সাফল্যের নতুন উচ্চতায় ইসলামী ব্যাংক

2
Islami Bank

তিন বছরে ডিপোজিট (আমানত) বেড়েছে ৩৯ হাজার কোটি টাকা। বিনিয়োগ ২৭ হাজার কোটি টাকা। অন্যান্য ব্যাংকের হিসাব সংখ্যা কমলেও এ সময়ে রেকর্ড ভেঙে ৪২ লাখ নতুন গ্রাহক হয়েছেন। বাংলাদেশে তফসিলভুক্ত ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে এর মাধ্যমে প্রবাসী আয়েও রেকর্ড অব্যাহত রাখছে।

তিন ভাগের এক ভাগ রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা ইসলামী ব্যাংকে। এভাবেই সব শঙ্কার জালভেদ করেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাহবুব-উল-আলমের নেতৃত্বে সবক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। ব্যাংকিং কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে অল্প সময়ে নারীর ক্ষমতায়নেও সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে রাজধানীসহ বড় বড় শহরের নামিদামি শিল্পোদ্যোক্তারাও এ ব্যাংকের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে সুনামের সাথে চালাচ্ছেন ব্যবসা-বাণিজ্য।

সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকে প্রবেশনারি অফিসার নিয়োগ

করোনা অর্থনীতিকে থমকে দিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করেন প্রণোদনা প্যাকেজ। এই লক্ষ্যমাত্রা প্রায় অর্জন করেছে এ ব্যাংক। এসব সফলতার মাধ্যমে বর্তমানে ইসলামী ব্যাংক নতুন উচ্চতায় পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে বলে ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা জানান।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংক সূত্র জানায়, স্বাধীনতার পরে দেশে প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের পরিবর্তে দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফসলস্বরূপ ১৯৮৩ সালের ১৩ মার্চ প্রথম সুদমুক্ত ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড।

এই ব্যাংকের মতো দেশে অন্যান্য কয়েকটি শরীয়াভিত্তিক ব্যাংক চালু হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইন ও সরকারের নিয়ম মেনে দেশ-বিদেশে প্রথম থেকেই বিভিন্ন সেবার মাধ্যমে ব্যতিক্রম ধারায় স্থান করে নিয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড।

এমনকি ২০১৭ সালে এ ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তনে অনেকেই শঙ্কায় ছিলেন। বিভিন্ন মহলে ব্যাংকটি পতনের দিকে যেতে পারে বলে গুঞ্জন সৃষ্টি হয়েছিল। সুশাসন ও বিনিয়োগের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানটি থেকে গ্রাহকরা মুখ ফিরিয়ে নেবেন বলে ধারণা করেছিল।

আর এগুতে পারবে না দেশের সর্বোচ্চ ইসলামী ব্যাংক। কিন্তু সরকারের সার্বিক সহযোগিতায় এবং দ্বিতীয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে এমডি মো. মাহবুব-উল-আলমের যোগ্য নেতৃত্বে এবং কর্মকর্তাদের আন্তরিকতায় পাল্টে গেছে শঙ্কিত মানুষের ধারণা।

এছাড়াও রয়েছে একদল সুদক্ষ, অভিজ্ঞ, নিষ্ঠাবান পরিচালনা পর্ষদ এবং শরীআহ্ সুপারভাইজারি কমিটি। এভাবে সবার প্রচেষ্টা ও চেষ্টায় এগিয়ে যাচ্ছে এই ব্যাংক। সবকিছুকে ছাপিয়ে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে সুনাম অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে এ ব্যাংক।

বর্তমানে ১৮ হাজার লোকবল রয়েছে এ ব্যাংকে। এরমধ্যে এক হাজার নারী কর্মকর্তা। সরকারের মিশন নারীর ক্ষমতায়নের অংশ হিসাবে অল্প সময়েই এই স্থানে পৌঁছা সম্ভব হয়েছে। যা ব্যাংকিং খাতে আরও একটি রেকর্ড বলে বলছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু অফিসেই সীমাবদ্ধ নেই নারীদের পদচারণা।

গ্রামীণ নারীদের ভাগ্য উন্নয়নেও যুক্ত হয়েছে এই ব্যাংক। আরডিএসের (পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প) মাধ্যমে বর্তমানে ২৩ হাজার গ্রামে সাড়ে ১২ লাখ গ্রাহকের সাথে যুক্ত হয়েছে ইসলামী ব্যাংক। এই গ্রাহকের ৯০ শতাংশের উপরে হচ্ছে নারী। তারা সাধ্যমতো অল্প অল্প ঋণ নিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করছে বলে কর্মকর্তারা জানান।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের অর্থায়নে শুধু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরের কর্পোরেট শিল্পোদ্যোক্তারাও এই ব্যাংকে জড়িয়ে সফলতার চূড়ায় পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে তফসিলি ৬১ ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করলেও একমাত্র ইসলামী ব্যাংকই রেমিটেন্সে সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে গেছে।

আগের ধারায় সর্বোচ্চ বৈদেশিক রেমিট্যান্স আহরণে এনআরবি গোল্ড রেমিটেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০১৯ অর্জন করেছে এ ব্যাংকটি। কারণ বাংলাদেশে মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দেশের প্রবাসীরা যতো রেমিটেন্স দেশে পাঠান তার তিন ভাগের এক ভাগই ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে।

করোনাকালেও বাংলাদেশে রেমিটেন্সে প্রবাহের যে রেকর্ড ইসলামী ব্যাংকও তার ভাগিদার হতে পেরে কর্মকর্তারা গর্বিত বলে জানান। অনেক ব্যাংকে ধস নামলেও সবার আন্তরিকতায় ডিপোজিটে অনেক এগিয়ে গেছে। ২০১৭ সালে ডিপোজিট ৭৫ হাজার কোটি টাকা ছিলো।

বর্তমানে তা বেড়ে এক লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকায় ঠেকেছে। তিন বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ৩৯ হাজার কোটি টাকা। এরমধ্যে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ৪৮ হাজার কোটি টাকা ডিপোজিট হয়েছে। এর সাথে দুই হাজার ২০০টি এজেন্ট যুক্ত। এরাও এক প্রকারের ব্যাংকিংয়ের সাথে সরাসরি যুক্ত। কারণ গ্রামাঞ্চলের যেখানে শাখা নেই সেখানে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে হিসাব খুলে টাকা জমা ও তোলারও ব্যবস্থা করা হয়েছে। সবাইকে ব্যাংকিংসেবা দেয়ার জন্যই এ ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বিনিয়োগেও রেকর্ড করেছে এ ব্যাংকটি। ২০১৭ সালে ৭১ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ ছিলো। বর্তমানে বেড়ে ৯৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তিন বছরে বেড়েছে ২৭ হাজার কোটি টাকা। এই সময়ে নতুন গ্রাহক সংখ্যা হয়েছে ৪২ লাখ। যা আরও একটি রেকর্ড।

চেকের ঝামেলা থেকে রক্ষা পেতে কার্ডের মাধ্যমে টাকা তোলার ব্যবস্থায় তৎপর এ ব্যাংক। বর্তমানে ১৬২টি বুথের মাধ্যমে এটিএমের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। সরকারের সহযোগিতা, সঠিক সময়ে যোগ্য নেতৃত্ব ও সবার প্রচেষ্টায় এ ব্যাংকের অ্যাসেট কোয়ালিটি ভালো অবস্থানে রয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানান।

দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে সুনাম অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে এ ব্যাংক। ইসলামী বিশ্বের সেরা ১০০০ ব্যাংকের তালিকায় বাংলাদেশের একমাত্র ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডই স্থান পেয়েছে। সব ব্যাংকের মধ্যে ৯৪৩তম স্থান পেয়েছে এই ব্যাংক।

যা বাংলাদেশের অন্য কোনো ব্যাংক এই তালিকায় স্থান পায়নি। ২০১৯ সালে দি ব্যাংকার ইউকে শতাব্দীর প্রাচীন ম্যাগাজিন ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স এই অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে। শুধু তাই নয়, একমাত্র এ ব্যাংকই পেয়েছে বিশ্বসেরা ইসলামী ব্যাংক সিবাফি (কাউন্সিল ফর ইসলামী ব্যাংকার এন্ড ফাইন্যান্সিয়াল ইন্সটিটিউশন) অ্যাওয়ার্ড ২০১৯।

এছাড়া পরিচালনা পরিবর্তন এ ব্যাংকের জন্য আরেকটি সুযোগ তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে, যেটা কয়েক বছর ধরে ছিলো না। ইসলামী ব্যাংক যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান জেপি মরগানের সঙ্গে ইতোমধ্যে চারটি হিসাব চালু করেছে। লন্ডন, নিউইয়র্ক, জাপান, ইউরোপেও অ্যাকাউন্ট করেছে ইসলামী ব্যাংক। তাদের সঙ্গে ব্যবসাও শুরু হয়েছে।

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, ধর্ম-বর্ণ, দল-মতনির্বিশেষে একটি সর্বজনীন গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে বর্তমান ইসলামী ব্যাংক। যা শুরুতে ছিলো না। সময়ের পরিবর্তনে তা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকের একটি বাজার ছিলো। প্রতিষ্ঠার পর ইসলামী ব্যাংক সেই জায়গা করে সুনামের সাথে এগিয়ে যাচ্ছে।

করোনাকালে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও অর্থনীতিতে ছাপ পড়ে। তা চাঙ্গা করতে প্রধানমন্ত্রী সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কথা বিবেচনা করে এক লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। যা জিডিপির ৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ। তাতে ২১টি প্যাকেজ রয়েছে।

কারো হাতে নগদ অর্থ, কাউকে ঋণ ও ভাতা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যাতে সবাই সুবিধা পান। কেউ বাদ না পড়ে। এসব বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার জারি করে লক্ষ্য বেধে দেয় ব্যাংকগুলোকে। অন্যান্য ব্যাংকের মতো ইসলামী ব্যাংকও সাধ্যমতো লক্ষ্য নির্ধারণ করে প্যাকেজের প্রায় সব অর্থ বিতরণ করতে সক্ষম হয়েছে। এভাবে সবদিকে পরিবর্তনের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংককে নিয়ে গেছে নতুন উচ্চতায় বলে কর্মকর্তারা জানান।

2 COMMENTS

Leave a Reply