নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতি ব্যাংকারদের আরও কিছু দাবি

0
Banker

ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষেত্রে একটি প্রবাদ আছে, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকারদের ব্যাংক।’ তবে এটা রূপক অর্থের প্রবাদ নয়, বাস্তবিকই বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকারদের ব্যাংক এবং ব্যাংকারদের ‘ক্ষমতা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত’ অভিভাবক। অভিভাবকত্বের প্রমাণ বাংলাদেশ ব্যাংক বহুবারই দিয়েছে।

অতিসম্প্রতি আবারও সে প্রমাণ বাংলাদেশ ব্যাংক দিয়েছে বিআরপিডি সার্কুলার লেটার নম্বর ২৪/২০২১-এর মাধ্যমে। এ সার্কুলারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক তফসিলি ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে যে, কভিড-আক্রান্ত হয়ে কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু হলে তাদের পরিবারকে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য। এ সার্কুলারটি ব্যাংকার মহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসা পাচ্ছে এবং ‘কভিডে আমি মরে গেলে আমার পরিবারের কী হবে’ এমন দুঃশ্চিন্তায় চিন্তিত সম্মুখযোদ্ধা ব্যাংকারদের মাঝে অনেকটাই সাহস সঞ্চার করেছে।

চলমান কভিডকালে এখন কে রাখে কার খবর সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক দায়িত্বশীল অভিভাবক হিসেবে ব্যাংকারদের প্রতি তার যত্নের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এর আগেও বিআরপিডি সার্কুলার লেটার নম্বর ১৭/২০২০-এর মাধ্যমে কভিডকালে সাধারণ ছুটির সময়ে সশরীরে অফিসে আসা ব্যাংকারদের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা প্রদানের নির্দেশনা দিয়েছে।

একই ধারাবাহিকতায় বিআরপিডি সার্কুলার লেটার নম্বর ১৮/২০২০-এর মাধ্যমে কভিড-আক্রান্ত ব্যাংকারদের সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকার স্বাস্থ্যবিমা এবং আক্রান্ত ব্যাংকারের দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু হলে পরিবারকে স্বাস্থ্যবিমার পাঁচগুণ পরিমাণ বিশেষ আর্থিক অনুদান দিতেও ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছেন।

সম্প্রতি আগের স্বাস্থ্যবিমার বিধান বহাল রেখেই ব্যাংককর্মীর কভিডজনিত মৃত্যুপরবর্তী আর্থিক ক্ষতিপূরণের পরিমাণ সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকায় উন্নীত করে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের আগের সার্কুলারে সংশোধনী এনেছে।

ব্যাংকারদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের আরও অনেক পিতৃ-মাতৃ সুলভ নির্দেশনা আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নারী ব্যাংকারদের দুবার ছয় মাস করে মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা করেছে, সব ব্যাংকারদের জন্য প্রতি বছর ১০ দিনের টানা বাধ্যতামূলক ছুটির বিধান করে দিয়েছে, ব্যাংকারদের সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে অফিস ত্যাগের বিধান করে দিয়েছে, ছুটির দিনে অফিস করা ব্যাংকারদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক প্রদানের নির্দেশনা দিয়েছে, কভিডকালে সরকারি বিধিনিষেধ চলাকালে ব্যাংকারদের নিজস্ব পরিবহনের ব্যবস্থা করে দিতে নতুবা উপযুক্ত যাতায়াত খরচ প্রদানেরও নির্দেশনা দিয়েছেন তফসিলি ব্যাংকগুলোকে।

এত ব্যাংকারবান্ধব নির্দেশনার পরও কেউ বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু নির্দেশনায় সন্তুষ্ট নন, যেমনটা আমরা দেখছি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিআরপিডি সার্কুলার লেটার নম্বর ২৪/২০২১ নিয়ে ব্যাংকারদের বিভিন্ন মন্তব্যে। ব্যাংকারদের অনুকূলে জারিকৃত এই সার্কুলারটিও কিছু কিছু ব্যাংকার কর্তৃক সমালোচিত হচ্ছে। যেমন, একজন মন্তব্য করেছেন, ‘মৃত্যুর পর কোটি টাকা না দিয়ে জীবিতকালে চিকিৎসা নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন।’

তবে আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের এ নির্দেশনাকে স্বাগত জানাই এবং দুহাত পেতে গ্রহণ করতে চাই। কারণ ‘একটি পাইনি বলে আরেকটি নেব না’ এটা বোকার সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের অভিভাবক হিসেবে, আমাদের কোনো অপ্রাপ্তি বা অতৃপ্তি থাকলে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তা চাইতেই পারি। তাই আমার মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এ নির্দেশনাকে সব ব্যাংকারের স্বাগত জানানো উচিত, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করা উচিত।

এমন একটা অতি ভালো নির্দেশনার সমালোচনা অনুচিত ও অনাকাক্সিক্ষত। আমরা বেঁচে আছি বলে চিকিৎসার ওপর জোর দিচ্ছি। কিন্তু যারা এরই মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন বা আগামীতে মৃত্যুবরণ করবেন, তাদের পরিবারকে নিয়ে ভাবতে হবে না? আমরা বরং বাংলাদেশ ব্যাংককে এ নির্দেশনার জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে আরও কিছু দাবি জানাতে পারি; যেমন

এক. বর্তমানে চলমান সাধারণ ছুটিতে অফিস করা ব্যাংকারদের প্রতি কর্মদিবসের জন্য তিন দিনের মূল বেতনের সমপরিমাণ আর্থিক প্রণোদনা প্রদান।

দুই. বিআরপিডি সার্কুলার লেটার নম্বর ২৪/২০২১-এর নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংককর্মীদের কভিড-আক্রান্ত মৃত্যু-পরবর্তীকালে তাদের পরিবারের আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তি বিশেষ তদারকির মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিশ্চিত করা।

তিন. বিআরপিডি সার্কুলার লেটার নম্বর ১৮/২০২০ অনুযায়ী কভিড-আক্রান্ত সব ব্যাংকারের স্বাস্থ্যবিমার আর্থিক সুবিধা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা।

চার. আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও স্বাস্থ্যবিমা-সংক্রান্ত নীতিমালা প্রত্যেক তফসিলি ব্যাংকের বোর্ড কর্তৃক আগামী এক মাসের মধ্যেই অনুমোদন করিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে অবগতকরণ এবং বোর্ড কর্তৃক স্বাক্ষরিত নীতিমালার কপি বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো নিশ্চিত করা।

পাঁচ. কভিড-আক্রান্ত ব্যাংকার ও তার পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার সব খরচ নিজ নিজ ব্যাংক কর্তৃক বহন করা। পাশাপাশি কোনো ব্যাংকার বা তার পরিবারের কেউ আক্রান্ত হয়ে হসপিটালাইজড হলে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পরিবারকে প্রাথমিক চিকিৎসা সহায়তা বাবদ ন্যূনতম এক লাখ টাকা অনুদান দেয়া, যা পরবর্তীকালে প্রকৃত চিকিৎসা ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা যেতে পারে।

ছয়. কভিড-আক্রান্ত ব্যাংককর্মী এবং তাদের পরিবারের ত্বরিত সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক অথবা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার আলোকে প্রত্যেক ব্যাংক কর্তৃক অন্তত তিন থেকে পাঁচটি অত্যাধুনিক হাসপাতালের সঙ্গে ‘ব্যাংকারদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিকিৎসা’ চুক্তি সম্পাদন করা।

সাত. প্রত্যেক ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের অন্তত পাঁচটি গাড়ি এবং প্রত্যেক জেলার প্রধান শাখার গাড়ি/মাইক্রোবাসটিকে ওই জেলার নিজ ব্যাংকার বা তাদের পরিবারের আক্রান্ত মুমূর্ষু সদস্যদের হাসপাতালে আনার জন্য ডেডিকেটেড ট্রান্সপোর্ট হিসেবে নিয়োজিত রাখা।

আট. জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ব্যাংকের নিজ উদ্যোগে প্রত্যেক শাখার অন্তত তিনটি স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে সমঝোতা করে রাখা।

নয়. মহামারি কাভিড-আক্রান্ত ব্যাংকার ও তার পরিবারের চিকিৎসা এবং কারও দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু-পরবর্তীকালে সৎকার ও আর্থিক সহায়তা তদারকির জন্য প্রত্যেক ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট ‘মনিটরিং টিম’ বা ‘ডেডিকেটেড টিম’ গঠন করা।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে ব্যাংককর্মীদের আরও কয়েকটি সাধারণ দাবি উপস্থাপন করতে চাই। যেমন

এক. ব্যাংকার ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বিনা মূল্যে বা স্বল্পমূল্যে যেকোনো চিকিৎসার জন্য দেশের সব ব্যাংকের অংশগ্রহণে অত্যাধুনিক চিকিৎসা সুবিধাসম্পন্ন ‘কম্বাইন্ড ব্যাংকার্স হসপিটাল’ প্রতিষ্ঠা করা।

দুই. ব্যাংকের প্রভিশন ও করপূর্ব বার্ষিক মুনাফার পাঁচ শতাংশ অথবা ঘোষিত ডিভিডেন্ডের ১০ শতাংশের মধ্যে যেটি বেশি, সে পরিমাণ মুনাফা ব্যাংকের কর্মীদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া।

তিন. সব সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকে ব্যাংকারদের অভিন্ন ও সর্বোচ্চ ১০ পদবিশিষ্ট পদসোপান চালু করা।

চার. প্রতিটি ব্যাংকেই প্রত্যেক বছর যোগ্য কর্মীদের প্রমোশন দেয়া বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি সব ব্যাংকে অভিন্ন প্রমোশন নীতি বাস্তবায়ন করা এবং একই গ্রেডে দু-তিন বছরের বেশি সময় ধরে থাকা কর্মীদের তালিকা ছয় মাস পরপর বাংলাদেশ ব্যাংকে রিপোর্ট করার বিধান করা।

পাঁচ. ব্যাংকারদের দক্ষতা বাড়াতে সব ব্যাংকে একই কোর ব্যাংকিং সিস্টেম (সিবিএস) ব্যবহার করা।

ছয়. যেকোনো ব্যাংককর্মীর সাসপেনশন, টার্মিনেশন, আর্লি রিটায়ারমেন্ট প্রভৃতি কেবল বাংলাদেশ ব্যাংকের চূড়ান্ত অনুমোদন সাপেক্ষেই কার্যকর হওয়া।

সাত. ব্যাংকারদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সকল আইন, সার্কুলার ও বিধিবিধান বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

লেখকঃ মোশারফ হোসেন, ব্যাংকার ও ফ্রিল্যান্স লেখক।

আরও দেখুনঃ
ব্যাংকারদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সম্মিলিত ব্যাংকার্স হাসপাতাল চাই
সম্মিলিত ব্যাংকার হাসপাতাল তৈরির উদ্যোগ নেয়া হউক

Leave a Reply