রাকাবে অনিয়মটাই নিয়ম

0
RAKAB

ব্যাংকের অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার কারণে অতিষ্ঠ হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে অভিযোগ করেছেন এক কর্মকর্তা। দীর্ঘদিন থেকে লোকসান বয়ে বেড়ানো অন্যতম কারণগুলো ওই অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়। দুষ্টচক্রের দৌরাত্ম্য থেকে ব্যাংকটিকে রক্ষা করার জন্য রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার আকুতি জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ‘স্যার একটি বিষয় আমাকে খুব ব্যথিত করে, রাকাবে অনিয়মটাই নিয়ম। এখানে নিয়মকানুনের কেউ কোনো তোয়াক্কাই করে না। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী আছে, যারা অফিসের কোনো কাজকর্মই করে না। রাকাবে অফিসারদের দুটি দল আছে। এর মধ্যে একটি অফিসার্স ফোরাম, যার সভাপতি ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তৌফিক এলাহি। সে কোনোদিন অফিস করে না। বেলা ১১টা বা ১২টার দিকে অফিসে এসে স্বাক্ষর করে সঙ্গে সঙ্গে বের হয়ে যায়। ছেলেমেয়েকে স্কুল-কলেজ ও বউকে অফিসে নিয়ে যাওয়াই তার মূল কাজ। সে সিবিএ’র সভাপতি থাকাকালে কর্মচারীদের কাছ থেকে নিয়োগ, বদলি আর ফটকাবাজি করে অনেক টাকা-পয়সা উপার্জন করেছে।’

‘অপর সংগঠন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন। এর ব্যাপ্তি সব রাকাবের ৮০ শতাংশ কর্মকর্তার মধ্যে, যার সাধারণ সম্পাদক ঋণ ও অগ্রিম বিভাগ-১-এ কর্মরত সহকারী মহাব্যবস্থাপক শওকত শহীদুল ইসলাম। যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তখন সে ওই পার্টি করে। সেও ঠিকমতো অফিস করে না’।

‘স্যার প্রধান কার্যালয়ে এমন অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী আছে যারা ৮, ৯, ১০, ১১, ১২ বছরব্যাপী প্রধান কার্যালয়ে আছে। বদলি হয় কিন্তু হেড অফিসের এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে। শওকত শহীদুল ইসলাম এখানে আছে ১২ থেকে ১৪ বছর ধরে। কিন্তু ব্যাংকের প্রবিধানমালা অনুযায়ী এক শাখায় তিন বছরের বেশি কোনো কর্মকর্তা অবস্থান করতে পারবে না। এই কাজে মেয়েরা তো আরও এগিয়ে। মেয়েদের একটি অলিখিত গ্রুপ আছে, যারা কোনো সময় বদলি হয় না। কাজের বদলে সারাদিন ঘুরে আর ফেসবুক চালায়। তাদের মধ্যে অন্যতমÑঋণ আদায় বিভাগ-১-এর কর্মকর্তা মেহেনাজ সাবা, বাজেট ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ বিভাগের মুখ্য কর্মকর্তা জোবাইদা নাসরিন, ঋণ ও অগ্রিম বিভাগ-১-এর মুখ্য কর্মকর্তা রুমানা, কেন্দ্রীয় হিসাব বিভাগ-২ বিভাগের কর্মকর্তা শামিমা সুমি, গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগের কর্মকর্তা ইভা, মনিটরিং বিভাগের কর্মকর্তা রুনা, মনিটরিং বিভাগের সহকারী মহাব্যবস্থাপক শামিমা ফেরদৌস শিমুল ও কমপ্লায়েন্স বিভাগের ঊর্ধ্বতন মুখ্য কর্মকর্তা সালমা। এসব মেয়ের এত বাড়াবাড়ির একটাই কারণ। চেয়ারম্যান স্যারের স্টাফ অফিসার মুকুল বর্ধন।’

‘স্যার, দুর্নীতিতে সবার ওপরে আইসিটি বিভাগ এবং সাধারণ সেবা বিভাগ। যেমন কম্পিউটার-সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি ক্রয় করার সময় অনেক বাজেট দেখিয়ে কম টাকার লো কোয়ালিটি পণ্য ক্রয় করে থাকে। শাখায় একটি কম্পিউটার দেয়া হলে তার দাম নির্ণয় করা হয় এক লাখের ওপরে। কিন্তু আসলে কম্পিউটারটি ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় কেনা। আবার হেড অফিসের প্রতিটা দপ্তরে প্রিন্টারের কার্টিজ দেয়া হয় সেটা অনেক নিম্নমানের, যা কয়েকদিনেই নষ্ট হয়ে যায়। আবার রিপ্লেস দেয়া হয়। কিন্তু কার্টিজ বাবদ অনেক টাকা বরাদ্দ পেয়ে থাকে। কেনা হয় তার অর্ধেক দামে। আইসিটি বিভাগ প্রতিটা ক্রয় কাজে পুকুরচুরির মতো দুর্নীতি করে থাকে, যা কেউ খালি চোখে ধরতে পারে না।’

‘আর সাধারণ সেবা বিভাগ প্রতি বছর ক্যালেন্ডার ছাপানো এবং বিভিন্ন দপ্তরের বই ছাপানো বাবদ প্রিন্টিং প্রেসের কাছ থেকে কাজ দেওয়ার জন্য কমিশন হিসাবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন সে বিভাগের দায়িত্বে থাকা সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. মিজানুর রহমান।’

‘স্যার পরিশেষে ঋণ ও অগ্রিম বিভাগ-১-এর সহকারী মহাব্যবস্থাপক শওকত শহীদুল ইসলামের কার্যাবলি নিয়ে কিছু বলতে চাই। রাকাবে এমডি নামে আছে। কিন্তু সব কামে শওকত। ব্যাংকের যে কোনো সিদ্ধান্তে শওকত। এমডি এখানে অসহায়। কিন্তু আমরা বুঝি না এমডি একটু শক্ত হলে এরা এগুলো করতে পারত না। ব্যাংকের পোস্টিং, বদলি সব জায়গায় শওকতের আধিপত্য। রাকাবের প্রায় সব কর্মকর্তা-কর্মচারী বদলি হতে চাইলে শওকতের কাছে ধরনা দিতে হয়। শওকত হুমকি দেয়, সিবিএর সবাই আর কত দিন কর্মচারী থাকবি। কর্মকর্তা হলে তো আমার পায়ের নিচে আসতেই হবে। এজন্য সিবিএর নেতারাও এমডির কাছে পাত্তা পায় না। বাধ্য হয়ে শওকতের কাছেই ধরনা দিতে হয়। উনি বলে ২০২৬ সাল পর্যন্ত আমার চাকরি আছে। এই ব্যাংকের কী করি দেখিস। আমি অলিখিত এমডি।’

‘স্যার আপনার কাছে আকুল আবেদন রাকাবের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে একটু হস্তক্ষেপ করবেন। আমরা চাই সব কর্মকর্তা-কর্মচারী ঠিকমতো অফিস করুক, শৃঙ্খলা বজায় থাকুক, সবাই নিয়মনীতি মেনে চলুক, বদলি আদেশে স্বচ্ছতা থাকুক।’

এ বিষয়ে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর একেএম সাজেদুর রহমান খান বলেন, ‘যারা এসব অভিযোগ করে তারা আসলে কাজের লোক নয়। কাজ করলে অভিযোগ করার সময় পেত না। ব্যাংকের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়, তার সবকিছু সঠিক নয়। আমি যতদিন সেখানে (রাকাব) ছিলাম ততদিন সচ্ছতা রাখার চেষ্টা করেছি। আশা করি, ভবিষ্যতেও স্বচ্ছতা বজায় থাকবে।’

উল্লেখ, দীর্ঘদিন ধরেই লোকসান গুনে আসছে বিশেষয়িত এই ব্যাংকটি। গত অর্থবছরেও (২০১৯-২০) ব্যাংকটির মোট পরিচালন লোকসানের পরিমাণ ছিল ৬০২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। তারপরও প্রতি বছর ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে সরকার। বিশেষজ্ঞ বলছেন, রাকাবকে অন্য কোনো ভালো ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত বা মার্জ করা এখন সময়ের দাবি।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে দীর্ঘ ছয় বছর পর জ্যেষ্ঠতা তালিকা বা সিনিয়রিটি লিস্ট প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এই জ্যেষ্ঠতা প্রত্যাখ্যান করে অভিযোগ করেছেন বিভিন্ন পর্যায়ের ২৪৯ জন কর্মকর্তা। ঘুষ বাণিজ্য এবং স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ আছে।

এ বিষয়ে রাকাবের কর্মী ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান রঞ্জিত কুমার শেন বলেন, সম্প্রতি আমরা একটি খসড়া জ্যেষ্ঠতা তালিকা প্রকাশ করেছি। তবে এখনও চূড়ান্ত হয়নি। প্রায় ২৫০ জন কর্মকর্তা এ তালিকা পরিবর্তনের আবেদন জানিয়েছেন। সব মিলে ১৫ থেকে ১৬ ধরনের অভিযোগ এসেছে। অভিযোগ বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে ম্যানেজমেন্ট।

ছয় বছর সিনিয়রিটি লিস্ট প্রকাশ না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, কর্মীদের পদোন্নতির বিরুদ্ধে একটি মামলা চলতে থাকায় দীর্ঘদিন থেকে এই তালিকা প্রকাশ হয়নি। তবে এখন থেকে নিয়ম মেনেই সিনিয়রিটি লিস্ট প্রকাশ করা হবে বলে আশা ব্যক্ত করেছেন ব্যাংকটির কর্মী ব্যবস্থাপনা প্রধান।

সিনিয়রিটি লিস্ট সম্পর্কে জানতে চাইলে ডেপুটি গভর্নর জানান, ‘আমি থাকা অবস্থাতেই একটা খসড়া সিনিয়রিটি লিস্ট তৈরি করা হয়েছিল। সেটা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। কর্মকর্তাদের অভিযোগ বিবেচনা করে এই তালিকা চূড়ান্ত করা হবে। আমি আশা করি, যোগ্য ব্যক্তিদের অবমূল্যায়ন করা হবে না।’ শেয়ার বিজ নিউজ, ডিসেম্বর ৬, ২০২০।

Leave a Reply