সঞ্চয়ে মানুষের হাত, টান পড়ছে ব্যাংক আমানতে

মেয়ের বিয়ের জন্য ব্যাংকে টাকা জমাচ্ছিলেন বেসরকারি চাকুরে সাকির হোসেন সরকার; সঙ্কটের বাজারে সংসার খরচ সামলাতে গিয়ে সেখান থেকে গত কয়েক মাসে ৪০ হাজার টাকা ভাঙতে হয়েছে তাকে।

টেকনো ইনফো বিডি‘র প্রিয় পাঠক: প্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও চাকরির গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ টেকনো ইনফো বিডি তে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন।

পঞ্চাশোর্ধ্ব এই চাকরিজীবী জানালেন, বাড়তি খরচের চাপ সামলাতে বিকালে অফিস শেষে ফেরার পথে তিনি এখন মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন করেন।

সাকির বলেন, “টাকা যা জমাইছিলাম, গত কয় মাসে ভাঙছি; আয় তো বাড়ে নাই। এহন মোটরসাইকেলে যাত্রী নিই, খরচ শেষে কোনোদিন ২০০, কোনোদিন ৩০০ টাকা থাকে।”

সঙ্কটের শুরু হয়েছিল মহামারীর মধ্যে, অনেকের আয় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, সবচেয়ে বেশি বিপদ হয়েছিল মধ্যবিত্তের। সেই ধাক্কা সামলে না উঠতেই ইউক্রেইন যুদ্ধের জেরে চড়ে থাকা বাজার গত কয়েক মাস ধরেই ভোগাচ্ছে মানুষকে।

সাকিরের মত অনেকেই যে সঞ্চয় ভেঙে জীবন চালাতে বাধ্য হচ্ছেন, কিংবা আগের মত আর টাকা জমাতে পারছেন না, সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবাহ কমে যাওয়ার চিত্র তারই প্রমাণ দিচ্ছে।

>> কে কীভাবে আয়কর রিটার্ন জমা দেবেন
>> লাগামহীন খেলাপি, কচ্ছপ গতিতে আদায়
>> বাজারে আসছে নতুন ১০ ও ২০ টাকার নোট

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে ব্যাংক খাতে যোগ হওয়া নিট আমানতের পরিমাণ (নতুন জমা আমানত আর তুলে নেওয়া আমানতের হিসাব সমন্বয়ের পর এক বছরে পাওয়া আমানতের পরিমাণ) আগের অর্থবছরের তুলনায় ২৯ শতাংশ কমে গেছে।

  • ২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যাংকিং খাতে ১ লাখ ২০ হাজার ২৯৫ কোটি টাকার নিট আমানত যোগ হয়েছে।
  • ২০২০-২১ অর্থবছরে যোগ হয়েছিল ১ লাখ ৬৯ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকার আমানত।
  • এই হিসাবে গত অর্থবছর ব্যাংক খাতে যোগ হওয়া আমানত ২৯ দশমিক ১৪ শতাংশ কমেছে। অথচ আগের অর্থবছরে মহামারীর মধ্যেই নতুন আমানতে ৪৫ দশমিক ৯৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল।
  • গত বছরের জুন শেষে দেশে ব্যাংক খাতে মোট সঞ্চিত আমানত ছিল ১৩ লাখ ৫১ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা। এক বছরের মাথায় এ বছরের জুন শেষে তা বেড়ে ১৪ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা হয়। কিন্তু জুলাই মাসে তা কমে ১৪ লাখ ৬৫ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা হয়েছে।

অর্থাৎ, এক মাসে ব্যাংকে আমানত হিসাবে জমা টাকার পরিমাণ কমেছে ৫ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা। বিষয়টি অর্থনীতির জন্য ‘ভালো লক্ষণ’ নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর।

জনাব মনসুর বলেন, “ব্যাংকে টাকা সঞ্চয় করেন মধ্যব্তি ও নিম্ন আয়ের মানুষ। মূল্যস্ফীতির গড় হিসাব সরকারিভাবে যা প্রকাশ করা হচ্ছে, তার চেয়ে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়ের খরচ বাস্তবে অনেক বেশি। জীবন চালাতে সঞ্চয়ে হাত দিচ্ছে তারা।’’

ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহসান মনসুর বলেন, ব্যাংকে আমানতের সুদের হার এখনো মূল্যস্ফীতির নিচে। ফলে মানুষ দু’পয়সা লাভের আশায় অন্য কোথাও সঞ্চয় সরিয়ে ফেলতে পারে।

“শোনা গেছে অনেকে ডলারেও বিনিয়োগ করেছেন। এটি খুঁজে দেখা প্রয়োজন আসলে টাকা গেছে কোথায়।”

আমানত এভাবে কমতে থাকলে ব্যাংক খাতের তারল্যে চাপে পড়বে বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা। সেরকম হলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিতে পারে। সুদহার নিয়ন্ত্রণ করা ব্যাংকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে তখন।

ব্যাংকগুলোতে আমানত উত্তোলন ও জমা দেওয়ার পর যা স্থিতি থাকে, তার হিসাব প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত চার অর্থবছরে ব্যাংকে আমানতের বাড়া-কমার একটি চিত্র সেখানে পাওয়া যায়।

  • ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ব্যাংক খাতে নিট ৯৬ হাজার ২৩১ কোটি টাকার আমানত যোগ হয়েছিল। এরপর ২০১৯-২০ অর্থবছরে যোগ হয় ১ লাখ ১৬ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা। ওই অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকের শেষে দেশে কোভিড মহামারীর ধাক্কা লাগে।
  • প্রাথমিক ধাক্কা সামলে ২০২০-২১ অর্থবছরে যোগ হয়েছিল ১ লাখ ৬৯ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকার আমানত।কিন্তু পরের অর্থবছরে তা কমে মহামরীর প্রথম বছরের পর্যায়ে চলে গেছে।

ব্যাংকগুলো বিভিন্ন নাম ও মেয়াদে আমানত সংগ্রহ করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, গত অর্থবছরে মেয়াদী, অর্থাৎ সঞ্চয়ী আমানতের পরিমাণ কমেছে সবচেয়ে বেশি।

২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যাংক খাতে ৯৭ হাজার ১৫০ কোটি টাকার মেয়াদী আমানত যোগ হয়েছে, যা আগের অর্থ বছরের চেয়ে ৩০ দশমিক ৪১ শতাংশ কম।

২০২০-২১ অর্থবছরে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকার মেয়াদী আমানত যোগ হয়েছিল, তাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৪০ দশমিক ৭৯ শতাংশ।

অন্যদিকে ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকার সাধারণ আমানত যোগ হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ২৩ দশমিক ২৬ শতাংশ কম।

মানুষের সঞ্চয়ে টান পড়ছে মূলত মূল্যস্ফীতির চাপে। জীবন যাপনের খরচ বেড়ে যাওয়ার নির্দিষ্ট আয়ের মানুষকে সংসারের হিসাব কীভাবে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সে কথা বললেন বেসরকারি একটি কোম্পানির মার্কেটিং বিভাগের তরুণ কর্মী জোবায়ের রহমান।

তিনি জানালেন, তাদের বাবা সরকারি চাকরি থেকে অবসরে গেছেন। যৌথ পরিবারে তারা তিন ভাই চাকরি করেন। পরিবারে স্কুল পড়ুয়া সন্তান রয়েছে চারজন। সব মিলিয়ে ১২ জনের সংসার। গত ডিসেম্বর মাসেও তাদের আয় আর বাবার পেনশনের টাকা দিয়ে টেনেটুনে সংসার চলে যেত, কিন্তু এখন আর চলছে না।

“বাধ্য হয়ে বাবার ব্যাংকে জমা টাকা থেকে প্রতি মাসে খরচ করতে হচ্ছে। এভাবে চললে বাবার টাকাও তো এক সময়ে শেষ হয়ে যাবে। তখন হঠাৎ চিকিৎসার প্রয়োজন হলে টাকা কই পাব? এখন সন্ধ্যার পর ২-৩ ঘণ্টা কোনো কাজ খুঁজছি।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম অবশ্য অতটা দুশ্চিন্তার কারণ দেখছেন না।

জনাব ইসলাম বলেন, “আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে গেলেও প্রণোদনা প্যাকেজের তৃতীয় ধাপের বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সচল হতে পারবেন। আশা করা যাচ্ছে সামনের দিনগুলোতে আমানত প্রবৃদ্ধি ফের আগের জায়গায় ফিরে যাবে।”

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button