ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংস্কারে কিছু পরামর্শ

0

ব্যাংক খাতের সমস্যা, চ্যালেঞ্জ ও নৈপুণ্য নিয়ে আমরা বিভিন্ন সময়ে আলোচনা করেছি। বর্তমানে তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা। বাংলাদেশে আর্থিক খাতের ভূমিকা ও কাজ নিয়ে আমরা বিভিন্ন সময় আশাবাদ ব্যক্ত করেছি কিন্তু দিন দিন এটা সমস্যাগ্রস্ত হচ্ছে। এ সমস্যাগুলোর সমাধান না করলে আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদে সংকটে পড়বে এবং তাতে জনগণ সর্বোপরি রাষ্ট্রের ক্ষতি। আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন ও বাংলাদেশ ব্যাংক দ্বারা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রিত হয়। এখন দেশে এ ধরনের ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩৪-এ উন্নীত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত, কিছু স্থানীয় উদ্যোগের এবং বাকিগুলো যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে। সমষ্টিগতভাবে এসব প্রতিষ্ঠানের নৈপুণ্য আশানুরূপ নয়। এটিও আমাদের জন্য গভীর দুশ্চিন্তার ও উদ্বেগের।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত বাংলাদেশ ব্যাংকই অনুমোদন ও নিবন্ধন দেয়। কিন্তু এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তত্ত্বাবধান ব্যাংকের চেয়ে তুলনামূলক কম, নজরদারি দুর্বল বৈকি। এ সুযোগে নানা ধরনের অনিয়ম ঘটছে এবং গ্রাহকের কাঙ্ক্ষিত সেবাপ্রাপ্তি ব্যাহত হচ্ছে। কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবশ্য এখনো ভালো করছে। বাকিগুলোর অবস্থা খুব একটা ভালো নয় বলেই খবর মিলছে। আগে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততার শর্ত ছিল ২৫ কোটি। এখন এটি বাড়িয়ে ১০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। আকার, মূলধন পর্যাপ্ততা এসব বিষয় নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা বিভিন্ন সময়ে হয়েছে। এ নিবন্ধে মূলত আলোকপাত করার চেষ্টা করব এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনের দিকটি নিয়ে। প্রথম কথা হলো, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যপরিধি সীমিত। এসব প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের মতো কাজ করতে পারে না। কেননা তাদের নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সেদিক থেকে সীমিত পরিধিতে তাদের কার্যক্রমকে দেখতে হবে। তাদের কাজ আমানত সংগ্রহ, ঋণ ও লিজ দেয়া, ব্রিজ ফাইন্যান্সিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে তাদের আয়ের পথ সংকুচিত। তাদের আয় মূলত ঋণ দেয়ার মাধ্যমেই আসে। আমানত সংগ্রহ করে ঋণ দিতে না পারলে তাদের টিকে থাকা দুষ্কর। মেয়াদি ঋণ বা আমানতগুলো ভালোভাবে কাজ না করলে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এখানে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি। তারা পুঁজিবাজারে সাবসিডিয়ারি হিসেবে মার্চেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে কাজ করে থাকে। এমনকি শেয়ারবাজারে ব্রোকার হিসেবে কাজ করারও তাদের সুযোগ আছে। ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য তারা বরং এ সুযোগগুলো খুঁজে বের করতে এবং কাজে লাগাতে পারে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম অসুবিধা হলো, তিন মাসের বেশি মেয়াদি ঋণ তারা দিতে পারে না। তদুপরি অনেক প্রতিষ্ঠানে তারল্য সংকটও বিদ্যমান। কেননা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের রেপো রেট, রিভার্স রেপো রেট ও অন্যান্য সুবিধা পায় না। ব্যাক টু ব্যাক ডিপোজিটও তারা নিতে পারে না। স্বল্পমেয়াদি ঋণের সময়সীমা আগে ছয় মাস ছিল, এখন তিন মাস করা হয়েছে। এটা তদের বড় সীমাবদ্ধতা। ফলে তারা খুব বেশি ঋণ দিতেও পারে না এবং এ বাবদ সুদ আয়ও তেমন নেই। বলা চলে, তাদের তহবিলের উৎস আমানত সংগ্রহ। তদুপরি তারা ব্যাংক থেকেও কিছু ঋণ নিয়ে তহবিল সংগ্রহ করে। বেশি সুদের বিনিময়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ায় তাদের কস্ট অব ফান্ড অনেক বেড়ে যায়। এরপর মার্জিন, অপারেশনাল কস্ট মিলিয়ে মুনাফা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

দেখা যাচ্ছে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা মোটামুটি একই রকম। একটা হলো, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব। একজন চেয়ারম্যান একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে থাকছেন। এখানে পর্ষদ চেয়ারম্যানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অনেক কম। বাংলাদেশ ব্যাংককে বিষয়টি দেখতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখেনি। ব্যাংকে যেমন আমানত রাখা হয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয়ও বেশি সুদের আশায় মানুষ আমানত রাখে। শুধু দরিদ্র নয়, অনেক মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তও সেখানে আমানত রাখছেন। পিপলস লিজিংয়ে অর্থ লোপাটের ঘটনায় এটি বেরিয়ে এসেছে। অবশ্য একটা বিষয় স্বীকার করতে হবে যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মন্দ ঋণের হার তুলনামূলক কম। এটি ৫ শতাংশের বেশি নয়। তবুও এ হার কিছুটা উদ্বেগের। তাদের আয়ের অন্যতম উৎস ঋণ হওয়ায় সেটি একটু খারাপ হলে তাতে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। এখানে উন্নতি করতে নজর দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বোর্ডের সদস্যরাও অনেক সুযোগ-সুবিধা নেন। এটা বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত, তাদের আর্থিক প্রতিবেদন ও অডিট রিপোর্ট খুব বেশি মানসম্পন্ন নয়। এটা ব্যাংকের ক্ষেত্রেও পরিলক্ষিত হচ্ছে, বিভিন্ন কোম্পানির ক্ষেত্রেও হচ্ছে। ব্যাংকের কথা বেরিয়ে আসছে, কারণ এখানে অনেক লোক যুক্ত। তাদের অনেক ধরনের স্টেকহোল্ডার আছে, তারা নজর রাখে। যারা আমানতকারী আছে, যারা ঋণ নিচ্ছে, তারাও নজর রাখে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদনে অনিয়মগুলো খুব বেশি ধরা পড়ে না। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অডিট রিপোর্টে অসংগতি ধরা পড়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এখানে ম্যানেজমেন্ট ও অডিটরের দায় রয়েছে। একটা বিখ্যাত অডিটর কোম্পানিও এ ধরনের জালিয়াতি করেছে। এখনো কিছু ব্যাংক নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাদের তালিকায় রেখেছে। এটি খুব খারাপ। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সময়োচিত পদক্ষেপ ও তদারকি নেই। সাম্প্রতিক সময়ে উত্তরা ফিন্যান্সে একটি কেলেঙ্কারির খবর বেরিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন ও অডিট রিপোর্টে অনিয়ম ধরা পড়েছে। দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশ ব্যাংক শুরুতেই দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো শক্ত ব্যবস্থা নেয়নি। ব্যবস্থা নিলে এ পর্যায়ে অবনমন ঘটত না। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করবে বলা হচ্ছে। অথচ এটি অনেক আগেই করা উচিত ছিল।

আগেই উল্লেখ করেছি, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিলের উৎস খুব সীমাবদ্ধ। ৬০ শতাংশ আমানত, বাকিটা তারা ঋণ নেয়; জয়েন্ট ভেঞ্চার হলে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করে। সেক্ষেত্রে তারা যদি ভালো সেবা দেয়, তাদের প্রতি আস্থা থাকে, নিরাপত্তা থাকে; তাহলে সেখানে এমনিতেই লোকে আমানত রাখবে। অবস্থা ভালো হলে ঋণগ্রহীতাদের অনেকেই তাদের কাছে যাবে। এখন অনেকেই যায় না লিজিং কোম্পানি বলে। মূলত সেখানে গৃহায়ণ ঋণ, ব্রিজ ফাইন্যান্সিং প্রভৃতির জন্য গ্রাহক যান। কিন্তু বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে যায় না। সেগুলোকে তারা প্রাথমিকভাবে বিকল্প অর্থায়নের উৎস হিসেবে ব্যবহার করে। আরেকটি বিষয় হলো, তাদের ঋণ প্রডাক্টগুলো গতানুগতিক। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা মর্টগেজ নেয়। মর্টগেজ বিক্রি করে বা কোলাট্যারল বিক্রি করে ঋণ আদায় করা কঠিন। ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এখন দেখা উচিত ব্যবসার নগদ প্রবাহ, ব্যবসার আউটলুক ইত্যাদি। একটি প্রতিষ্ঠানের স্থিতিপত্রে রিয়েল অ্যাসেট হয়তো নেই কিন্তু অর্থপ্রবাহ ভালো (যেমন একটি বিউটি পার্লার, ফাস্টফুডের দোকান), এটি এখন দেখার সময় এসেছে। এদিকটিতে মনোযোগ না দিলে তারা টিকতে পারবে না। একই সঙ্গে মানুষের কাছে আস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নইলে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। আর্থিক খাতে ডমিনো ইফেক্ট বেশি পড়ে। কিছু নামি লিজিং কোম্পানি ঝামেলায় পড়ায় বাকিগুলোর ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ব্যাংকিং পরিভাষায় একটি কথা আছে ‘ব্যাংক রান’। সেটি হলো কোনো ব্যাংক ঝামেলায় পড়লে মানুষ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে হুড়মুড়িয়ে অর্থ উত্তোলন শুরু করে। এজন্য সাধারণত ব্যাংক অবসায়ন করা হয় না, পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হয়। অবসায়ন করলে অন্য ব্যাংকগুলো আরো ঝামেলায় পড়ে।

ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সমস্যাসংকুল হয়, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত পুনর্গঠন করা, তাদের ম্যানেজমেন্ট শক্তিশালী করা। এর বিপরীতে চট করে অবসায়ন বা পুরো টাকা ফেরত দেয়ার প্রক্রিয়া গ্রহণ করার প্রজেক্ট বাস্তবায়ন খুব কঠিন। অবশ্যই আশ্বস্ত করার মাধ্যমে বড়দের আসলের বিনিময়ে প্রতিশ্রুত শর্তে সুদ প্রদান এবং ছোট বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেয়ার একটি কর্ম-পরিকল্পনা নেয়া যেতে পারে। এভাবে পুনর্গঠন করা হলে অধিকতর সুফল মিলবে। একজন প্রশাসক নিয়োগ না দিয়ে পুরো পরিচালনা পর্ষদকেই পুনরুজ্জীবিত করা প্রয়োজন। একজন প্রশাসকের পক্ষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা খুব কঠিন কাজ। যারা কাজ করবে তাদেরও সাপোর্ট লাগবে। ধরা যাক, পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়া হলো, বাইরে থেকে একজনকে পাঠিয়ে দেয়া হলো। সে কাজ করতে পারবে না। সহযোগিতাও পাবে না। আবার তার পক্ষে অপরাধগুলো ও এর ধরন চেনাটাও কঠিন। এক্ষেত্রে গ্রাহক চেনাও জরুরি। বাইরে থেকে যে আসবে, সে গ্রাহককে চিনবে না। যেকোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকদের সঙ্গে আলোচনা ও কথাবার্তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, কিছু ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান একীভূত করার কথাও ভাবতে হবে। কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান ভালো আছে, সক্ষমতা আছে, তাদের সঙ্গে অন্যগুলো একীভূত করা যেতে পারে। ব্যাংকগুলোও এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান একীভূত করতে পারে। ব্যাংক যেভাবে সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান চালায়, সেভাবে তারা এসব প্রতিষ্ঠান চালাতে পারে। অথবা আরেকটি দক্ষ ম্যানেজমেন্টসম্পন্ন ভালো লিজিং কোম্পানি মূলধন বাড়ানোর জন্য সমস্যাসংকুল এক বা দুটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে নিতে পারে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে। একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণের এখন সময় এসেছে। সমস্যাসংকুল প্রতিষ্ঠানগুলো বেশিদিন টিকতে পারবে না। এখানে প্রতিযোগিতাও বেশি নেই। এমনকি ছোট কোনো প্রতিষ্ঠান ভালো সেবা দিলেও টিকতে পারবে না। কিছু বিশেষ গোষ্ঠী, ঋণগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান এখানে নিয়োজিত। একটি প্রতিষ্ঠান এক পক্ষকে দেবে, আরেক প্রতিষ্ঠান আরেক পক্ষকে ঋণ দেবে। অনেক সময় যৌথভাবেও ঋণ দেয়। অনেকেই আবার লোন সিন্ডিকেশনে অংশগ্রহণ করে। এ অবস্থায় ছোট কোনো প্রতিষ্ঠান এগোতে পারবে না। আমরা আসলে দেখি তাদের ইকুইটি কেমন, অ্যাসেট কেমন। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আয় মূলত নির্ভর করে কতটুকু ঋণ দেয় এবং কতটুকু আদায় করে, তার ওপর। কারণ সুদ আয়টাই তাদের তহবিলের বড় উৎস। দ্বিতীয়ত, তারা কস্ট অব ফান্ড কীভাবে ম্যানেজ করে তার ওপর তাদের মুনাফাযোগ্যতা নির্ভর করে। আকার বড় হলে যে মুনাফা বেশি হবে, তাও নয়। একেবারে ছোট হলে তুলনামূলকভাবে মুনাফা কমবে, তাও নয়। আছে দক্ষ ম্যানেজমেন্টের প্রসঙ্গ। দক্ষভাবে পরিচালনা করা না গেলে প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা কঠিন। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা ফেরাতে হবে। এসব বিষয়ের ওপরই তাদের মুনাফাযোগ্যতা নির্ভর করে।

আরেকটি বিষয় এখানে লক্ষণীয়, অনেক লিজিং কোম্পানির উদ্বৃত্ত অর্থ আছে। কিন্তু তারা ঋণ দিতে পারছে না। তাদের সম্ভাব্য ঋণগ্রহীতা খুঁজে বের করতে হবে। যেসব সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা ঋণের জন্য ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, তাদের খুঁজে বের করতে হবে। অর্থাৎ তাদের গ্রাহকভিত্তি বহুমুখী করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, এখানে বাংলাদেশ ব্যাংককে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। তাদের তহবিলের ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যেমন প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে লিজিং কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে এসএমই ঋণ বণ্টন করতে পারে। কারণ ১০-২০ লাখ টাকার ঋণ তারা অনেক লোককে দিতে পারে। আবার তারা যদি এসএমই ফাউন্ডেশন বা পিকেএসএফের সঙ্গে আলাপ করে, তারাও কাজটি করতে পারত। এদের কাজে লাগানো বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ছিল।

বিশ্বের বহু দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান আছে। হয়তো বাংলাদেশের মতো এত স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যময়ভাবে নেই। যুক্তরাষ্ট্রে যেমন শহরভিত্তিক আলাদা আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তারা দেখে গ্রাহক কারা। তারা গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার চেষ্টা করে। তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোয় জনগণের আস্থা থাকে, সুপরিচালিত। সেখানকার মানুষের চাহিদা পূরণ করে। আরেকটি বিষয় হলো, সেখানকার ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে ভালোভাবে সংযুক্ত। ভৌত পরিসর ছোট হলেও ম্যানেজমেন্ট, প্রক্রিয়া, প্রযুক্তির দিক থেকে কোনোভাবে তারা পিছিয়ে থাকে না। অন্যান্য দেশেও বহু ফিন্যান্স কোম্পানি আছে। ওইসব দেশের ফিন্যান্স কোম্পানিগুলো বিদেশেও বিনিয়োগ করে। আমাদের দেশে যেসব প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করতে চায়, তাদের অনেকেই ফিন্যান্স কোম্পানি, ব্যাংক নয়। তারা কোনো প্রকল্পের স্থায়িত্ব ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিশীলতা দেখলে বিনিয়োগ করে। অন্য কিছু দেখে না। বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এটিও একটা সমস্যা। সবচেয়ে বড় বিষয়, ওইসব দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোয় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনগণের আস্থা থাকে, যা বাংলাদেশে যথেষ্ট অভাব রয়েছে।

আরোও পড়ুনঃ বিশেষায়িত বাণিজ্যিক ব্যাংকে রুপান্তরিত হচ্ছে সমবায় ব্যাংক

পরিশেষে বলব, ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা কঠিন। এর জন্য সৎ, যোগ্য ও দক্ষ লোকজনও দরকার। আমার জানামতে, কিছু প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো কর্মীদের বেতনও দিতে পারে না। দিলেও এত স্বল্প বেতন দেয় যে অনেকেই সেখানে যেতে চায় না। এর ওপর লজিস্টিকস নেই, অফিসগুলো ভালো নয়। প্রযুক্তিও ভালোভাবে ব্যবহার করা যায় না। ভালো সফটওয়্যার নেই। ম্যানেজমেন্ট ও প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়ানোর দিকটি যদি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো না দেখে, তাহলে তারা বেশি দূর এগোতে পারবে না। এত ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দরকার আছে কিনা, তা বিশ্লেষণ করে দেখা দরকার, যদি না তারা কোনো সুনির্দিষ্ট কাজ করে। জয়েন্ট ভেঞ্চারে ব্যবস্থাপনা, ফাইন্যান্স প্রভৃতি ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য আছে কিনা, সেটিও দেখতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে এত আর্থিক প্রতিষ্ঠান মনিটর করাও কঠিন। বাংলাদেশে আর্থিক খাতে সংস্কারগুলো যথাযথভাবে করা হয়নি, সংস্কারের নামে উল্টো কাজ হয়েছে। সময় এসেছে নতুনভাবে বিন্যাস করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে নেয়ার।

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।

Leave a Reply