ইসলামী ব্যাংক বিনিয়োগে গ্রাহকের চাহিদাকে প্রাধান্য দেয়

0

আমাদের মৌলিক চাহিদার অন্যতম উপাদান হলো আবাসন। প্রতিটি মানুষেরই স্বপ্ন থাকে একটি সুন্দর বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্টের মালিক হওয়ার। সাধ আর সাধ্যের সমন্বয় করতে একার পক্ষে সব সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই গ্রাহকদের স্বপ্ন পূরণে আবাসনে বিনিয়োগ (ঋণ) করে থাকে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। আবাসন বিনিয়োগের নিয়ম-কানুন ও বিবিধ বিষয়ে কথা বলেছেন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর আবু রেজা মো. ইয়াহিয়া।

আবাসন বিনিয়োগে ইসলামী ব্যাংক কোন ধরনের গ্রাহককে প্রাধান্য দেয়—এ প্রশ্নে আবু রেজা মো. ইয়াহিয়া বলেন, ‘আবাসনে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা গ্রাহকের চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকি। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যেমন—প্রবাসী, চাকরিজীবী, পেশাজীবী, ব্যবসায়ীসহ সব শ্রেণির গ্রাহককেই সুযোগ দিয়ে থাকি। আমরা শহরে বিনিয়োগের পাশাপাশি পল্লী অঞ্চলের আবাসন উন্নয়নেও কাজ করছি। কৃষক, তাঁতি, জেলে, প্রবাসী শ্রমিক, শিক্ষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ সব পেশার মানুষের জন্য আমাদের আবাসিক বিনিয়োগ সুবিধা রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক একটি কল্যাণমুখী ব্যাংক। এ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের বিষয়টিকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিবেচনায় রেখে আমরা বিনিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করি। মৌলিক চাহিদার অন্যতম উপাদান আবাসন আমাদের বিনিয়োগের বড় একটি খাত।’

প্রতিষ্ঠানের আবাসন পণ্যগুলো সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘শহর ও গ্রামের উন্নয়নের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করে থাকি। ইসলামী ব্যাংক আবাসিক, বাণিজ্যিকসহ আবাসিক, পল্লীগৃহ নির্মাণ, বাড়ির আধুনিকায়ন, সংস্কার ও সম্প্রসারণ এবং ডেভেলপারদের জন্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল বিনিয়োগ দেয়। এ ব্যাংকের বিনিয়োগে কোনো হিডেন কস্ট নেই, তাই গ্রাহককে হয়রানির শিকার হতে হয় না। কোনো রকম প্রসেসিং ফিও নেই। এ ছাড়া কেউ যদি বিনিয়োগ ম্যাচিউরড হওয়ার আগে পরিশোধ করে তাহলে তার জন্য কোনো অ্যাডজাস্টমেন্ট ফিও নেই। এসব কারণে ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ অন্যদের থেকে আলাদা।’

কী কী শর্ত পরিপালন সাপেক্ষে এই ঋণ পাওয়া যায়—এ প্রশ্নে আবু রেজা মো. ইয়াহিয়া বলেন, ‘বিনিয়োগপ্রাপ্তির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিভিন্ন রেগুলেটরি অথরিটির কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন ব্যাংক ও গ্রাহক উভয়কে পরিপালন করতে হয়। বিনিয়োগকে নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত করতে এসব শর্ত পরিপালন আবশ্যক। আবাসনে বিনিয়োগ পাওয়ার জন্য গ্রাহকের সঠিক মালিকানা নিশ্চিত করতে হয়। এ জন্য দলিলাদিসহ সব কাগজপত্রের সত্যতা যাচাই আবশ্যক। এ ছাড়া যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন আছে কি না, প্রকল্পটি পরিবেশবান্ধব কি না এবং যে জমিতে ফ্ল্যাট বা বাড়ি করা হচ্ছে, তা নিষ্কণ্টক কি না, তা যাচাই করা হয়।’

রিহ্যাবের অভিযোগ আবাসন বিনিয়োগে লাভের হার তুলনামূলক বেশি। ফ্ল্যাট ও প্লটের ব্যবসায় মন্দার পেছনে উচ্চ সুদহারও দায়ী। এ বিষয়ে তিনি বলেন, এ খাতে বিনিয়োগ হয় দীর্ঘ মেয়াদে। এ ক্ষেত্রে রিটার্নের হার অন্যান্য বাণিজ্যিক বিনিয়োগের তুলনায় একটু বেশি। তবে এ ব্যবসায় মন্দার পেছনে এটিকে একমাত্র কারণ বলা যাবে না। মূল্য নির্ধারণসহ বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি ও অতিরিক্ত লোভ এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। অতিরিক্ত লাভের আশায় জমির অতিমূল্যায়নের জন্য দায়ী।

তিনি বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগের নিয়ম-কানুন তুলনামূলক সহজ। আমাদের বিনিয়োগে কোনো হিডেন কস্ট না থাকা এবং প্রসেসিং ফি না থাকায় গ্রাহকরা এখানে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। দেশব্যাপী ইসলামী ব্যাংকের বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্কও রয়েছে। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের আবাসন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ গ্রাহক ২১ হাজার ৪৫৮, যা ব্যাংকিং খাতে সর্বোচ্চ। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের বিনিয়োগের পরিমাণ ছয় হাজার ৫২৮ কোটি, যা ব্যাংকিং খাতের মোট বিনিয়োগের ১১ শতাংশ।’

আবাসন বিনিয়োগের আদায়ের হার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দক্ষ কর্মকর্তারা কাজ করে থাকেন। তাদের বিনিয়োগ কার্যক্রম নিয়মিত তদারকির কারণে আমাদের বিনিয়োগ আদায়ের হার সন্তোষজনক। ডেভেলপারের অংশ বাদ দিলে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও পল্লী গৃহ নির্মাণ ক্ষেত্রে আদায়ের হার ৯৬ থেকে ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত। ব্যক্তি খাতে ছোট বিনিয়োগ সাময়িক খেলাপি হলেও দীর্ঘ মেয়াদে পারফরমিং থাকে। তবে ডেভেলপারের মতো বড় বিনিয়োগ খেলাপি হলে সে ক্ষেত্রে সমস্যা বেশি হয়।

তিনি আবাসন ঋণের বর্তমান সীমা সম্পর্কে বলেন, যেকোনো ঋণের সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের প্রয়োজন এবং সামর্থ্যকে বিবেচনা করা হয়। আবাসন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মূলধনে গ্রাহক এবং ব্যাংক উভয়ের অংশগ্রহণ আবশ্যক। ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট অংশ বিনিয়োগ প্রদান করে থাকে। বর্তমানে আবাসন ঋণের সর্বোচ্চ সীমা দুই কোটি টাকা। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক কনজ্যুমার ফাইন্যান্স খাতে এই সীমা ১.২ কোটি থেকে বৃদ্ধি করে দুই কোটিতে উন্নীত করেছে। প্রয়োজন বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংকগুলো বিনিয়োগসীমা নির্ধারণ করে।

তিনি বলেন, যেকোনো বিনিয়োগ প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাংক যে ব্যক্তিকে দেয় তার পরিচিতি, আর্থিক সামর্থ্য, পেশা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য ব্যাংকের কাছে থাকা আবশ্যক। এ জন্য কিছু কাগজপত্র তো অবশ্যই প্রয়োজন। বিনিয়োগ প্রদানের ক্ষেত্রে মালিকানার জন্য সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যেসব অত্যাবশ্যকীয় কাগজপত্র তা চাওয়া হয়। জাতীয়ভাবে কাগজপত্রের নিয়ম-কানুন সহজ করা সম্ভব হলে ব্যাংকেরও সিদ্ধান্ত নিতে সহজ হবে।

আবাসন ঋণের ঝুঁকির দিকগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, আবাসনে বিনিয়োগে নানা ঝুঁকি থাকে। ব্যাংকের তারল্যের দিকে খেয়াল রাখতে হয়। অন্যথায় অ্যাসেট লায়াবিলিটি মিসম্যাচ হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা প্রতিষ্ঠানকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। পরিপালনগত ঝুঁকি রয়েছে—যেমন বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণ হচ্ছে কি না, তা খেয়াল রাখতে হয়। গ্রাহক বিনিয়োগের টাকা সঠিক খাতে ব্যবহার করছেন কি না, তার তদারকি জরুরি। তহবিল অন্য খাতে সরিয়ে নিলে বিনিয়োগ খেলাপি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। গ্রাহকের আয়-ব্যয়ের ওপর প্রভাব পড়ে ফলে বিনিয়োগ খেলাপি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। জামির মালিকানায় ত্রুটি থাকতে পারে, সে ক্ষেত্রে দক্ষ উকিলের পরামর্শ গ্রহণ করা জরুরি। এ ছাড়া মানসম্মত নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার না হলে ও ভবন নির্মাণে ত্রুটি থাকলে গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। এসব বিষয় যথাযথ খেয়াল রেখে আবাসন বিনিয়োগ করা হলে বিনিয়োগ ঝুঁকি কমানো সম্ভব। কালের কণ্ঠ।