ব্যাংকার: বেতন-ভাতা নয়, ব্যাংকের ‘অপ্রয়োজনীয়’ খরচ কমানোর তাগিদ

0

করোনাকালে ব্যাংককর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। এই অবস্থায় তাদের বিদ্যামান সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রেখে বরং প্রণোদনা দেওয়া উচিত বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা।

তারা বলছেন, এতে ব্যাংক কর্মীরা উজ্জীবিত হবেন। পাশাপাশি ব্যাংককে সারভাইভ করার জন্য খরচ কমাতে হলে ব্যাংক কর্মীদের ছাঁটাই, বেতন কমানো বা ইনক্রিমেন্ট বন্ধের পরিবর্তে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন ব্যাংকাররা।

তাদের মতে, করোনা সংকটকালে ব্যাংকের খরচ কমানোর নামে বেশ কয়েকটি ব্যাংক তাদের কর্মীদের বেতন-ভাতা কমিয়েছে। কোনো কোনো ব্যাংক কর্মী ছাঁটাই শুরু করেছে। ব্যাংকারদের মতে, ব্যাংককে সারভাইভ করার জন্য কর্মী ছাঁটাই, বেতন কমানো সমাধান নয়। বরং সব ধরনের অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে আনতে হবে। বিশেষ করে পরিচালনা পর্ষদের অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর পাশাপাশি নতুন নিয়োগ, সকল প্রকার Fixed Asset কেনা, স্থানীয় ও বিদেশি প্রশিক্ষণ ও বিদেশ ট্যুর বন্ধ রাখা উচিত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘করোনাকালে ব্যাংক কর্মীদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে কোনো ব্যাংক কর্মীর বেতন কমানো, ইনক্রিমেন্ট বন্ধ রাখা কিংবা ছাঁটাই করা বাংলাদেশ ব্যাংক সমর্থন করে না। এটা নীতিগতভাবেও ঠিক না, অমানবিক কাজ।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘করোনার সময়ে ব্যাংক কর্মীদের ছাঁটাই, বেতন কমানো কিংবা ইনক্রিমেন্ট বন্ধ রাখা মোটেও ঠিক হচ্ছে না। কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা না কমিয়ে বরং ব্যাংকের পরিচালকদের সুবিধা এবং তাদের দৌরাত্ম বন্ধ করতে হবে। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহীরাই চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাদের উচিত স্বাধীনভাবে প্রফেশনারলি ম্যানেজমেন্ট পরিচালনা করা।’

তিনি আরও বলেন, ‘করোনার সময়ে ব্যাংক কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করায় তাদের প্রণোদনা দেওয়া উচিত। কিন্তু তা না করে বেতন কমানো কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এর নেতিবাচক প্রভাব অন্যসব সেক্টরেও পড়বে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত এগুলোর বিষয়ে নজর দেওয়া।’

‘খরচ কমানোর জন্য ব্যাংকের সাজসজ্জা কমিয়ে আনা, বছরে ৮/১০ কোটি টাকা দিয়ে বিল্ডিং ভাড়া নেওয়া বন্ধ করা। ব্যাংকের হেড কোয়াটারের সাজসজ্জার নামে অর্থ অপচয় রোধ করতে হবে। কারণ ব্যাংকের কাজ হয় শাখা অফিসগুলোতে’, বলেন সাবেক এই গর্ভনর।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত ব্যাংক থেকে পরিচালকরা কি কি সুবিধা পেতে পারেন, আর কি পারেন না তা নির্ধারণ করে দেওয়া উল্লেখ করে ড. সালেহ উদ্দিন বলেন, ‘দেখা যাচ্ছে পরিচালকরা ব্যাংকের গাড়ি ব্যবহার করছেন, মিটিং অ্যালাউন্স নিচ্ছেন। কোনো কোনো ব্যাংকে প্রতি সপ্তাহে বোর্ড মিটিং হয়। প্রতিটি বোর্ড মিটিংয়ের জন্য পরিচালকরা ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা সম্মানি নিচ্ছেন। এতে প্রতি মাসে ৫০ থেকে ৬০ টাকা চলে যাচ্ছে। এগুলো কমাতে হবে। যে ব্যাংক কর্মীদের চালাতে পারবে না, তাদের অন্য ব্যাংকের সাথে একীভূত করে দেওয়া যেতে পারে। কারণ দেশে এতো ব্যাংকের দরকার নেই।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গর্ভনর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘বেশির ভাগ ব্যাংকই বেতন কমানো, ইনক্রিমেন্ট বন্ধ রাখা কিংবা কর্মী ছাঁটাই করার মতো অনৈতিক কাজগুলো করছে না। ৬০টি ব্যাংকের মধ্যে ৫/৭টি দুর্বল ব্যাংক এই ধরনের কাজ করছে। এটা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যাংকের বিজ্ঞাপন কমিয়ে এনে বিভিন্ন ভাতা বন্ধ করার পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদের বিভিন্ন খরচ কমিয়ে আনা গেলে কর্মী ছাঁটাই কিংবা বেতন কমানোর প্রয়োজন হবে না।’

ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মানসুর সারাবাংলাকে বলেন, ‘ব্যাংকে সব সময় কম বেশি নতুন লোক নিয়োগ করতে হয়। আবার যাদের পারফর্মেন্স ভালো না এমন কিছু লোককে ছাঁটাইও করতে হয়। এটা সব সময় হয়, তবে দেখতে হবে ঢালাওভাবে করছে কিনা। তবে এরকম করা হচ্ছে বলে আমার জানা নেই।’

ব্যাংকার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (বিডব্লিউএবি) প্রেসিডেন্ট ও মিউচুয়্যাল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মো. শফিকুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘ব্যাংক কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা কমানো সংকট মোকাবিলায় সমাধান হতে পারে না। ব্যাংকার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন মনে করে সব বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক তাদের কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা কমানোর চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসবে এবং ব্যয় কমানো ও আয় বাড়ানোর অন্য বাস্তবভিত্তিক পন্থা অবলম্বন করবে।’

তিনি বলেন, ‘আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, দি সিটি ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি তাদের ব্যাংক কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা কমানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। কিন্তু এটি সমাধান হতে পারে না।’

ব্যাংকিং সেক্টরে কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা কমানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে তা অন্যান্য সেক্টরকেও প্রভাবিত করার আশঙ্কা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ফলে দেশের অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব প্রতিফলিত হবে। ব্যাংকের আয় বাড়ানোর জন্য, সরকার কর্তৃক বাণিজ্যিক ব্যাংকের করপোরেট ট্যাক্স কমানোর ব্যাপারে ব্যাংকগুলো আবেদন করতে পারে।’

উল্লেখ্য, করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিক সংকট দেখিয়ে ব্যাংক কর্মীদের বেতন-ভাতা ও ইনক্রিমেন্ট কমানোর পরামর্শ দিয়েছে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। গত ১৪ জুন বিএবি’র পক্ষ থেকে সংগঠনের বিভিন্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এই পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে ৪০ হাজার টাকার বেশি বেতনধারী সব গ্রেডের কর্মকর্তা ও নির্বাহীদের বেতন ১৫ শতাংশ কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও চিঠিতে ব্যাংকে সব ধরনের প্রমোশন, ইনক্রিমেন্ট ও ইনসেনটিভ বোনাস বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি সব ধরনের স্থানীয় ও বিদেশি প্রশিক্ষণ ও বিদেশ ট্যুর এবং সিএসআর, অনুদান ও চ্যারিটি বন্ধ রাখা।

Leave a Reply