ইসলামী ব্যাংকিং: একটি কল্যাণমুখী ব্যাংকিং ব্যবস্থা

অষ্টাদশ শতক থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত ইসলামী বিশ্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর উপনিবেশ ছিল। ঔপনিবেশিক শক্তি তাদের নিজ স্বার্থ চরিতার্থকরণের লক্ষ্যে তাদের পদ্ধতিতে এসব দেশের অর্থনীতি এবং অর্থ ব্যবস্থা গঠন ও পরিচালনা করেছে। তারাই প্রথম সুদযুক্ত ফাইন্যান্সিয়াল ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেছে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে দেশে দেশে পরিচালিত স্বাধীনতা আন্দোলন জাতিসত্তার হারানো ঐতিহ্য অনুধাবনে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ ও ফরাসি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পতন হলে তারা উপনিবেশগুলো থেকে তাদের হাত গুটিয়ে নেয় এবং বিভিন্ন দেশ স্বাধীনতা লাভ করতে থাকে। ১৯৪৫ থেকে ১৯৬৩ সালের মধ্যে সব মুসলিম দেশ উপনিবেশমুক্ত স্বাধীন দেশে পরিণত হলে মুসলমানরা নিজস্ব মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যের আলোকে অর্থ ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ গ্রহণ করে। ইসলামিক ফাইন্যান্স আন্দোলনের মাধ্যমে বিভিন্ন মুসলিম অর্থনীতিবিদ ও উলামারা ইসলামী অর্থনৈতিক মডেল ও অর্থ ব্যবস্থার রূপরেখা উন্নয়ন করেন। ১৯৪০-১৯৬০—এ ২০ বছরে প্রচুর গবেষণা পরিচালিত হয় এবং এসব গবেষণার মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের অনুসৃতব্য মডেল উদ্ভাবিত হয়। এ মডেলগুলোর মাধ্যমে নিম্নের বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা পরিষ্কার হয়:

(ক) ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টারমেডিয়েশনের প্রধান লক্ষ্য হলো আদল ও ইহসান নিশ্চিত করা, যার মূলে রয়েছে লাভ-ক্ষতি অংশীদারিত্বভিত্তিক মডেল।

(খ) সুদ শোষণের হাতিয়ার এবং টেকসই অর্থ ব্যবস্থার জন্য একটি অন্যতম De-estabilizing factor.

টেকনো ইনফো বিডি‘র প্রিয় পাঠক: প্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও চাকরির গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ টেকনো ইনফো বিডি তে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন।

(গ) সুদভিত্তিক লেনদেন মুসলমানের ইমানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যেহেতু কুরআনুল কারিমে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সরাসরি সুদ নিষিদ্ধ করেছেন।

(ঘ) বর্তমান ব্যাংকিং প্র্যাকটিসে মূলধন কোনো ব্যবসায়িক ঝুঁকি বহন করে না। সুবিচার নিশ্চিত করতে হলে মূলধনের মালিককে ঝুঁকি বহন করতে হবে।

(ঙ) জাতীয় আয় ও সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হলে শরিয়াহভিত্তিক ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টারমেডিয়েশন আবশ্যক, অর্থাত্ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টারমেডিয়েশন হতে হবে নৈতিকতাভিত্তিক।

(চ) লাভ-ক্ষতি অংশীদারিত্বভিত্তিক মডেলের পাশাপাশি Debt-financing model প্র্যাকটিস করা যেতে পারে। এজন্য মুদারাবা ও মুশারাকার পাশাপাশি বাই-মুরাবাহা, বাই-সালাম, বাই-ইসতিসনা ও ইজারাভিত্তিক অর্থায়ন পদ্ধতির অনুমোদন দেয়া হয়।

(ছ) ইসলামিক ফাইন্যান্স মুদ্রাস্ফীতি সহযোগী নয়। কারণ Debt ইনস্ট্রুমেন্টস অর্থের বিকল্প হিসেবে ভূমিকা পালন করে, এর বিপরীতে ইকুইটি বেজড ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্ট্রুমেন্টসের এ রকম কোনো ভূমিকা নেই।

উপরোক্ত ধারণাগুলোর আলোকে প্রাথমিকভাবে ১৯৪০-এর দশকে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম ইসলামী ব্যাংকিংয়ের এক্সপেরিমেন্ট করা হয়। ১৯৬৩ সালে মিসরের নীল নদের তীরবর্তী ‘মিটঘামর’ নামের অঞ্চলে ইসলামী ব্যাংকিং চালু করা হয়। একই বছরে মালয়েশিয়ায় তাবুং হাজ্জি (সঞ্চিত অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে বৃদ্ধি করে হজ পালনে সক্ষম করা) প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে সারা বিশ্বে মুসলিম-অমুসলিম দেশ নির্বিশেষে ৫০০-এরও বেশি ইসলামিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, যাদের মোট সম্পদের পরিমাণ ২০২০ সালে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৭০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার (উত্স: ইসলামিক ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট, ২০২১)। ইসলামিক ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ১০ দশমিক ৭০ শতাংশ। সম্প্রতি প্রকাশিত Moodz’s-এর তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কভিড-১৯-এর কারণে সৃষ্ট কঠিন পরিস্থিতির মাঝেও সারা বিশ্বে ইসলামী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

কভিড-১৯ প্যানডেমিকের মাঝেও ইসলামী ব্যাংকগুলো তাদের কল্যাণমুখী কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। রমজান মাস চলছে। রোজা যেমন তাকওয়া অর্জনের লক্ষ্যে রোজাদারকে প্রস্তুত করে, তেমনি ইসলামী ব্যাংক তাকওয়াভিত্তিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় শুধু মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে যাবতীয় কাজ করে না। কল্যাণ বাড়ানোর লক্ষ্যে ইসলামী ব্যাংকগুলো সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। অর্থনীতি ও আর্থিক কারবারে শোষণ, বৈষম্য ও বিশৃঙ্খলা দূর করার জন্য ‘তাকওয়ার গুণাবলিসম্পন্ন ব্যবসায়ী’ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। ব্যাংকিং নীতি ও পদ্ধতি তাকওয়াভিত্তিক হলে দেশের আয় ও সম্পদ বণ্টনে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপিত হবে। তাকওয়াসম্পন্ন ব্যাংকার ও তাকওয়াসম্পন্ন গ্রাহকের অপূর্ব সমন্বয়ে একটি কল্যাণমুখী সমাজ নির্মাণ সম্ভব।

কল্যাণমুখী ব্যাংকিং: ইসলামী ব্যাংকিং

ইসলাম মানুষের সার্বিক কল্যাণের জন্য যে অর্থনৈতিক বিধিবিধান দিয়েছে, তা পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের তুলনায় অত্যন্ত শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইহকালীন জীবনের কর্মের সঙ্গে পরকালীন জীবনের প্রাপ্তির সম্পর্কের যে সেতু বন্ধের ধারণা ইসলাম দিয়েছে, তার যথাযথ অনুধাবন ও বাস্তবায়ন করলে সমাজে কল্যাণ অর্জন নিশ্চিত। ইসলামের অর্থনৈতিক নীতিমালা বাস্তবায়ন করা যেমন ব্যক্তির ওপর আবশ্যিক, ঠিক তেমনি তা প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের ওপরও আবশ্যিক। সুদমুক্ত জীবন যাপন করা একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত। ইসলামী শরিয়াহর একটি অপরিহার্য দাবি হচ্ছে আয় হালাল পথে অর্জন করা এবং ব্যয় শরিয়াহ অনুমোদিত পথে করা। যেমন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ফরজ ইবাদতগুলোর মধ্যে প্রথম ফরজ হলো হালাল রিজিক অর্জন।’ হালাল রিজিক অর্জিত না হলে সব কাজই ব্যর্থ হতে বাধ্য।

আরও দেখুন:
ইসলামী ব্যাংকিংয়ের এক নক্ষত্র, উজ্জলতায় আলোকিত থাকুক
উন্নত জীবনের জন্য ইসলামী ব্যাংকিং জরুরি

মাকাসিদ আল শরিয়াহ ইসলামিক ফাইন্যান্সিয়াল প্রডাক্টের রূপরেখা উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেহেতু ইসলামী ব্যাংকের যাবতীয় Transactions Ges Services শরিয়াহভিত্তিক হতে হবে, সেজন্য লক্ষ রাখতে হবে ইসলামী শরিয়াহ অনুমোদিত পন্থায় সেগুলোর পরিপালন হচ্ছে কিনা। অতএব, ইসলামী ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল প্রডাক্ট Shariah Compliant হওয়াটা শুধু কাঠামোগত ইস্যু নয়, বরং উদ্দেশ্যের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ (must be Shariah-Compliant not only in Structure but also in purpose)। মাকাসিদ শব্দটি মাকসাদ শব্দের বহুবচন। মূল শব্দ ‘কাস্দ’, অর্থাত্ কোনো কাজের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য বা প্রজ্ঞা। অন্যদিকে শরিয়াহ শব্দটির মূল শব্দ হচ্ছে ‘শারআ’ ক্রিয়া। অর্থাত্ রাজপথ, দরজা উন্মুক্ত করা, আইন প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি। যাহোক, মাকাসিদ আল শরিয়াহর অর্থ হচ্ছে ইসলামিক আইনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যগুলো অর্জন করা।

মাকাসিদ আল শরিয়াহ অর্থাত্ শরিয়াহর মূল উদ্দেশ্যগুলোর আলোকে ব্যাংকের যাবতীয় নীতিমালা ও কর্মপন্থা প্রণয়ন করা একটি ইসলামী ব্যাংকের নৈতিক দায়িত্ব। ইমাম আল-শাতিবি মাকাসিদ আল শরিয়াহর যে জরুরি দিকগুলোর ওপর বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে হিফজ-উদ-দীন, হিফজ-উন-নফস, হিফজ-উল-আকল, হিফজ-উন-নাসল এবং হিফজ-উল-মাল। এগুলোর ওয়েটেজ আমরা দিতে পারি এভাবে: ১০%, ২০%, ২০%, ১০%, ৪০% = ১০০%।

(ক) হিফজ-উদ্-দীন (الدين حفظ)—ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। অর্থনীতি ও ব্যাংকিংয়ের একটি মাত্র দিক। দীনের এদিকের ওপর সার্বিক গুরুত্বারোপ করে অন্যান্য অর্থনৈতিক মতবাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার যোগ্যতাসম্পন্ন মানবসম্পদ সৃষ্টি করতে হবে। এ লক্ষ্যে মানুষের মধ্যে নৈতিক গুণাবলির উন্মেষ করা ও খলিফা বা আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে (Trusteeship) দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা সৃষ্টির লক্ষ্যে চেষ্টা চালানো প্রয়োজন। মুসলমানদের চিন্তা-চেতনা সুবিন্যস্তকরণে এবং প্রাধিকার নির্ণয়ের ব্যাপারে সজাগ করা এবং বিরাজমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যথাযথ কৌশল প্রণয়ন করা।

(খ) হিফজ-উন-নফস (النفس حفظ)—মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় বস্তুসামগ্রীর ব্যবস্থাকরণ। ভোগ ও উত্পাদনের ক্ষেত্রে ইসলামী শরিয়াহর বিধিবিধান পালন করা। যেহেতু খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিত্সা মানুষের মৌলিক প্রয়োজন বা Basic Needs-এর অন্তর্ভুক্ত, সেহেতু এগুলোর যথাযথ উত্পাদন ও বণ্টনের জন্য ইসলামী শরিয়াহর আলোকে ব্যবস্থা নেয়া। এখানে ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিশাল ভূমিকা রয়েছে। পণ্যের উত্পাদন ও ব্যবসা, পণ্যমূল্য নির্ধারণ, বাজারজাত ও বণ্টনের ক্ষেত্রে অর্থায়ন একটা বড় ভূমিকা পালন করে। অতএব, ইসলামী ব্যাংক তার ফাইন্যান্সিং পলিসি প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রাধিকার দেবে সেইসব পণ্যসামগ্রীর উত্পাদন, আমদানি ও ব্যবসায়ের দিকে, যাতে মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ হয় এবং কল্যাণ অর্জিত হয়। ছোট ছোট বিনিয়োগ প্রকল্পে বা সিএমএসএমইতে বেশি বিনিয়োগ করা, যাতে মানুষের ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয় এবং আয় সবার কাছে পৌঁছে যায়। বিলাসসামগ্রী উত্পাদন ও আমদানিতে অর্থায়ন করা না হলে তা মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সামগ্রীর প্রাপ্যতা সহজলভ্য করবে।

(গ) হিফজ-উল-আকল (العقل حفظ)—মানুষের মধ্যে জ্ঞানচর্চা, ইসলাম নিয়ে গবেষণা, উচ্চতর গবেষণা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা ইত্যাদি হলো এর অন্যতম মৌলিক লক্ষ্য। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিভিন্ন উচ্চতর শিক্ষালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, লাইব্রেরি, শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া। ইসলামী ব্যাংকগুলো ইসলামিক সোশ্যাল ফাইন্যান্সের আওতায় জাকাত ও ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ বিষয়ে বিভিন্ন সহায়তামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে। যেমন ক্যাশ ওয়াকফ ডিপোজিট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এর থেকে উত্সারিত আয় ওয়াকিফ নির্দেশিত বিভিন্ন মাদ্রাসা-মসজিদভিত্তিক কার্যক্রমসহ অন্যান্য সমাজকল্যাণ ও উন্নয়নমমূলক কাজে ব্যয় করা হচ্ছে। অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকগুলো সিএসআরের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা সম্প্রসারণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। উচ্চশিক্ষা বৃত্তি দিচ্ছে এবং স্কুল-কলেজ, মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করছে। নৈতিক চারিত্রিক গুণাবলিসম্পন্ন উচ্চশিক্ষিত প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ডাক্তার, প্রকৌশলী, বুদ্ধিজীবী তৈরির ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকগুলোকে দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে।

(ঘ) হিফজ-উন-নাসল (النسل حفظ)—বর্তমান চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে সম্পদের সর্বোচ্চ ভোগ ও ব্যবহারে বিরত থেকে ভবিষ্যত্ বংশধরদের জন্য বিভিন্ন সুবিধা অক্ষুণ্ন ও অব্যাহত রাখা এবং তাদের সময়ের প্রয়োজনে চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে পর্যাপ্ত সম্পদ সংরক্ষণ করা আবশ্যক। মা-বাবা বা অভিভাবকের অবর্তমানে ভবিষ্যত্ মানুষেরা যাতে তাদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতে পারে এবং সম্পদের প্রবাহ অব্যাহত থাকে—এ নিরিখেই বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন আমরা জানি পাঁচটি—খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিত্সা। কিন্তু শরিয়াহ বলছে কিছু পরিমাণ সম্পদ সঞ্চয় করাও মৌলিক প্রয়োজনের মধ্যে পড়ে। যেমন ব্যাংকে আমানত রাখা (ব্যাংক ডিপোজিট)। অতএব, ইসলামী ব্যাংক আমানত গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করে শরিয়াহর এ লক্ষ্য অর্জনে ভূমিকা পালন করছে। বিভিন্ন উচ্চশিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ কার্যক্রম যেমন Student Investment Scheme, Scholarship Scheme, Heigher education financing Scheme ইত্যাদির মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকগুলো আগামী দিনের নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন উচ্চশিক্ষিত ডাক্তার, প্রকৌশলী ইত্যাদি পেশাজীবী তৈরি করতে পারে।

(ঙ) হিফজ-উল-মাল (المال حفظ)—সম্পদের সার্বিকভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা। এখানেই ইসলামী ব্যাংকগুলোর মূল দায়িত্বের কথা আসে। অর্থনৈতিক সম্পদের বণ্টন ও ব্যবস্থাপনা সুবিচারভিত্তিক করা। ধনীদের কাছ থেকে সম্পদ গরিবের দিকে (Re-direction of Resources towards Poor) কীভাবে নেয়া যায়, সে ব্যাপারে ইসলামী ব্যাংকের করণীয় রয়েছে। আয় ও সম্পদের সুষম বণ্টনের ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকগুলো আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য বিভিন্ন আয়বর্ধনমুখী প্রকল্প তৈরি ও বাস্তবায়ন করতে পারে। সাপ্লাই ড্রাইভেন পলিসির মাধ্যমে দরিদ্র কিন্তু দক্ষ, শিক্ষিত কিন্তু সম্পদহীন, শারীরিকভাবে সক্ষম কিন্তু আর্থিকভাবে অক্ষম—এ-জাতীয় লোকদের কাছে তার আর্থিক সেবা সম্প্রসারণ করতে পারে। এদের আর্থিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে, যার সুফল গোটা সমাজ ও রাষ্ট্র লাভ করবে। অতএব, আর্থিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের লক্ষ্যে পরিকল্পনা গ্রহণ ও অসহায়, বঞ্চিতদের দিকে তা প্রবাহ করলে শরিয়াহর এ উদ্দেশ্য পূরণ করা সম্ভব।

উপরোক্ত শরিয়াহর লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য ইসলামী ব্যাংকগুলো তাদের সব আমানত ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঢেলে সাজালে কল্যাণমুখী ব্যাংকিংয়ের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে। অতএব, শরিয়াহর আলোকে একটি কল্যাণমূলক ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো ফুটে ওঠে:

ক. ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ও দর্শনের আলোকে সামাজিক ও আর্থিক উন্নয়নের সমন্বয় করতে হবে। আর্থিক লেনদেন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে পারস্পরিক স্বার্থে ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অংশীদারিত্বভিত্তিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে উত্সাহ দিতে হবে।

খ. অর্থনৈতিক সুবিধাবঞ্চিতদের নিয়ে বিনিয়োগ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বিভিন্ন সেক্টরে দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে পরিকল্পনা মোতাবেক আর্থিক সহায়তা সম্প্রসারণ করতে হবে। কৃষি খাতে বিভিন্ন ক্ষুদ্র বিনিয়োগ প্রকল্পের মাধ্যমে হতদরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত প্রান্তিক মানুষদের আয় বর্ধনকারী কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে।

গ. ‘টাকার কেনা-বেচা নয়’ বরং ‘পণ্যের কেনা-বেচা’-কে লেনদেনের ভিত্তি করতে হবে। অনির্ধারিত ও অনিশ্চিত মুনাফাকে ঝুঁকি বহনের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।

ঘ. সম্পদের উত্পাদন ও বণ্টনে সুবিচারমূলক নীতি অনুসরণ করতে হবে। Growth with Equity অথবা Growth with Justice অর্জনের লক্ষ্যে সম্পদের প্রবাহ যাতে গরিবদের দিকে সম্প্রসারিত হয়, সেদিকে প্রাধিকার দিতে হবে।

ঙ. মানুষকে সঞ্চয়ে উত্সাহিত করে তাদের অর্থের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে হবে। উত্পাদনক্ষম পুঁজিহীন দক্ষ জনশক্তিকে (Demographic dividend) আর্থিক সম্পদ প্রাপ্তি ও ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে। ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে আর্থিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা সৃষ্টি করতে হবে।

চ. সিআরএস কার্যক্রমের আওতায় মানুষের অর্থনৈতিক দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। ইসলামিক সোশ্যাল ফাইন্যান্সভিত্তিক কার্যক্রম ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করতে হবে। ওয়াকফভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, যেমন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল ইত্যাদি ভিজিবল হতে হবে, যাতে ধনিক শ্রেণী আরো বেশি বেশি জাকাত ও ওয়াকফ সম্পদ প্রদানে এগিয়ে আসে।

উপসংহার

ইসলামী ব্যাংকগুলো দেশের আর্থিক খাতে যে কল্যাণমুখী ধারা সৃষ্টি করেছে, তা আরো বেগবান হওয়া দরকার। এজন্য নীতিনির্ধারক, পরিচালক ও পেশাদার ব্যাংকারদের জ্ঞানগত যোগ্যতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। যাহোক, ইসলামী শরিয়াহর আলোকে জীবন পরিচালনাই হচ্ছে একজন মুসলমানের নৈতিক দায়িত্ব। ঠিক তেমনি ইসলামী ব্যাংকগুলো শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাদের যাবতীয় পরিকল্পনা ও কার্যক্রমে শরিয়াহর লক্ষ্য বাস্তবায়নই প্রাধিকার পাবে। এটাই স্বাভাবিক। অতএব, একটি সামগ্রিক অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং (Highly inclusive) হিসেবে ইসলামী ব্যাংকিং মানুষের কল্যাণে নিবেদিত হোক—আজকের এ সিয়ামের মাসে এটিই আমাদের আন্তরিক কামনা।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button