রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ডিজিটাল হুন্ডি বন্ধ করা জরুরি

লেখকঃ ড. মো. শফিকুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।

অবৈধভাবে আন্তঃসীমান্ত অর্থ স্থানান্তরের বহু পুরোনো ব্যবস্থা ‘হুন্ডি’ ব্যবস্থা। জনগণকে বৈধ চ্যানেল ব্যবহার করতে উৎসাহিত করার সব সরকারি প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে ডিজিটাল হুন্ডি সিস্টেম। এটি শুধু বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের বৈধভাবে অর্জিত রেমিট্যান্স প্রবাহের ক্ষেত্রেই সত্য নয়; বরং যখন লোকজন বিদেশে লাখ লাখ টাকা নগদ পাঠাতে চায়, তখনো হুন্ডি ব্যবহার করা হয়।

টেকনো ইনফো বিডি‘র প্রিয় পাঠক: প্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও চাকরির গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ টেকনো ইনফো বিডি তে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন।

প্রতি বছর বাংলাদেশে বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স ব্যাংকিং মাধ্যমে স্থানান্তরিত হলেও হুন্ডির মাধ্যমে তার চেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ পাঠানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর কারণে দেশ থেকে অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের রিপোর্টে বলা হয়েছে, অধিক সংখ্যক মানুষ অবৈধ লেনদেন ব্যবস্থা হুন্ডি বেছে নেওয়ায় ২০২১ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বর রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গিয়েছিল।

২০২১ সালে সরকার ব্যাংকের মতো বৈধ মাধ্যমে আসা রেমিট্যান্সের ওপর দুই শতাংশ প্রণোদনা ঘোষণা করা সত্ত্বেও এটি ঘটছে। হুন্ডিসংক্রান্ত ভয়াবহ তথ্য তুলে ধরেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স প্রবাহ বছরে ১৯.৭৪ শতাংশ কমে ১.৭২ বিলিয়ন ডলার হয়েছে।

২০২১ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর মাসে প্রবাসীরা দেশে ৫.৪০ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯.৪৪ শতাংশ কম। মজার বিষয় হলো, লকডাউনের কারণে অনানুষ্ঠানিক খাতসহ সব ক্ষেত্রে রেমিট্যান্স প্রবাহ মহামারি চলাকালীন গত দুই বছরে ঊর্ধ্বমুখীপ্রবণতা ছিল। উল্লেখ্য, প্রবাসীরা পারিবারিক সংকট বিবেচনা করে মহামারি চলাকালীন তাদের আত্মীয়দের কাছে আরও বেশি অর্থ পাঠিয়েছিলেন। অবশ্য ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাও একটি কারণ, যা আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের বর্ধিত ব্যবহারে অবদান রেখেছিল।

রেমিট্যান্স প্রবাহ হ্রাসের কারণ অনুসন্ধান করার সময় বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়েছেন, মহামারি চলাকালীন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অভিবাসী স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে এসেছেন। কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে বিদেশে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন প্রবাসীদের একটি বড় অংশ। কিছু গবেষক মনে করেন, এ কারণে প্রবাহ কম ছিল। এটি অনেকটা যৌক্তিক ছিল; কিন্তু এখন রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে কেন-এটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করেন, মোবাইল ব্যাংকিংও হুন্ডিকে সমাজে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করছে। এ জন্য রেমিট্যান্স প্রবাহ কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবৃতিতে দেখা যায়, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ১,৩২০.০২ মিলিয়ন ইউএস ডলার, রাষ্ট্রপরিচালিত ব্যাংক ৩৬১.৪৩ মিলিয়ন, বিদেশি ব্যাংক ৭.৬০ মিলিয়ন এবং বিশেষায়িত ব্যাংক ৩৭.২৪ মিলিয়ন ইউএস ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছে। বাংলাদেশ সৌদি আরব থেকে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পেয়েছে। তারপরে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।

২০২১ সালের মে মাসে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ায় অভ্যন্তরীণ রেমিট্যান্স প্রবাহ গত বছর প্রায় ৫ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে ভারত পেয়েছে ৮৩.১ বিলিয়ন, পাকিস্তান ২৬.১ বিলিয়ন এবং বাংলাদেশ ২১.১ বিলিয়ন ইউএস ডলার। আমরা ইতিহাসের আলোকে হুন্ডির গঠন দেখতে পারি। প্রারম্ভিক নথিগুলো বলে, হুন্ডি হলো অনানুষ্ঠানিক আর্থিক উপকরণের একটি রূপ, যা মুঘল অর্থনীতির অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ ও ফলস্বরূপ নগদীকরণ প্রক্রিয়ার অধীনে বিকশিত হয়েছিল।

হুন্ডি রেমিট্যান্স যন্ত্র হিসাবে ব্যবহৃত হতো (এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় তহবিল স্থানান্তর করতে); ক্রেডিট মাধ্যম হিসাবে (টাকা ধার করার জন্য) এবং বাণিজ্য লেনদেনের জন্য (বিনিময় বিল হিসাবে)। প্রযুক্তিগতভাবে একটি হুন্ডি হলো একটি নিঃশর্ত আদেশ, যা একজন ব্যক্তির দ্বারা লিখিতভাবে তৈরি করা হয়, যাতে আদেশে নামযুক্ত ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, হুন্ডি অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার একটি অংশ হওয়ায় এর কোনো আইনগত মর্যাদা নেই এবং এটি সরকারের আলোচ্য উপকরণ আইনের আওতায় পড়ে না। ব্যাংকিং ব্যবস্থার আবির্ভাবের ফলে ব্যবসায়ীরা আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের ওপর বেশি নির্ভর করে।

হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ লেনদেন অর্থ পাচারের আওতায় পড়ে এবং এটি দেশের আইন অনুসারে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। হুন্ডির মাধ্যমে স্থানান্তরিত সব অর্থ কথিতভাবে কালো টাকা। আমরা বুঝি, বেশিরভাগ আর্থিক কোম্পানির এ কার্যকলাপ শনাক্ত এবং প্রতিরোধ করার জন্য অ্যান্টি মানি লন্ডারিং নীতি রয়েছে। তাই সরকারি অ্যান্টি লন্ডারিং এজেন্সিগুলোকে হুন্ডি অপারেটরদের ট্র্যাকিং এবং তাদের বিচারের জন্য আরও সতর্ক হতে হবে। ডিজিটাল হুন্ডি ব্যবহারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে-আমদানির আন্ডার ইনভয়েসিং সমর্থন করা; দ্বিতীয় বৃহত্তম কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি ব্যক্তিরা বেতনের কিছু অংশ দ্রুত বাড়িতে পাঠানো। এ বছর ডিজিটাল হুন্ডি আবারও চাঙা হচ্ছে। এ কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না।

বস্তুত ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে অর্থ পাচারও বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। দেখা যাচ্ছে, স্থানীয় হুন্ডি ব্যবসায়ীরা তাদের বিদেশি এজেন্টদের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারে সহায়তা করছেন। মূলত করোনার পর সবকিছু খুলে যাওয়ায় হুন্ডি ব্যবসায়ীরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। এ অবস্থায় বিদেশ থেকে অর্থ পাঠাতে হুন্ডি ব্যবসায়ীরা কী ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করছেন, তা খতিয়ে দেখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগ থেকে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার ওপর মতামত দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া নড়েচড়ে বসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন। অভিযান পরিচালনায় মাঠে নামানো হয়েছে প্রায় ১০টি টিম। এটি খুবই ভালো উদ্যোগ। কারণ, ডিজিটাল হুন্ডি বন্ধ করতে না পারলে দেশের অর্থনীতি সংকটে পড়বে। দুর্নীতিবাজরা অবাধে দেশের টাকা বিদেশে পাচার করে সেখানে বাড়ি-গাড়ি কিনে আরামে জীবনযাপন করবে। আর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বিপদে পড়বে। এজন্য সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে; যাতে অবৈধ ডিজিটাল হুন্ডি বন্ধ হয়।

কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে আসার পর এক ধরনের হুন্ডির ফাঁদে পড়েছে রেমিট্যান্স। এ কারণে কয়েক মাস ধরে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাচ্ছে; এমনকি প্রণোদনা বাড়ানোর পরও বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ তেমন বাড়েনি। অর্থাৎ ব্যাংকের চেয়ে খোলাবাজারের রেট বেশি হওয়া এবং তুলনামূলক খরচ কম হওয়ায় প্রবাসীদের অনেকেই হুন্ডি মাধ্যমে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত হচ্ছেন।

আরও দেখুন:
১৫ দিনে দেশে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এসেছে ১০১ কোটি ডলার
ডলার সংকট কাটাতে রেমিট্যান্স নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা

এমন প্রেক্ষাপটে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে ব্যাংকিং চ্যানেলের সঙ্গে খোলাবাজারের ডলারের দামের পার্থক্য কমিয়ে আনতে হবে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ কমিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। দেশে কারা হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তাদের খুঁজে বের করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে, যাতে অবৈধ ডিজিটাল হুন্ডি বন্ধ হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের চলমান অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্যে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ সচল রাখা জরুরি। এ প্রেক্ষিতে রেমিট্যান্স কমার পেছনে কোনো প্রতিবন্ধকতা আছে কিনা, তা অনুসন্ধান করা জরুরি। হুন্ডি ব্যবসায়ীরা কীভাবে, কোন ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করছে, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত করা দরকার।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button