্চয়তা কোথায়? আর এই পরিবেশে ব্যাংকাররা ঝুঁকিমুক্ত থাকেন কীভাবে?

০৩) নগদ টাকা: প্রচলিত কাগুজে মুদ্রা বা টাকা ছাড়া আমাদের জীবন অচল। এ টাকার অযত্ন ব্যবহারে আমাদের জুড়ি নেই। ফলে এমনিতেই টাকাগুলো আদর্শ জীবানু বাহকে পরিণত। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের এ সময়ে এইসব কাগজের টাকাগুলো জীবানুমুক্তকরণ ছাড়াই ব্যাংকারের হাত হয়ে সার্কুলেশন হওয়ায় ব্যাংকাররা এখানেও সরাসরি ঝুঁকিতে আছেন।

#২৮ মার্চ ২০২০:
করোনার প্রার্দুভাবে ব্যাংক নোটেও ঝুঁকি” শিরোনামে লেখাটি পোস্ট হয় ২৮ মার্চ। সেই লেখাটির অংশবিশেষ-

”———–সীমিত জনশক্তি নিয়োগ করে শুধুমাত্র জরুরী নগদ টাকার সেবার জন্য সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ব্যাংক খোলা রাখতে বলা হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে। এ নিয়ে ব্যাংকারদের মাঝে উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ যথেষ্ট ব্যক্তিগত প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা (পিপিই) ছাড়া সেবার কাউন্টারে বসা মানে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকির সামনে নিজেকে সঁপে দেয়া। অথচ ২৯ মার্চ থেকে তাই করতে হবে ব্যাংকারদের।

প্রশ্ন হলো, তাহলে অন্যান্য আক্রান্ত দেশে ব্যাংকিং ব্যবস্থা কেমনে চলছে? এ ব্যাপারে ইতালী প্রবাসী আমার ব্যক্তিগত পরিচিত একজনের সাথে গতকাল কথা বলতে গিয়ে যা জানলাম তাহলো ওখানেও দিনে দু’ঘন্টা করে ব্যাংক খোলা আছে। তবে ওখানকার ব্যাংকিং সিস্টেম সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে তিনি জানালেন। সবাই ডিজিটাল ব্যাংকিং এ অভ্যস্থ বলে ব্যাংকিং কাজের ৯০ পার্সেন্টই স্ব-স্ব অবস্থানে থেকে করা সম্ভব বলে ব্যাংকে ভীড় থাকে না। বিশেষ প্রয়োজনে নগদ টাকার প্রযোজন হলে আগে ব্যাংককে নোটিশ দেয়া লাগে। ব্যাংকারের সন্তুষ্টি সাপেক্ষে ব্যাংক থেকে নগদ টাকা নেয়া যায়। তবে তার জন্য অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ পে করতে হয় যা ভার্চুয়াল ব্যাংকিয়ে প্রয়োজন হয় না।

চীনের ব্যাপারে একটি খবরে দেখলাম আক্রান্তের সময় তারা ব্যাংকের ভোল্টের টাকাগুলো আল্ট্রা ভায়োলেট রশ্মি দিয়ে জীবানুমুক্ত করার উদ্যোগ নেয়। পাশাপাশি ৪ বিলিয়ন নতুন নোট ছাড়ে সে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর আমাদের দেশের ব্যাংক নোটগুলো এমনিতেই জীবানুবাহক। তদুপরি বিশ্বজুড়ে এই মরণ ঘাতক করোনাভাইরাসের রাজত্বের সময়ে এগুলোও হয়ে ওঠতে পারে আরো ভয়ানক। আর এসব নোট দিয়েই ব্যাংকিং লেনদেন চললে টাকার মাধ্যমেও কমিউনিটি ট্রান্সমিশন যে হবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

জাতীয় স্বার্থে জরুরী প্রয়োজন বলেই ব্যাংকারদের সেবায় থাকা উচিত। তবে দ্রুতগতিতে সকল ব্যাংকের ভোল্টের টাকা জীবানুমুক্ত করার উদ্যোগ নেয়ার পাশাপাশি ব্যাপক আকারে নতুন নোট বাজারে ছাড়ার বিষয়টি বিবেচনা করলে ভালো হবে। অহেতুক ভীড় এড়াতে গ্রাহকদেরও দায়িত্বশীল আচরণ কাম্য।

#৭ এপ্রিল ২০২০:
”আমার স্বার্থ আমার পরিবার, আমার স্বার্থ আমার দেশ” লেখাটি পোস্ট হয় ৭ এপ্রিল। যাতে প্রাসঙ্গিক বিষয় ছিলো নিম্নরপ-

”——কিন্তু তাতেই কি সব হয়ে গেলো? ব্যাংক তো খোলা আছে। সেখানে গ্রাহকদের যাতায়াত অব্যাহতে আছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সামাজিক দূরত্ব মেনে ব্যাংকের পক্ষে সেবা দেয়াও সম্ভব হচ্ছে না। পিপিই না থাকায় ব্যাংকাররাও পারছেন না নিজেদের সুরক্ষিত করতে। ফলে ভয় আর আতংকের মাঝে কাটছে প্রতিটি ব্যাংকার এবং তাদের পরিবারের নিত্য দিন।

দেশের উন্নয়ন অগ্রগতির সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক অংশিদার ব্যাংক। অথচ এই ব্যাংকিং সেক্টরে কর্মরতদের নিরাপত্তা নিয়ে কেউ ভাববে না এটা কি করে হয়? বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু প্রজ্ঞাপন দিয়েই দায়িত্ব শেষ করতে পারে না। সকল ব্যাংকার যাতে সুরক্ষিত থাকে তারও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে হবে। বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে জাতীয় স্বার্থে তাদের কর্মেরও স্বীকৃতি দিতে হবে।

কারণ এটা প্রতিটি ব্যাংকারের ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং অধিকারের যেমন বিষয় তেমনি তার পরিবাররেরও। আবার দেশের বৃহত্তর স্বার্থের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বর্তমান পরিস্থিতিটা এমনই ভয়াবহ যে কোভিড-১৯ ইস্যুতে ব্যাংকিং সেক্টরের মত বিশাল একটি সেক্টরকে উপেক্ষা করে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত হবে তা ভাবাও মহাভুল।”

নায্য বিষয়ে ব্যাংকারদের প্রতি আনুকুল্য প্রদর্শনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই ব্যাংকিং সেক্টরের অভিভাবক বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের প্রতি। কৃতজ্ঞ চিত্তে বলি “থ্যাংক ইউ বাংলাদেশ ব্যাংক”। একইসাথে প্রত্যেক শাখার ক্যাশ অফিসারদের জন্য ন্যূনতম সংখ্যায় হলেও মানসম্মত পিপিই প্রাপ্তির সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি পূণর্ব্যক্ত করছি। সেইসাথে পেশাগত কাজে যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে আইন শৃংখলা বাহিনীর সহযোগিতা কামনা করছি।

লেখক: মোসলেম উদ্দিন, ব্যাংকার।