১২ ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ৯৪৬৯ কোটি টাকা

0

খেলাপিসহ ঋণমানের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারেনি ১২ ব্যাংক। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি ও বেসরকারি ব্যাংক রয়েছে আটটি।

এসব ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ ৯ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকা। তবে এ সময়ে অন্য কয়েকটি ব্যাংকের প্রভিশন উদ্বৃত্ত থাকায় সার্বিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৬৪৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিক) হালনাগাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনায় উঠে এসেছে এসব তথ্য।

জানা গেছে, মূলত যে ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেশি সে ব্যাংকে প্রভিশন ঘাটতিও বেশি। যদিও নানা উপায়ে প্রভিশন ঘাটতি থেকেও অনেক ব্যাংক বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। সেপ্টেম্বর শেষে ১০ শতাংশ বা তার চেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে ১৫ ব্যাংকের।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, প্রকৃত প্রভিশন ঘাটতি আরও অনেক বেশি। যেহেতু করোনার কারণে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কাউকে খেলাপি করা হচ্ছে না। তাই এ সময়ের খেলাপির জন্য প্রভিশনও রাখতে হচ্ছে না। এছাড়া বিশেষ বিবেচনায় বহু সুবিধা নিয়েছে ঋণখেলাপিরা। এসব কারণেও প্রকৃত প্রভিশন হিসেবে আসছে না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রভিশন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবার ওপরে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক। সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি তিন হাজার ২৩৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা।

এই সময় পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ৭ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা। যা বিতরণ করা ঋণের ৫১ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এছাড়া প্রভিশন ঘাটতির তালিকায় রয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক, সোনালী, অগ্রণী, রূপালী, এবি, ব্যাংক এশিয়া, ঢাকা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, সোশ্যাল ইসলামী, ট্রাস্ট এবং বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক।

এ প্রসঙ্গে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুল হালিম চৌধুরী বলেন, যেসব ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি আছে, সেসব ব্যাংক চলতি বছরের ডিসেম্বর প্রান্তিকে ঘাটতি পূরণ করতে পারবে। যেহেতু এবার কাউকে খেলাপি করা হচ্ছে না। তাই ভয়ের কোনো কারণ নেই।

ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিং নিয়ে তিন মাস পরপর প্রতিবেদন তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিবেদনটি সোমবার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় গভর্নর। এতে দেখা যায়, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ৫৯টি ব্যাংক ১০ লাখ ৬৩ হাজার ৬২৬ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৪ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৮.৮৮ শতাংশ। তিন মাস আগে জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৬ হাজার ১১৬ কোটি টাকা, যা ওই সময় পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণের ৯.১৬ শতাংশ ছিল। ফলে গত তিন মাসে খেলাপি ঋণ কমেছে প্রায় এক হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা। তার আগের প্রান্তিক গত মার্চ মাস শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৯২ হাজার ৫১০ কোটি টাকা বা ৯.০৩ শতাংশ।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা এক লাখ ৯০ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকার মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা বা ২০.৮১ শতাংশ।

জুন শেষে যা ছিল ৪২ হাজার ৯৩৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকা বা ২২.৭৩ শতাংশ। এ সময়ে বেসরকারি ৪১টি ব্যাংকের মোট বিতরণ করা আট লাখ ৯ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকার মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৪৫ হাজার ৩৬ কোটি টাকা বা ৫.৩৬ শতাংশ। আগের প্রান্তিক জুন শেষে এই ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৬ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা বা ৫.৮৬ শতাংশ।

গত সেপ্টেম্বর শেষে বিদেশি ৯ ব্যাংকের ৩৪ হাজার ৯৩১ কোটি টাকার বিতরণ করা ঋণের মধ্যে খেলাপির পরিমাণ দুই হাজার ৪৮ কোটি টাকা বা ৫.৮৬ শতাংশ। গত জুন শেষে এই ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৬৩ কোটি টাকা বা ৫.৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ বিদেশি ব্যাংকগুলোর পরিমাণের দিক থেকে খেলাপি ঋণ কমলেও শতকরা হিসাবে বেড়েছে।

এছাড়া গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিশেষায়িত খাতের তিন ব্যাংকের বিতরণ করা ২৮ হাজার ৩৯১ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে খেলাপি হয়েছে চার হাজার ৫২০ কোটি টাকা বা ১৫.৯২ শতাংশ। তিন মাস আগে জুন পর্যন্ত এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল চার হাজার ৫২১ কোটি টাকা বা ১৫.৯২ শতাংশ।

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের লাগাম টানতে ২০১৯ সালের ১৬ মে ঋণ পুনঃতফসিল ও এককালীন এক্সিট সংক্রান্ত বিশেষ নীতিমালা জারি করা হয়। এর আওতায় যেসব ঋণ ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মন্দমানে খেলাপি ছিল সেসব খেলাপির অনুকূলে মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট আদায় সাপেক্ষে এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১০ বছর মেয়াদে পুনঃতফসিল এবং ৩৬০ দিন মেয়াদে এককালীন এক্সিট সুবিধা দেয়া হয়। চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই সুবিধা বহাল ছিল।

এর আওতায় গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাড়ে ১৯ হাজার কোটি টাকার মতো পুনঃতফসিল হয়েছে। ১৩ হাজার ৩০৭ জন ঋণখেলাপি এই সুবিধা নিয়েছেন। এছাড়া বিদ্যমান নীতিমালার আওতায় বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণও পুনঃতফসিল।

Leave a Reply