নয়-ছয় সুদহার উঠে যাচ্ছে কি?

ব্যবসায়ীদের দাবি, ব্যাংক চেয়ারম্যানদের উদ্যোগ ও সরকারি সিদ্ধান্তে ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ব্যাংকঋণের সুদ সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ নির্দিষ্ট করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

টেকনো ইনফো বিডি‘র প্রিয় পাঠক: প্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও চাকরির গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ টেকনো ইনফো বিডি তে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন।

এরপর মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় রেখে মেয়াদি আমানতের সুদহার বেঁধে দেওয়া হয়, যা এখন ৬ শতাংশের বেশি। তবে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় অর্থনীতিতে এখন যে চাপ তৈরি হয়েছে, তাতে নির্দিষ্ট সুদহারে আমানত সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণ ব্যাংকগুলোর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আমানত ও ঋণের সুদহারের সীমা তুলে দেওয়া নিয়ে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এখন অর্থনীতির ওপর যেভাবে চাপ তৈরি হয়েছে, তাতে সুদহার বেঁধে রাখার আর সুযোগ নেই। ব্যাংকে আগের মতো উদ্বৃত্ত অর্থ নেই। কারণ, মানুষ সঞ্চয় কমাচ্ছে। আবার ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত ডলারও কিনতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোকে সুদহার বাড়িয়ে আমানত সংগ্রহ করতে হবে। এ জন্য ঋণের সুদহারও বাড়বে। তাই ৬-৯ সুদহার তুলে দিয়ে তা বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়াটা শ্রেয় হবে। না হলে অর্থনীতিতে অস্থিরতা আরও বাড়বে।’

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি, ভোগ্যপণ্য ও কাঁচামালের দাম বেড়ে গেছে। পাশাপাশি বেড়েছে জাহাজভাড়াও। এতে জুলাই-এপ্রিলে আমদানি খরচ আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে বেড়ে গেছে ৪৪ শতাংশ। তবে সে তুলনায় রপ্তানি বাড়েনি, কমেছে প্রবাসী আয়। এতে বেড়ে গেছে ডলারের দাম। ৯৫ টাকা ডলার কিনে আমদানি দায় মেটাতে হচ্ছে আমদানিকারকদের।

ডলারের সংকট কাটাতে ব্যাংকগুলোর কাছে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৮০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর ফলে ব্যাংকগুলো থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চলে গেছে। এতে ব্যাংকগুলোয় তারল্যসংকট তৈরি হয়েছে। গত এপ্রিল শেষে ব্যাংকগুলোয় অতিরিক্ত তারল্য ছিল ১২ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা। তবে প্রকৃতপক্ষে ব্যাংকগুলোর হাতে ছিল ১৫-১৬ হাজার কোটি টাকা। এখন তা আরও কমে এসেছে।

ব্যাংকাররা বলছেন, ডলারের দাম ৮৭ থেকে ৯৭–এর মধ্যে ওঠানামা করছে। এ অবস্থায় সুদহার বেঁধে রেখে আমানত সংগ্রহ করা কঠিন। আমানত বাড়াতে হলে বাড়তি সুদ দিতে হবে। এতে ঋণের সুদও বাড়বে।

জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় এমনিতেই আমানতের সুদও বাড়াতে হয়েছে। এ কারণে প্রায় সব দেশে ঋণের সুদহারও বাড়ছে। কিন্তু আমাদের এখানে সুদহার ধরে রাখলে ব্যাংকগুলোর টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। তবে সুদহার নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পর্যাপ্ত পর্যালোচনা করতে হবে।

জানা গেছে, গত এপ্রিলে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর আমানতের গড় সুদহার ছিল ৪ দশমিক ২৩ শতাংশ ও ঋণের গড় সুদ ছিল ৭ দশমিক ২৬ শতাংশ। তবে কমিউনিটি ব্যাংকের ঋণের গড় সুদহার ছিল ৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৮ দশমিক ৮০ শতাংশ, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

ব্যাংকাররা বলছেন, আমানতে টান পড়ায় ঋণের সুদহার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে ব্যাংকগুলোয়। ঋণের সুদ বাড়াতে না পারলে খরচ কমাতে হবে। এখন বেতন কমানো ও জনবলে খরচ কমানোর সুযোগ নেই। তাই নতুন শাখা বাড়ানো, সাজসজ্জা ও আইটি অবকাঠামো উন্নয়নের গতি কমিয়ে দেওয়ার বিকল্প নেই।

তবে প্রাইম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান ও. রশীদ এখনই সুদহারের সীমা প্রত্যাহারের বিপক্ষে। তিনি বলেন, ‘এই সময়ে ডলারের দাম স্থির না। আবার কাঁচামাল ও জাহাজভাড়া বেড়ে গেছে। এর মধ্যে ঋণের সুদহার বেড়ে গেলে এই চাপ অনেক ব্যবসায়ী নিতে পারবে না। এ জন্য ডলারের বাজার স্থির না হওয়া পর্যন্ত এদিকে হাত দেওয়া ঠিক হবে না। ব্যাংকগুলোকে টিকে থাকতে খরচ কমিয়ে কর্মদক্ষতা বাড়াতে হবে। এর বিকল্প নেই।’

আরও দেখুন:
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মানছে না আল আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক
স্বল্প সুদে এসএমই ঋণ দিবে মার্কেন্টাইল ব্যাংক
বিশ্বের সেরা ১০০ ব্যাংকের তালিকায় ঢুকবে ইসলামী ব্যাংক: মুনিরুল মওলা

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button