“STEP Plus (+)”: এজেন্ট ব্যাংকিং এ সফলতার সূত্র!

0

এজেন্ট ব্যাংকিং বাংলাদেশের আর্থিক খাতে একটি নতুন সংযোজন যা খুব দ্রতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। দেশের আর্থিক অর্ন্তভূক্তিতে (Financial Inclusion) খুব অল্প সময়ে এজেন্ট ব্যাংকিং দেখিয়েছে অসামান্য সাফল্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ রিপোর্ট (ডিসেম্বর, ২০১৯) অনুযায়ী, বর্তমানে তালিকাভুক্ত ২১টি ব্যাংকের প্রায় ১১,৫০০ এজেন্ট আউটলেট পরিচালিত হচ্ছে যেখানে প্রায় ৫৫ লক্ষ একাউন্টের মাধ্যমে সংগ্রহিত হয়েছে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। পরিচালন ব্যয় সংকোচনের এই যুগে তালিকাভুক্ত ব্যাংক সমুহের এজেন্ট ব্যাংকিং এর প্রতি তৈরী হয়েছে বিশেষ আগ্রহ। কিন্তু যে সমস্ত এজেন্ট ব্যাংকিং পার্টনারদের সহায়তায় এই ব্যাংকিং এগিয়ে চলেছে তাদের অনেকেই এখনো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য (Profitability) অর্জন করতে পারেননি। এজেন্ট ব্যাংকিং নিয়ে কাজ করার সুত্রে যারা এজেন্ট ব্যাংকিং পার্টনার হতে আগ্রহী বা এজেন্ট ব্যাংকিং পার্টনার হিসেবে কাজ করছেন তাদের জন্য আমার এই ‘STEP Plus (+)‘ ফর্মুলা।

ইংরেজী ‘STEP’ শব্দের অর্থ হল পদক্ষেপ। কিন্ত এজেন্ট ব্যাংকিং এ সফলতার জন্য আমি “STEP” শব্দটিকে নিম্নোক্ত ভাবে ব্যাখ্যা করতে চাই।

S= Service (সেবা)
T= Trust (বিশ্বাসযোগ্যতা/গ্রহণযোগ্যতা)
E= Engagement (অঙ্গীভূত থাকা/জড়িত থাকা)
P= Presentation (উপস্থাপনা/দৃশ্যমানতা)

Service (সেবা):

গ্রাহকদের নিয়মিত ভাবে উন্নততর সেবা (Superior) প্রদান করতে হবে যাতে গ্রাহক সন্তুষ্টি (Customer Satisfaction) নিশ্চিত করা যায়। বলা হয়ে থাকে যে, “Satisfied customer is the best source of advertisement” বা “Acquiring new customers is five times more expensive than retaining an existing customer”।

সুতরাং গ্রাহক সন্তুষ্টির দিকে এজেন্ট ব্যাংকিং এ কর্মরত সকলের সর্বোচ্চ নজর থাকতে হবে। গ্রাহক সেবা নিশ্চিতকরণে নিন্ম লিখিত বিষয়সমুহের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

১। পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্যাশ/নগদ অর্থ (Liquid Cash) রাখা যাতে গ্রাহক প্রয়োজন মত ক্যাশ আউট করতে পারে।

২। গ্রাহকের চাহিদামত এজেন্ট একাউন্টে ইলেক্ট্রনিক মানি (E-money) রাখা যাতে সব সময় ক্যাশ ইন করা যায়।

৩। গ্রাহকের একাউন্ট সম্পর্কিত সব তথ্য বা সেবা সাধ্যমত গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী প্রদান। এজেন্ট ব্যাংকিং পয়েন্ট সমূহে টাকা জমা বা উত্তোলন ছাড়াও অন্যান্য সেবা যেমন- ইউটিলিটি বিল গ্রহণ, বেতন বা ভাতা প্রদান, রেমিটেন্স প্রদান, বিভিন্ন প্রকার ফী গ্রহণের সুযোগ থাকলে তা অধিক গ্রাহক বাড়াতে সহায়ক হয়।

৪। ব্যাংক প্রদত্ত কোন নতুন তথ্য বা সুবিধা বা অফার গ্রাহককে জানানো।

৫। বিভিন্ন উৎসবে বা উপলক্ষ্যে গ্রাহকদের সাধ্যমত উপহার প্রদান।

৬। গ্রাহকের কোন অভিযোগ বা পরামর্শ (Feedback) যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে শোনা এবং তা সমাধানের চেষ্টা করা।

Trust (বিশ্বাসযোগ্যতা/গ্রহণযোগ্যতা):

এজেন্ট ব্যাংকিং যেহেতু টাকা পয়সা লেনদেনের সাথে সম্পর্কযুক্ত সেহেতু এজেন্টের প্রতি গ্রাহকের বিশ্বাসযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজেন্ট মালিকের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা বা ইমেজ (Personal Branding) ভালো হলে দ্রুত ব্যবসায়ীক সফলতা অর্জন করা যায়।গ্রাহকের আস্থা কোন কারনে একবার নস্ট হলে তা আর ফিরে পাওয়া সময় সাপেক্ষ ও কস্টকর। তাছাড়া আস্থাহীন গ্রাহক অনেক ভবিষ্যত (Potential) বা বর্তমান গ্রাহককে এজেন্ট ব্যাংকিং এ লেনদেন করতে নিরুৎসাহিত করবে যা এজেন্ট মালিকের ব্যবসার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

১। এমন কোন অংগীকার (Commitment) না করা যা এজেন্ট মালিক বা ব্যাংক কর্তৃক পূরণ করা সম্ভব না।ব্যাংক প্রদত্ত রেট (Interest rate), ফী (Fee) বা সার্ভিস চার্জের কোন রুপ পরিবর্তন না করা।

২। গ্রাহককে তার প্রতিটা লেনদেন এর প্রিন্টেড মানি রিসিপ্ট (Money Receipt) বা স্লিপ (Slip) দেয়া যাতে গ্রাহকের কাছে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়।

৩। গ্রাহক তার লেনদেনের পর ব্যাংক প্রদত্ত এসএমএস (SMS) পাচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করা।

৪। একজন গ্রাহকের কোন তথ্য অন্য কোন গ্রাহককে না দেয়া। এক্ষেত্রে কঠোর গোপনীয়তা (Confidentiality) নিশ্চিত করতে হবে।

৫। ডিপিএস (DPS) ও এফডিআর (FDR) এর মূল কপি গ্রাহককে দেয়া এবং তা ভাঙ্গানোর নিয়ম ও সব ধরনের কর্তন গ্রাহককে অবহিত করতে হবে।

৬। গ্রাহককে কল সেন্টার নম্বর বা এজেন্ট ব্যাংকিং অফিসের ল্যান্ড ফোন নম্বর দেয়া যাতে সে তার একাউন্ট ব্যালেন্স বা ডিপিএস বা এফডিআর সম্পর্কে পর্যাপ্ত নিশ্চয়তা পেতে পারে।

৭। গ্রাহককে জানাতে হবে যে ‘এজেন্ট পয়েন্টে তার প্রদত্ত টাকা ব্যাংকের সিস্টেমে ইনপুট (input) ও ট্রানজেকশন এসএমএস (SMS) পাওয়ার পর তা আর এজেন্ট পয়েন্টে জমা থাকে না এবং উক্ত এজেন্ট পয়েন্ট যদি নাও থাকে বা বন্ধ হয়ে যায় গ্রাহক তার সে টাকা ব্যাংকের যে কোন এজেন্ট পয়েন্ট বা এটিএম বুথ বা ব্রাঞ্চ থেকে উত্তোলন করতে পারবে’।

Engagement (অঙ্গীভূত থাকা/জড়িত থাকা):

দ্রুত ব্যবসায়ীক সাফল্যের জন্য এজেন্ট মালিকের সরাসরি জড়িত (Involvement) থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন। কারণ এটা প্রমানিত যে, এজেন্ট মালিক সরাসরি এজেন্ট ব্যাংকিং পরিচালনায় যুক্ত না থাকলে উক্ত এজেন্ট পয়েন্ট এর লাভবান হওয়া সময় সাপেক্ষ ব্যাপার হয়ে উঠে। একজন এজেন্ট মালিকের নিম্ন লিখিত বিযয়ে সরাসরি তত্ত্বাবধান করা উচিত।

১। নিয়মিত একাউন্ট খোলা হচ্ছে কিনা? ব্যবসায়ীক সাফল্যের জন্য নিয়মিত একাউন্ট খোলার বিকল্প নেই। যত বেশী একাউন্ট তত বেশী ডিপোজিট ও লেনদেন। একাউন্ট ও ডিপোজিট প্রবৃদ্ধির (Growth) দিকে এজেন্ট ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিতদের উৎসাহ দিতে হবে এবং তা নিশ্চিত করতে হবে।

২। ডিপোজিট বাড়ছে কিনা? দীর্ঘ মেয়াদী ব্যবসায়ীক সফলতার জন্য কারেন্ট ও সেভিংস একাউন্ট ডিপোজিট এবং ডিপিএস এর দিকে নজর দিতে হবে। কারণ এফডিআর (FDR) একজন গ্রাহকের যে কোন সময় উত্তোলন/ভাংগানোর প্রয়োজন হতে পারে। ফলশ্রুতিতে এজেন্টের আয়ে আকস্মিক বড় ধরনের পরিবর্তন হয়।

৩। এজেন্ট মালিক সরাসরি জড়িত থাকলে পেশাদার পরিচালনা (Professionalism) অনেকাংশে নিশ্চিত হয়। কোন এজেন্ট ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানে পেশাদারিত্ব অনুপস্থিত থাকলে উক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রতি গ্রাহকের আস্থা জন্মায় না।

৪। প্রতিষ্ঠানের অপ্রয়োজনীয় অনেক খরচ (যেমন–অত্যধিক ইউটিলিটি বিল, স্টেশনারী খরচ ইত্যাদি) এবং কাজ (যেমন- একই কাজ দুইজনে করা, অলস সময় কাটানো ইত্যাদি) থেকে বিরত থাকা সম্ভব যদি মালিক সরাসরি তত্ত্বাবধান করে। এজেন্ট পয়েন্টে নিয়োজিত মানবসম্পদ এবং অন্যান্য সম্পদের সঠিক ও সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা অনেকাংশে সম্ভব হয়।

৫। গ্রাহক তার চাহিদা মতো সেবা বা তথ্য পাচ্ছে কিনা তা নিয়মিতভাবে ফলোআপ বা মনিটরিং করার মাধ্যমে গ্রাহক সেবা নিশ্চিত করা যায়। যা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী সফলতার জন্য সহায়ক।

Presentation/Visibiltiy (উপস্থাপনা/দৃশ্যমানতা):

কোন ব্যবসায়ের সফলতার পিছনে সুন্দর এবং অর্থবহ উপস্থাপনা সহায়ক ভুমিকা পালন করে। এজেন্ট মালিকের আগ্রহ, বিনিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় সব আয়োজন থাকলেও যথাযথ ও সঠিক উপস্থাপনা কৌশলের অভাবে অনেক এজেন্ট ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান তার আশানুরূপ ফলাফল (Expected Result) পায় না। এক্ষেত্রে নিম্নের বিষয়সমুহের দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন-

১। এজেন্ট ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের অবস্থান এবং তার বাইরের আবরণ (Exterior) যেমন– সাইনবোর্ড, লোকেশন নির্দেশক, স্টিকার ইত্যাদি অবশ্যই এমনভাবে স্থাপন করতে হবে যেন তা সহজেই গ্রাহকের দৃষ্টি আর্কষন করতে পারে।

২। এজেন্ট ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ (Interior) পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ও সাজানো-গোছানো থাকলে তা গ্রাহকের অধিকতর আস্থা তৈরী করতে সহায়তা করে।

৩। এজেন্ট ব্যাংকিং লাইসেন্স, ট্রেড লাইসেন্স, চার্জ সিডিউল বা ফি তালিকা, ব্যাংক প্রদত্ত বিজ্ঞাপন (POSM), বিভিন্ন সতর্কতা নোটিশসমুহ ছাড়াও প্রয়োজনীয় সার্কুলার বা নীতিমালাসমুহ দৃশ্যমান স্থানে (Visible place) অবশ্যই ঝুলিয়ে রাখতে হবে।

৪। এজেন্ট ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মীদের পোশাক পরিচ্ছদ, সময়ানূবর্তিতা, উপস্থাপনা ও উত্তর দেয়ার ধরন, আইডি কার্ড ঝুলানো, ব্যাংকিং সংক্রান্ত সাধারন জ্ঞান ইত্যাদির দিকে নজর দিতে হবে যাতে গ্রাহক মনে কোন ধরনের বিভ্রান্তি (Confusion) তৈরী না হয়।

৫। এজেন্ট ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানে শুধুমাত্র এজেন্ট ব্যাংকিং ও এর সাথে সংশ্লিস্ট কার্যক্রম (Exclusive) পরিচালিত হবে। এজেন্ট পয়েন্টে ব্যাংকিং এর সাথে সর্ম্পকহীন কার্যকলাপ পরিচালিত হলে তা গ্রাহকের মনে বিভ্রান্তি ও অনাস্থা তৈরী করে।

উপরের উল্লেখিত বিষয়সমুহ ‘(STEP)’ ছাড়াও একজন এজেন্ট ব্যাংকিং পার্টনারকে আরো কিছু বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে যার জন্য আমি প্লাস (+) চিহ্ন ব্যবহার করেছি। একজন এজেন্ট ব্যাংকিং পার্টনার বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিস্ট ব্যাংকের নিয়মকানুন (Guidelines), এ্যান্টি মানি লন্ডাড্রিং (AML) ও টেররিস্ট ফাইন্যান্সিং (CFT), গ্রাহক নিরাপত্তা (Customer Security), পর্যাপ্ত বিনিয়োগ (Adequate Investment), দক্ষ মানবসম্পদ (Skilled Manpower) নিয়োগ, দলিলপত্র সংরক্ষণ (Record Keeping) ইত্যাদির দিকেও খেয়াল রাখবেন যাতে ব্যবসায়ীক সফলতা অর্জিত হয়।

লেখক: হোসাইন মারুফ ইমতিয়াজ, এজেন্ট ব্যাংকিং পেশাজীবী।