বিশেষায়িত বাণিজ্যিক ব্যাংকে রুপান্তরিত হচ্ছে সমবায় ব্যাংক

1

সমবায় অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক লিমিটেড বিশেষায়িত বাণিজ্যিক ব্যাংকে রূপান্তরিত হচ্ছে।

সমবায় ব্যাংকের চলমান কার্যক্রম অব্যাহত রেখেই বাণিজ্যিক ব্যাংকে রূপান্তরের জন্য ইতোমধ্যেই আইনের একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে বাংলাদেশ আইন কমিশন।

সোনালী ব্যাংকের দুঃখগাথা

পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য্য জানান, নতুন আইনটি জাতীয় সংসদে পাশ হওয়ার পর সমবায় ব্যাংক বিশেষায়িত বাণিজ্যিক ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু করবে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আশাবাদী যে সংসদের আগামী অধিবেশনে আইনটি পাশ হবে।

আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, দেশের সমবায় সমিতির সদস্যরা ছাড়াও যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠিত ব্যাংকটির সঙ্গে অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতোই লেনদেন করতে পারবেন।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে সমবায় ব্যাংককে বাণিজ্যিক ব্যাংকে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়া হয়। তখন সংশ্লিষ্ট নয়টি মন্ত্রণালয়কে নিয়ে একটি আন্ত:মন্ত্রণালয় কমিটি করা হয়। কমিটির পক্ষ থেকে সমবায় ব্যাংককে বিশেষায়িত বাণিজ্যিক ব্যাংকে রূপান্তর করতে একটি আইনের খসড়া করে দেয়ার জন্য আইন কমিশনের কাছে অনুরোধ করা করা হয়।

স্বপন ভট্টাচার্য্য বলেন, “আইন কমিশন একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে। আগামী দু-এক দিনের মধ্যে এটি আমাদের হাতে এসে পৌঁছার কথা। খসড়াটি পেলে আমরা পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করবো।”

আইন কমিশনের খসড়ায় বলা হয়েছে, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশে এরকম বাণিজ্যিক সমবায় ব্যাংক চালু আছে। এসব ব্যাংক সমবায় কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি বিষেশায়িত কৃষি, শিল্প বা বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করে দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। সমবায় ব্যাংককে নতুন ব্যাংক হিসেবে রূপান্তর করা হলেও এটিও একই ভূমিকা রাখতে পারবে।

বাংলাদেশ আইন কমিশনের চেয়ারম্যান, সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক টিবিএসকে বলেন, “২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে আন্ত:মন্ত্রণালয় কমিটি আইন কমিশনকে আইনের খসড়া তৈরি করে দেয়ার অনুরোধ জানায়। খসড়ার কাজ শেষ হয়েছে। শীগগিরই এটি সংশ্লিষ্টদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, “সমবায় ব্যাংককে বিশেষায়িত বাণিজ্যিক ব্যাংকে রপান্তরের জন্য অনেক দিন ধরেই কাজ চলছে। নতুন আইন পাশ হলেই ব্যাংকটি কার্যক্রম শুরু করতে পারবে।”

এদিকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সাথে যোগাযোগ করে জানা যায়, আইন কমিশন আইনের খসড়া জমা দিলে তা আইন মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। কেবিনেটের অনুমোদন পেলে সংসদের আগামী অধিবেশনেই এটি বিল আকারে উপস্থাপন করা হবে।

তিনি জানান, সমবায় ব্যাংককে বিশেষায়িত বাণিজ্যিক ব্যাংকে রূপান্তরে যেহেতু সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত আছে, আইনটি পাশ হতে তাই বেশি সময় লাগবে না।

১৯২২ সালে বাংলার কৃষকদের ঋণ প্রদানের জন্য বেঙ্গল প্রাদেশিক সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়। ভারত ভাগের পর ১৯৪৭ সালে ব্যাংকটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়। ঢাকায় পূর্ব পাকিস্থান সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীনে ব্যাংকটিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয় এবং ১৯৩৮ সালের ৩১শে মার্চ নতুন করে এর নামকরণ করা হয় পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সমবায় ব্যাংক লিমিটেড। স্বাধীনতার পরে এটিকে আবারো নতুন করে নাম দেয়া হয় বাংলাদেশ জাতীয় সমবায় ব্যাংক লিমিটেড। অবশেষে ১৯৭৭ সাল থেকে এটি বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক লিমিটেড হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

২০০০ সাল পর্যন্ত ব্যাংকটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিশেষায়িত ব্যাংকের তালিকাভুক্ত ছিল। ২০০১ সালে ব্যাংকটিকে নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান (NBIF) হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।

বর্তমানে দেশে প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার সমবায় সমিতি আছে, যার সদস্য সংখ্যা ১ কোটি ১৫ লাখ। এসব সমবায় সমিতিতে বেতনভুক্ত কর্মচারির সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ ৫৩ হাজার জন। সমবায় সমিতির সদস্যরা এই ব্যাংকে টাকা জমা রাখা, কৃষিকাজ ও ছোট ব্যবসাসহ নানা কাজের জন্য ঋণ নিতে পারে।সমবায় ব্যাংকের পরিশোধিতক মূলধন ১০০ কোটি টাকা। অনুমোদিত মূলধনের পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকা।

সমবায় ব্যাংকের নির্বাহী কর্মকর্তা ও মহাব্যবস্থাপক মমিনুল হক তালুকদার বলেন, বর্তমানে সমবায় ব্যাংকে শুধু সমবায় সমিতির সদস্যরা লেনদেন করতে পারেন। বিশেষায়িত বাণিজ্যিক ব্যাংকে রূপান্তরিত হলে এটি অন্যান্য তফসিলী ব্যাংকের মতোই কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। সমবায় কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি একইসাথে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে বলে এটি একটি বিশেষায়িত ব্যাংক হিসেবে বিবেচিত হবে।

তিনি বলেন, প্রস্তাবিত আইনটি পাশ হলে প্রথমে আঞ্চলিক পর্যায়ে এবং পরে ক্রমান্বয়ে দেশের সব স্থানে শাখা খোলা হবে। দেশে যেসব সমবায় সমিতি এখন সমবায় ব্যাংকের আওতায় পারিচালিত হচ্ছে, তার সবগুলো পুনর্গঠিত ব্যাংকের স্থানীয় শাখার আওতায় পরিচালিত হবে।

সমবায় বিভাগের সচিব রেজাউল আহসান জানান যে, ,সমবায় সমিতির নামে যেসব প্রতিষ্ঠান অবৈধ ব্যাংকিং পরিচালনা করছে, সমবায় ব্যাংককে বিশেষায়িত বাণিজ্যিক ব্যাংকে রূপান্তর করা হলে তা বন্ধ করা সহজ হবে। সাধারণ মানুষও আর প্রতারিত হবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, “বাংলাদেশে ব্যাংকের সংখ্যা অনেক বেশি। বেশি ব্যাংক থাকা ভালো, আবার ভালোও না। সমবায় ব্যাংককে বিশেষায়িত বাণিজ্যিক ব্যাংকে রূপান্তর করা হলে সেটি যেন আরেকটা খারাপ সরকারি ব্যাংকে পরিণত না হয়, সেজন্য পুনর্গঠিত ব্যাংকটিকে কঠোর মনিটরিংয়ের মধ্যে রাখতে হবে।”

1 COMMENT

Leave a Reply