ইসলামী ব্যাংকিং সফল বাস্তবতা: মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা

2

ইসলামী ব্যাংকিং সফল বাস্তবতা: মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। সম্প্রতি দৈনিক সমকালকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও জনাব মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা। টিআইবি এর পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো-

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রসার ও প্রচলিত ব্যাংকগুলোর এ ধারায় রূপান্তরের কারণ কী বলে মনে করেন?

মুনিরুল মওলা: দেশে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা দ্রুত বিকাশমান। এর শুরু হয়েছিল ১৯৭৪ সালে দ্বিতীয় ওআইসি সম্মেলনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যোগদানের মাধ্যমে। ওই বছর জেদ্দায় ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীদের সম্মেলনে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ আইডিবি সনদে সই করেন। এ ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দেশের প্রথম প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ১৯৮৩ সালে কার্যক্রম শুরু করে।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্রমাগত শক্তিশালী হচ্ছে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা। শরীয়াহ্‌ভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের ব্যাপক আগ্রহ ও আন্তরিক সেবার মাধ্যমে আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেছে ইসলামী ব্যাংকিং। পরিচালন কৌশল, প্রযুক্তির উৎকর্ষ, সার্বজনীন ও সফলতায় এ ব্যবস্থার প্রসার ক্রমেই ত্বরান্বিত হচ্ছে। বৈশ্বিক আর্থিক মন্দার সময়েও ইসলামিক আর্থিক ব্যবস্থায় কোনো প্রভাব পড়েনি। শুধু বাংলাদেশ নয়, ইসলামী ব্যাংকিং আজ বিশ্বের এক সফল বাস্তবতা।

ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য এখন পর্যন্ত আলাদা আইন নেই। এতে এ খাতের কার্যক্রমে কী ধরনের প্রভাব পড়ে?

মুনিরুল মওলা: বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৯ সালের নীতিমালার আলোকে ইসলামী ব্যাংকগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য আলাদা আইন সময়ের দাবি। একেক দেশে ইসলামী ব্যাংকিং একেকভাবে প্রসার ঘটেছে। মালয়েশিয়া সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামী ব্যাংকিং বিকশিত হয়েছে। শুরুতেই তারা আইন করেছে। প্রকৃতপক্ষে, একটি আইনি পরিবেশ কার্যকরভাবে ইসলামী আর্থিক শিল্পের জটিলতাগুলোকে সমাধান করে এবং এর বিকাশকে সহজতর করে।

>> ব্যাংকিং খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ করদাতার পুরস্কার পেল ইসলামী ব্যাংক

দেশে ইসলামী ব্যাংকিং আইন না থাকায় প্রচলিত ব্যাংক ব্যবস্থা ও আইনের আওতায় কার্যক্রমের বিরোধ নিষ্পত্তি করতে গিয়ে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোকে জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, প্রতিটি ব্যাংকের নিজস্ব শক্তিশালী শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটি রয়েছে। কমিটির সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে শরিয়াহর আলোকে ইসলামী ব্যাংকগুলো পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া সেন্ট্রাল শরিয়াহ বোর্ড ফর ইসলামিক ব্যাংকস অব বাংলাদেশ বেসরকারিভাবে ব্যাংকগুলোর পরিপালন তদারকি করছে।

সরকার সম্প্রতি সুকুক বন্ড চালু করেছে। এতে ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সম্ভাবনা কী বাড়বে?

মুনিরুল মওলা: ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিধিবদ্ধ তারল্য সংরক্ষণের (এসএলআর) অর্থ বিনিয়োগের জন্য সরকারের ইসলামিক বিনিয়োগ বন্ড ছাড়া তেমন কোনো উপকরণ ছিল না। এটির রেট অব রিটার্ন খুবই কম। সুকুক চালু করা সরকারের যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত। ইতোমধ্যে এ বন্ড ছেড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা তহবিল গঠন করেছে সরকার। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক ১৫০০ কোটি টাকার বন্ড পেতে আবেদন করে। প্রথম ট্রাঞ্চেই ব্যাংকটি ৩৯৫ কোটি টাকার সাবস্ট্ক্রিপশন পেয়েছে। প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোও সুকুক বন্ডের ৬৫ শতাংশ ইউনিট কিনেছে। এটাই প্রমাণ করে মানুষ এখন শরিয়াহভিত্তিক অর্থব্যবস্থার দিকে বেশি ঝুঁকছে। এ বন্ডের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকগুলোরও বিনিয়োগের সম্ভাবনা বেড়েছে।

দেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মুনাফা পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক আছে। আমরা দেখি প্রচলিত ধারার ব্যাংকের মতোই আগে থেকে একটি হার নির্ধারণ করা হয়। বিষয়টি আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

মুনিরুল মওলা: ইসলামী ব্যাংক চলতি হিসাব আল ওয়াদিয়াহ পদ্ধতি ও অন্য সব ডিপোজিট মুদারাবা পদ্ধতিতে গ্রহণ করে। ব্যাংক ও হিসাবধারীর মধ্যে সম্পাদিত ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক মুদারাবা চুক্তির ভিত্তিতে ইসলামী ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করে। এখানে হিসাবধারী গ্রাহক হচ্ছে ‘সাহিব আল-মাল’ তথা অর্থের মালিক এবং ব্যাংক হচ্ছে ‘মুদারিব’ তথা কারবার সংগঠক। ইসলামী শরিয়াহ বর্ণিত নীতিমালার ভিত্তিতে ব্যাংক এ অর্থ জমা গ্রহণ করে এবং জমা করা অর্থ শুধু শরিয়াহসম্মতভাবে বিনিয়োগ করে।

ব্যাংক মুদারাবা তহবিল বিনিয়োগ করে প্রাপ্ত আয়ের কমপক্ষে শতকরা ৬৫ ভাগ মুদারাবা হিসাবধারীদের মধ্যে বণ্টন করে। সহজ হিসাবের জন্য মুনাফাকে শতকরা হারে দেখানো হয়। মুনাফার আনুমানিক হার নির্ধারণ করা হয়, যা পরে লাভ-লোকসানের ভিত্তিতে সমন্বয় করা হয়। দেশের ব্যাংকিং খাতের ধারা অনুসারে সাধারণত মোট বিনিয়োগ আয় নেতিবাচক হয় না। এ কারণে সত্যিকার অর্থে গ্রাহককে লোকসান বহন করতে হয় না।

ইসলামী ব্যাংক টাকার ব্যবসা করে না। সম্পদভিত্তিক ব্যবসা পরিচালনায় পণ্যের হাতবদলের মাধ্যমে প্রকৃত বিনিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করে। পণ্য হাতবদলের ভিত্তিতে ব্যবসা ও সেবা প্রদানের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক শরিয়াহর নীতিমালাকে শতভাগ পরিপালন করছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক হিসেবে আপনারা করোনা মহামারি পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দিয়েছেন?

মুনিরুল মওলা: করোনা মহামারিতে গোটা বিশ্বের অর্থনীতি যখন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও বিচক্ষণ নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনীতি আবারও ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। দেশের মজবুত অর্থনীতি ও উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় সহযোগী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ইসলামী ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রণোদনার অর্থের সর্বোচ্চ পরিমাণ বরাদ্দ দিয়েছে আমাদের। এর সিংহভাগ ইতোমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। মার্চ মাসের মধ্যে প্রণোদনার সম্পূর্ণ টাকা বিতরণ সম্পন্ন হবে। সেবার মানসিকতা নিয়ে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার ফলে করোনার তেমন কোনো নেতিবাচক প্রভাব ইসলামী ব্যাংককে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি। তবে সেবা দিতে গিয়ে আমাদের প্রায় ৩ হাজার কর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং ৫ জন মৃত্যুবরণ করেছেন।

পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে আপনাদের পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চাই?

মুনিরুল মওলা: গ্রাহকদের ব্যাংকের সঙ্গে সংযুক্ত রাখতে সেলফিন নামে নতুন অ্যাপ চালু করেছে ইসলামী ব্যাংক। শাখায় না গিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা ও ইন্সট্যান্ট ভিসা কার্ডসহ নানা ব্যাংকিং সেবা মিলবে এ অ্যাপে। এছাড়া ২০২১ সালে বিকল্প ব্যাংকিং সেবায় গুরুত্ব দিয়ে ইসলামী ব্যাংক ডেবিট ও ক্রেডিট (খিদমাহ) কার্ড বিতরণ, আই-ব্যাংকিং ও সেলফিন অ্যাপ গ্রাহক তৈরি করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বিকল্প সেবার বিস্তার, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিনিয়োগ চালু, ক্ষুদ্র অর্থায়নের সম্প্রসারণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ উৎসাহিতকরণ ইসলামী ব্যাংকের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে।

আপনারা অগ্রদূত হলেও অনেক ব্যাংক এখন ইসলামী ব্যাংকিংয়ে আসছে। এটি আপনাদের ব্যবসায় কেমন প্রভাব ফেলছে?

মুনিরুল মওলা: ইসলামী ব্যাংক দেশের সর্ববৃহৎ ও শক্তিশালী ব্যাংক। বাংলাদেশে শরিয়াহ্‌ভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রবর্তক। বর্তমানে আমানতের পরিমাণ এক লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা। সাধারণ বিনিয়োগের পরিমাণ এক লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। গ্রাহক সংখ্যা বেড়ে এক কোটি ৫৯ লাখে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে আমাদের ৩৭৩ শাখা, ১৬৬ উপশাখা, ২৩০০ এজেন্ট আউটলেট, ১৭৯৭ এটিএম বা সিআরএম বুথের মাধ্যমে সেবা দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বসেরা ১০০০ ব্যাংকের তালিকায় বাংলাদেশের একমাত্র ব্যাংক। এছাড়াও বিশ্বসেরা ইসলামী ব্যাংকের অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছে। এমন পরিস্থিতিতে অন্য ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রমে আসার বিষয়টি আমাদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বীর নয়; বরং তারা আমাদের সহযোগী। কল্যাণমুখী ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রসারই ইসলামী ব্যাংকের লক্ষ্য।

বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সমস্যা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে বলুন।

মুনিরুল মওলা: দেশে ইসলামী ব্যাংকিং অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত। অনেক পুরোনো এবং নতুন ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকিংয়ে আসতে চায়। এখনও দেশের বিরাট জনগোষ্ঠী ব্যাংকিং সেবার বাইরে রয়েছে, যাদের ইসলামী ব্যাংকিংয়ে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জগুলো হলো- দেশে ইসলামী ব্যাংকিং আইন না থাকা। শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ও অর্থব্যবস্থার ওপর অপর্যাপ্ত শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ দরকার। ইসলামী অর্থায়ন পদ্ধতি ও লেনদেনের শরিয়াহসম্মত রূপরেখা বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞানসম্পন্ন, অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যাংকার ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভাব রয়েছে।

ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রসারে কী ধরনের উদ্যোগ দরকার?

মুনিরুল মওলা: ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রসারের জন্য ইসলামী মানি মার্কেট ও বন্ড বাজারকে আরও গতিশীল করতে হবে। ইসলামী ব্যাংকিং সহায়ক শিক্ষা কার্যক্রম, গবেষণা ও সহায়ক প্রতিষ্ঠান বাড়াতে হবে। এছাড়া প্রশিক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে।

উৎসঃ সমকাল।

2 COMMENTS

Leave a Reply