টিআইএনধারীদের মধ্যে যারা রিটার্ন জমা দিচ্ছে না, তাদের খুঁজে বের করবে এনবিআর

0

টিআইএনধারীর সংখ্যা হু-হু করে বাড়লেও সে অনুপাতে রিটার্ন জমার সংখ্যা বাড়ছে না। মূলত আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকায় টিআইএনধারীর সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। যেমন জমি-ফ্ল্যাট বেচাকেনা, ট্রেড লাইসেন্স, আমদানি-রফতানি বাণিজ্য, কোম্পানি গঠন, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী, গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগ, মোবাইল রিচার্জ ব্যবসা, সঞ্চয়পত্র কেনাসহ মোট ৩৩ ধরনের কাজে টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ধরনের কাজে টিআইএন নেয়া ব্যক্তিরা পরবর্তীতে আর রিটার্ন জমা দিচ্ছেন না। এক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নজরদারি দুর্বল থাকায় টিআইএনধারীর সংখ্যার সঙ্গে রিটার্ন জমাদানকারীর পার্থক্য বাড়ছেই।

এনবিআরের তথ্য মতে, গত মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশে টিআইএনধারী সংখ্যা ৪৫ লাখের বেশি ছিল। গত বছর একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৩৭ লাখ। এর মধ্য থেকে রিটার্ন জমা দিয়েছেন ২১ লাখ। অবশ্য সময়মতো (২ ডিসেম্বর পর্যন্ত) রিটার্ন জমা দিয়েছেন ১৬ লাখ ৯১ হাজার ৬১০ জন টিআইএনধারী। আর ৩ লাখ ১৫ হাজার ১০৫ জন টিআইএনধারী রিটার্ন জমার জন্য দুই মাস চেয়ে আবেদন দিয়েছিলেন। এ সময় বৃদ্ধির আবেদনকেও এনবিআর রিটার্ন হিসেবে গণ্য করে। অর্থাৎ টিআইএনধারীদের মধ্যে ১৬ লাখ রিটার্ন জমা দেয়নি। এ অবস্থায় নতুন টিআইএনধারী খুঁজে বের করতে এনবিআর মাঠ পর্যায়ে জরিপ শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে ৭ লাখ নতুন টিআইএনধারী খুঁজে বের করার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে।

অবশ্য এনবিআর থেকে রিটার্ন জমার সংখ্যা বাড়াতে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। এ বিষয়ে এনবিআরের কর প্রশাসন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের সদস্য কালিপদ হালদার বলেন, টিআইএনধারীর সঙ্গে রিটার্ন জমাদানকারীর সংখ্যা বাড়ছে। গত বছর ২১ লাখের বেশি রিটার্ন জমা পড়েছে। টিআইএনধারীদের মধ্যে যারা রিটার্ন জমা দিচ্ছে না, তাদের খুঁজে বের করতে কর অঞ্চলগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

গত বছর বাংলাদেশের কর ব্যবস্থার ওপর জরিপ চালায় বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। ওই জরিপের তথ্য মতে, করযোগ্য হওয়ার পরও ৬৮ শতাংশ মানুষ কর দেন না। কর দেন মাত্র ৩২ শতাংশ সামর্থ্যবান ব্যক্তি। এমনকি সবচেয়ে বেশি আয়ের ২৫ শতাংশ ব্যক্তির মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই আগের বছর আয়কর দেননি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, করদাতা চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে এনবিআরের দুর্বলতা রয়েছে। তা না হলে বতর্মানে দেশে যে সংখ্যক মানুষ কর দিচ্ছে, বাস্তবে তা আরও বেশি হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, যারা কর দেয়, তাদের ওপর করের হার বাড়ছে। কিন্তু করের আওতা বাড়ছে না। এ কারণে নতুন করদাতা বাড়ানো দরকার। এতে একদিকে আয় বাড়বে, অন্যদিকে নিয়মিত করদাতাদের ওপর করের হারও কমানো যাবে।

সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, কর বাড়ানোর জন্য সুশাসন দরকার। তবে সামগ্রিকভাবে দেশে সুশাসন না থাকলে করখাতে সুশাসন আসবে না। সামগ্রিকভাবে দেশে সুশাসন নেই, বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলছে। অপরাধীদের দায়মুক্তি দেয়া হচ্ছে, সেখানে এনবিআর চেয়ারম্যান রাজস্বখাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না। তিনি আরও বলেন, বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিকে কর ছাড় দেয়া হয়। এছাড়াও কেউ অপরাধ করেও শাস্তি পায় না। এ অবস্থায় সামগ্রিকভাবে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা না করে কর আদায়ে ন্যায়বিচারের কথা বলে কোনো লাভ নেই। অন্যদিকে যারা নিয়মিত কর দিচ্ছে, তাদের ওপর করের বোঝা চাপাচ্ছে এনবিআর। দুর্নীতি দমন কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোও তাদের হয়রানি করছে। কিন্তু নতুন করদাতা বাড়ানোর তেমন কোনো তৎপরতা নেই।

অন্যদিকে এনবিআর চেয়ারম্যান সাম্প্রতিক বিভিন্ন সভা-সেমিনারে বলেছেন, দেশে আরও কমপক্ষে ৪ কোটি করযোগ্য মানুষ রয়েছেন। কিন্তু কর দিচ্ছেন ২১ লাখের বেশি। অর্থাৎ কর দেয়ার যোগ্য ৩ কোটি ৭৯ লাখের বেশি কর দিচ্ছেন না। এদের মধ্যে থেকে আগামী ৩ বছরে ১ কোটি মানুষকে করের আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে এনবিআর। নতুন করদাতা শনাক্ত করতে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে আয়কর অফিস স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আয়কর মেলার পরিধি বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া বেসরকারিভাবে রাজস্ব সহযোগী নিয়োগ দেয়া হবে। তারা জরিপ করে নতুন কর দেয়ার মতো যোগ্য লোক খুঁজে বের করবে।

Leave a Reply