ব্যাংক অ্যাকাউন্টের নমিনির অধিকার

লেখক: ড. এস এম আবু জাকের, ব্যাংকার, কলাম লেখক

ভদ্রলোক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। তার এক ছেলে, তিন মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। স্ত্রী মারা গিয়েছে অনেক আগে। পরিবারে তার ছেলে, ছেলের স্ত্রী এবং এক নাতিকে নিয়ে অবসর জীবন অতিবাহিত করছিলেন। একদিন পরিবারের সবায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়। অন্যরা সুস্থ হলেও ছেলেকে বাঁচানো গেল না। ছেলের মৃত্যুর পর চার বছরের নাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় পড়লেন। ছেলের স্ত্রী যদি দ্বিতীয় বিয়ে করে এ সংসার থেকে চলে যায়, নাতির কী হবে—তার দেখাশোনার ভার কার ওপর ন্যস্ত হবে, তার জীবনটা চলবেই বা কীভাবে। মেয়েরা কি ভাইপোর দায়িত্ব নেবে? তার সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না। তিনি তাই সিদ্ধান্ত নিলেন ব্যাংকে রক্ষিত তার সব টাকার নমিনি করবেন তার একমাত্র নাতিকে, যেন তার মৃত্যুর পর ওই টাকা দিয়ে নাতির ভবিষ্যৎ জীবন নির্বিঘ্ন হয়। ব্যাংকে গিয়ে ম্যানেজারকে তিনি বললেন, ‘আমার মৃত্যুর পর আমার হিসাবের সমস্ত টাকা যেন আমার নাতি পায় সেভাবে রেকর্ডপত্র সংশোধন করে নিন।’ বলাবাহুল্য, মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী বাবার আগে সন্তানের মৃত্যু হলে ওই সন্তানের ওয়ারিশরা দাদার সম্পত্তির ভাগ পায় না।

টেকনো ইনফো বিডি‘র প্রিয় পাঠক: প্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও চাকরির গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ টেকনো ইনফো বিডি তে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন।

অন্য একটি প্রেক্ষাপট, দুই ছেলে রেখে স্ত্রী মারা গেলে ভদ্রলোক একা হয়ে গেলেন। কারণ ছেলেদের বিয়ের পর কেউ তার সঙ্গে থাকে না। নিজের দেখাশোনা এবং একাকিত্ব অবসানের লক্ষ্যে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করলেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর ভালোবাসা এবং স্বামীর প্রতি দায়িত্ববোধ দেখে তিনি মুগ্ধ। তবে তিনি একটা বিষয় নিয়ে ভাবতে লাগলেন—তার মৃত্যুর পর নিঃসন্তান দ্বিতীয় স্ত্রীর অবলম্বন কী হবে? তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন ব্যাংকে রক্ষিত এফডিআরের নমিনি করবেন তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে, যাতে তার মৃত্যুর পর দ্বিতীয় স্ত্রীর ভরণপোষণে কোনো সমস্যা না হয়। তার দ্বিতীয় বিয়ের ব্যাপারটা ছেলেরা ভালোভাবে নেয়নি বলে তার মৃত্যুর পর ছেলেরা যে তাদের সৎ-মাকে দেখাশোনা করবে না এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত। তাই তার এ সিদ্ধান্ত।

ব্যাংক অ্যাকাউন্টের নমিনির অধিকার নিয়ে নানা ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ এ-সংক্রান্ত একটি মামলার রায় দেন যে মৃত ব্যক্তির ব্যাংকে জমাকৃত টাকা নমিনি পাবেন না, এ অর্থ পাবেন উত্তরাধিকারীগণ। ওই মামলায় দেখা যায়, ২০১৪ সালে শহিদুল হক চৌধুরী তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে নমিনি করে ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কেনেন। পরে শহিদুল হক মারা গেলে তার দ্বিতীয় স্ত্রী পুরো টাকা একাই ভোগ করতে চাইলে মৃত শহিদুলের প্রথম পক্ষের সন্তানরা টাকা দাবি করে মামলা করে। নিম্ন আদালত রায় দেয়—যে নমিনি সে টাকা পাবে। এ রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করলে রায় আসে—ওই টাকা নমিনি নয়, উত্তরাধিকারীরা পাবেন। রায়ে বলা হয়—‘সঞ্চয়পত্রের মালিকের নমিনি ট্রাস্টি হিসেবে থাকবে, মালিক মারা গেলে নমিনি ওই অর্থ উত্তোলনের অধিকারী হবেন ও উত্তরাধিকার আইন অনুসারে মৃত ব্যক্তির সাকসেসরদের (উত্তরাধিকারী) মধ্যে তা বণ্টন করবেন।’

জানা যায়, এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল হয়েছে। মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তি মুসলিমের ক্ষেত্রে মুসলিম ফারায়েজ মোতাবেক উত্তরাধিকারীদের মাঝে বণ্টিত হয়, এটা সবাই জানে এবং সে অনুযায়ী মানুষ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার সম্পদ ব্যবস্থাপনা করে। যদি কেউ মনে করে যে তার মৃত্যুর পর সম্পদ বণ্টনে তার ইচ্ছার প্রতিফলন হবে না, তখন তিনি মৃত্যুর আগে তার কিছু সম্পদ বা সব সম্পদ হেবা বা দানপত্রমূলে বণ্টন করে যান। ব্যাংকে রক্ষিত অর্থও সে রকম বণ্টনের ইচ্ছা সবাই করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একাধিক নমিনিকে কে কত অংশ পাবে তা আমানতকারী তার অ্যাকাউন্টে ঘোষণা দিয়ে দেন। এটা হিসাবধারীর যেমন একটি অধিকার, তেমনি হিসাবধারীর মৃত্যুর পর ওই টাকা ঘোষণা অনুযায়ী ভোগ করার অধিকারও নমিনির হওয়া যুক্তিযুক্ত। মৃত ব্যক্তির অসিয়ত একটি আইনসিদ্ধ প্রথা। নমিনি নির্বাচনও এক ধরনের অসিয়ত। সুতরাং নমিনি টাকা উত্তোলনের অধিকারী হলে ওই টাকা ভোগ করারও অধিকারী হওয়া উচিত। আর যদি ওই টাকা নমিনিরা ভোগ করতে না পারেন, তা হলে লেখার শুরুতে যে দুটি প্রেক্ষাপটের বর্ণনা দেয়া হয়েছে সে প্রেক্ষাপটের মানবিক বিষয়গুলো অমানবিকতার জাঁতাকলে পিষ্ট হবে, যা মোটেও কাম্য নয়। তাছাড়া নমিনি যদি উত্তরাধিকারী না হন, তখন ওই অর্থ উত্তোলনের জন্য তিনি কোনো সহযোগিতাও করবেন না, কারণ ওই অর্থে তো তার কোনো স্বার্থ নেই।

ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ধারা ১০৩ (৩)-এ বলা হয়েছে, ‘আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনের বা কোনো উইলে বা সম্পত্তি বিলি-বণ্টনের ব্যবস্থাসংবলিত অন্য কোনো প্রকার দলিলে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, উপধারা (১)-এর অধীনে কোনো ব্যক্তিকে মনোনীত করা হইলে বা উপধারা (২)-এর অধীনে কোনো ব্যক্তি নির্দিষ্ট হইলে তিনি একক আমানতকারী বা ক্ষেত্রমত যৌথ আমানতকারীগণের মৃত্যুর পর, উক্ত আমানতের ব্যাপারে একক আমানতকারীর বা ক্ষেত্রমত সকল আমানতকারীর যাবতীয় অধিকার লাভ করিবেন এবং অন্য যেকোনো ব্যক্তি উক্ত অধিকার হইতে বঞ্চিত হইবেন।’ সুতরাং নমিনির অধিকার যে নিরঙ্কুশ তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা আইনেই আছে। এর পরও যে প্রশ্নটি ঘুরেফিরে আসছে তা হলো নমিনি উত্তোলনকৃত টাকা উত্তরাধিকারীদের কাছে বণ্টন করে দিতে বাধ্য কিনা? ওই আইনের ১০৩(৪) ধারায় বলা হয়েছে, ‘এ ধারার বিধান অনুযায়ী কোনো ব্যাংক কোম্পানি কর্তৃক টাকা পরিশোধিত হইলে সংশ্লিষ্ট আমানত সম্পর্কিত উহার যাবতীয় দায় পরিশোধ হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে।’ অর্থাৎ ব্যাংকার নমিনিকে অর্থ পরিশোধের পর ব্যাংকারের আর কোনো দায়দায়িত্ব থাকে না। নমিনি ওই টাকা নিজে ভোগ করছেন, না উত্তরাধিকারীদের মাঝে বণ্টন করে দিচ্ছেন—এটা ব্যাংকারের দেখার বিষয় না। তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যখন নমিনি হন মৃত ব্যক্তির স্ত্রী এবং মৃত ব্যক্তির ছেলে মেয়েরা নাবালক; এক্ষেত্রে ওই নমিনি সব টাকাপয়সা উত্তোলন করে পুনর্বার বিয়ে করে ছেলেমেয়েদের ছেড়ে যদি চলে যান, তখন ছেলেমেয়েদের ভরণপোষণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে মানবিকতার প্রশ্ন ওঠে বলে অনেক ব্যাংকার নমিনিকে বুঝিয়ে নাবালক সন্তানদের নামে টাকা এফডিআর করে দিতে দেখা যায়। এ ধরনের মানবিক বিষয়গুলোকে সামনে রেখে মৃত ব্যক্তির অর্থ ছাড়করণে সুনির্দিষ্ট আইনের কোনো বিধান নেই। আবার কোনো ব্যক্তি যদি তার অ্যাকাউন্টে কোনো নমিনির ঘোষণা না দেন, তখন মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশরা সাকসেশন সার্টিফিকেটমূলে অ্যাকাউন্টের টাকা বণ্টন করে নেন। সব ক্ষেত্রেই সাকসেশন সার্টিফিকেট অনুযায়ী অ্যাকাউন্টের টাকা বণ্টন হলে নমিনি ঘোষণার ব্যাপারটার কোনো মূল্য থাকে না। এটা সর্বজনবিদিত মৃত ব্যক্তির (অ্যাকাউন্ট হোল্ডার) ইচ্ছা বা অসিয়ত বা নির্দেশের প্রতি সম্মান দেখানো সব পক্ষেরই উচিত— নমিনি, উত্তরাধিকারী, ব্যাংকার, বিচারক সবায়।

মৃত অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের ইচ্ছা ছিল তার রেখে যাওয়া টাকার মালিক হবেন তার ঘোষণা অনুযায়ী নমিনিই। এক্ষেত্রে তার ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য তার অর্থ নমিনিকেই দেয়া উচিত। হিসাবধারী যদি অবগত হন যে তার নমিনি ভোগের অধিকার পাবেন না, শুধু বণ্টনের জন্য উত্তোলনের অধিকার পাবেন, তখন হিসাবধারীর বিবেচনা অন্য রকমও হতে পারে। মৃত্যুর আগে অনেক ব্যক্তি ওয়ারিশদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বণ্টন করে যান। সে অনুযায়ী একেক হিসাবের জন্য একেক ওয়ারিশকে নমিনি করে যান। যদি সব হিসাবের অর্থকে এক করে ফারায়েজ অনুযায়ী বণ্টন হয় তখন ন্যায়বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, কারণ মৃত ব্যক্তি তার স্থাবর সম্পত্তি যদি বণ্টন করে দিয়ে যান তার মৃত্যুর পর ওই বণ্টিত সম্পদ তো পুনর্বার বণ্টনের প্রশ্ন আসে না। তাছাড়া ব্যাংক হিসাবের তথ্য হিসাবধারীগণ সবসময় গোপন রাখেন। ধরি, কোনো ব্যক্তি ‘ক’ ব্যাংকের হিসাবে তার প্রথম ছেলেকে নমিনি করল এবং ‘খ’ ব্যাংকের হিসাবে তার দ্বিতীয় ছেলেকে নমিনি করল। হিসাবধারীর মৃত্যুর পর যে ছেলে যে হিসাবের নমিনি সে সেই হিসাব থেকে গোপনীয়তার সঙ্গে টাকা উত্তোলন করল। এক্ষেত্রে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ফারায়েজ মোতাবেক টাকা বণ্টনের কোনো সুযোগ নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত একে অন্যের অর্থের ব্যাপারে তথ্য আদান-প্রদান না করে।

মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া ব্যাংকের টাকা যদি নমিনি ভোগ করতে না পারেন, তাহলে মৃত ব্যক্তির ইচ্ছার প্রতিফলন হয় না। আবার প্রকৃত উত্তরাধিকারীগণ নিঃস্ব হয়ে যাবেন কিন্তু নমিনি অনেক টাকার মালিক হবেন—তাও অমানবিক বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। নমিনি ও উত্তরাধিকারীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন যাতে না হয় সে ব্যাপারে আইনের যথাযথ বিধান প্রয়োজন। আর যেক্ষেত্রে গ্রাহক তার অ্যাকাউন্টে নমিনি সংযুক্ত করতে ইচ্ছুক নন, সেক্ষেত্রে তার রেখে যাওয়া অর্থ রাষ্ট্রের বরাবর ন্যস্ত হওয়া যুক্তিযুক্ত। এ-সংক্রান্ত আইনের বিধানও প্রয়োজন।

আরও দেখুন:
মৃত ব্যক্তির টাকা কারা পাবেন?
মৃত ব্যক্তির হিসাবে গচ্ছিত টাকা কে পাবে, নমিনী না ওয়ারিশ? এক্ষেত্রে ব্যাংকের করনীয় কি?
মৃত ব্যক্তির হিসাব থেকে নমিনী কর্তৃক টাকা উত্তোলনের নিয়ম
ব্যাংকে রাখা মৃত ব্যক্তির টাকা কে পাবেন, আবেদন শুনবেন আপিল বিভাগ

প্রথম প্রকাশিত: দৈনিক বনিক বার্তা।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button