হিজরি সনঃ উৎপত্তি, মাস নামকরণের কারণ এবং অর্থ

0
260

হিজরি সন মুসলিম উম্মাহর একটি গুরুত্বপূর্ণ গণনার সাল। মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সময় থেকে এ হিজরি সাল গণনার শুরু হয়। হজরত ওমর (রা.) আনুষ্ঠানিকভাবে হিজরি সনের প্রবর্তন করেন।

বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক আলবিরুনি কর্তৃক বিধৃত একটি বিবরণী থেকে জানা যায়, আবু মুসা আল আশাআরি (রা.) হজরত ওমর (রা.) এর কাছে লিখিত এক পত্রে অভিযোগ করেন, আপনি আমাদের কাছে চিঠি পাঠাচ্ছেন; কিন্তু সেগুলোতে কোনো তারিখ উল্লেখ নেই। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে হজরত ওমর (রা.) একটি সুনির্দিষ্ট সন তৈরিতে সচেষ্ট হন।

আল্লামা শিবলি (রহ.) উল্লেখ করেন, হজরত ওমর (রা.) এর শাসনামলেই ১৬ হিজরি সনে খলিফা ওমরের কাছে একটি দাফতরিক পত্রের খসড়া পেশ করা হয়। তাতে শাবান মাসের উল্লেখ ছিল। এটি কোনো সনের ইঙ্গিত বহন করছিল না। তীক্ষ্ন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হজরত ওমর ফারুক (রা.) জিজ্ঞেস করেন, পরবর্তী কোনো সময়ে তা কীভাবে বোঝা যাবে, সেটি কোন সনে তার সামনে পেশ করা হয়েছিল? কোনো সদুত্তর না পেয়ে খলিফা হজরত ওমর (রা.) সাহাবায়ে কেরাম ও অন্য শীর্ষ পর্যায়ের জ্ঞানী-গুণী মুসলমানদের নিয়ে এক আলোচনা সভার আয়োজন করেন। আলোচনাকালে অধিকাংশ ব্যক্তিই অভিমত প্রকাশ করেন, সন গণনার ক্ষেত্রে পারসিকদের পদ্ধতি গ্রহণ করাই শ্রেয়।

খোজিস্থানের বাদশাহ হরমুজান (যিনি তখন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মদিনায় বসবাস করছিলেন) প্রস্তাব রাখেন যে তার দেশে প্রচলিত ‘মাহরুজ’ প্রথাই সন গণনার ক্ষেত্রে অনুসরণ করা উচিত। কারণ, মাহরুজ পদ্ধতিতে তারিখ ও মাস সুষ্ঠুভাবে প্রতিফলিত হয়ে থাকে। কেউ কেউ মত প্রকাশ করেন, মহানবী (সা.) এর ঐতিহাসিক হিজরতের দিন থেকে ইসলামী সন গণনার শুভ সূচনা করাই শ্রেয়। কারণ ঐতিহাসিক তাৎপর্যমণ্ডিত এই মহান দিবসেই ইসলামের ইতিহাসে এক নব দিগন্ত উন্মোচিত হয়। মহান রাব্বুল আলামিনের নির্দেশে সম্পাদিত অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যমণ্ডিত হিজরতকে ইসলামী বর্ষপঞ্জির জন্য সর্বাপেক্ষা উপযোগী বিবেচনা করে হজরত আলী (রা.)-এর প্রস্তাবই সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে খলিফা হজরত ওমর ফারুক (রা.) হিজরতের বছর থেকেই ইসলামী দিনপঞ্জি গণনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় হিজরতের ১৬ বছর পর ১০ জুমাদাল উলা ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে। আলোচনা সভায় সে সময় আরবে অনুসৃত প্রথানুযায়ী পবিত্র মহররম মাস থেকে ইসলামী বর্ষ শুরু (হিজরি সনের শুরু) করার ও জিলহজ মাসকে সর্বশেষ মাস হিসেবে চিহ্নিত করার পরামর্শ দান করেন হজরত ওসমান গনি (রা.)।

আরবি ১২ মাসের নামকরণের কারণ এবং অর্থ-

(১) মহররম: এর অর্থ হারামকৃত, মর্যাদাপূর্ণ। যেহেতু এ মাসের মর্যাদার কথা বিবেচনা করে যুদ্ধবিগ্রহ হারাম বা নিষিদ্ধ মনে করা হতো, এ জন্য এ মাসকে মহররম বলা হয়। (গিয়াসুল লোগাত : ৪৫৭)

(২) সফর: সফর শব্দটি সিফর থেকে নির্গত। এর অর্থ শূন্য হওয়া, জাহেলি যুগে সফর মাসে লোকেরা যুদ্ধের জন্য বের হয়ে গেলে ঘর শূন্য হয়ে যেত, তাই সফরের মাসের নাম সফর রাখা হয়েছে।

(৩) রবিউল আউয়াল: শাব্দিক অর্থ : বসন্তের শুরু। এ মাসের নামকরণ করা হয় বসন্তকালের শুরু লগ্ন হওয়ার কারণে। (রেসালায়ে নুজুম-২২৯)

(৪) রবিউল আখের বা সানি: বসন্তকালের শেষ পর্যায়ে হওয়ায় এ মাসের নামকরণ করা হয় রবিউল আখের। (রেসালায়ে নুজুম-২২৯)

(৫) জুমাদাল উলা: আরবি শব্দ, ‘জুমূদ’ অর্থ জমে যাওয়া, স্থবির হওয়া। যখন এ মাসের নাম রাখা হয়, তখন ছিল শীতের শুরুলগ্ন। যখন ঠাণ্ডায় সব কিছু জমে যেত। পারিপার্শ্বিক অবস্থার সঙ্গে মিল রেখে এ মাসের নাম রাখা হয়েছে ‘জুমাদাল উলা’।

(৬) জুমাদাল উখরা: শীতকালের শেষ লগ্নে গিয়ে এ মাসের নামকরণ করা হয় বলে এ মাসের নাম রাখা হয়েছে ‘জুমাদাল উখরা’।

(৭) রজব: শাব্দিক অর্থ সম্মান করা। আরবরা এ মাসকে ‘শাহরুল্লাহ’ বলত এবং যথেষ্ট সম্মান করত। এ জন্য এ মাসের নাম রাখা হয়েছে ‘রজব’ বলে। (রেসালায়ে নুজুম-২৩০)

(৮) শাবান: শাব্দিক অর্থ ছড়িয়ে দেয়া, বিচ্ছিন্ন হওয়া। যেহেতু এ মাসে অসংখ্য কল্যাণ আর রহমতের বৃষ্টি বর্ষিত হয় এবং হায়াত, মওত, রিজিক এবং তাক্বদিরের নানা বিষয় ফেরেশতাদের হাতে ন্যস্ত করা হয়, এ জন্য এ মাসের নাম রাখা হয়েছে ‘শাবান’। অথবা এ কারণে এ মাসের নাম ‘শাবান’ রাখা হয়েছে, আরবরা রজব মাসে যুদ্ধ নিষিদ্ধ থাকার পর এ মাসে যুদ্ধ করতে ছড়িয়ে পড়ত।

(৯) রমজান: অর্থ জ্বালানো। যেহেতু এ মাসে বান্দার গুনাহ জ্বলেপুড়ে (মুছে) যায় অথবা গরমকালে এ মাসের নামকরণ করা হয়, এ জন্য এ মাসকে ‘রমজান’ বলা হয়। (ইবনে কাছির , খণ্ড ২, পৃ. ২৩৬)

(১০) শাওয়াল: অর্থ ওঠানো। আরবরা এ মাসে শিকার করার উদ্দেশ্যে কাঁধে অস্ত্র ওঠাত, এ জন্য এর নামকরণ করা হয়েছে ‘শাওয়াল’। (ইবনে কাছির, খণ্ড ২, পৃ. ৩০০)

(১১) জিলক্বদ: অর্থ বসে থাকা। আরবরা এ মাসে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকত (বসে থাকত), এ জন্য এর নামকরণ করা হয়েছে ‘জিলক্বদ’ করে। (ইবনে কাছির, খণ্ড ২, পৃ. ২২৬)

(১২) জিলহজ: হজের মাস বলে একে জিলহজ বলা হয়। (ইবনে কাছির, খণ্ড ২, পৃ. ২২৬)।

সংগৃহীত ইন্টারনেট

Leave a Reply