হোমবিবিধবিশেষ কলামব্যাংক খাতে আমানতের ১০ ভাগ ধারণ করছে ইসলামী ব্যাংক

ব্যাংক খাতে আমানতের ১০ ভাগ ধারণ করছে ইসলামী ব্যাংক

ইসলামী ব্যাংক ৪০ বছরে পদার্পণ করেছে। ১৯৮৩ সালের ৩০ মার্চ কার্যক্রম শুরু করা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম ইসলামি শরিয়া ব্যাংক এটি। প্রায় ১ লাখ ৪০ কোটি টাকা আমানতের এই বিশাল ব্যাংক এখন পুরো ব্যাংক খাতের নেতৃত্ব দিচ্ছে।

আরও দেখুন:
খরচ ছাড়াই ইসলামী ব্যাংক থেকে বিকাশে টাকা পাঠান
ইসলামী ব্যাংক এখন দেশের ব্যাংক খাতের মেরুদণ্ডঃ মুনিরুল মওলা
ইসলামী ব্যাংক লোগোর অন্তর্নিহিত মর্মবাণী

সম্প্রতি একটি দৈনিক পত্রিকার সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা। এ সময় ইসলামী ব্যাংকের অভাবনীয় সাফল্য এবং অগ্রগতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরার পাশাপাশি পুরো ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নানা সমস্যা এবং সম্ভাবনা নিয়েও কথা বলেন তিনি।

টেকনো ইনফো বিডি‘র প্রিয় পাঠক: প্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও চাকরির গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ টেকনো ইনফো বিডি তে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন।

সাংবাদিক: ইসলামী ব্যাংকের আমানত কত এবং এর সুরক্ষা সম্পর্কে বলুন।

মুনিরুল মওলা: জাতি ও ব্যক্তিস্বার্থে ইসলামী ব্যাংক জনগণকে সঞ্চয়ে উৎসাহিত করে। কারণ এখানে সাধারণ মানুষের জমানো আমানত মুনাফাসহ ফেরত পাওয়ার শতভাগ নিশ্চয়তা রয়েছে। দেশে ব্যাংক খাতে আমানতের ১০ ভাগ ধারণ করছে ইসলামী ব্যাংক। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের আমানতের অঙ্ক ১ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। যা পুরো ব্যাংক খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ। মানুষকে শরিয়া ভিত্তিতে আর্থিক সক্ষমতার আওতায় আনতে ইসলামী ব্যাংকের রয়েছে মুদারাবা হজ সঞ্চয় প্রকল্প। অভাবী ও বঞ্চিত মানুষের কল্যাণে রয়েছে ক্যাশ ওয়াক্ফ হিসাব। নারীর ক্ষমতায়নে পুরুষদের জন্য আছে দেনমোহর জমা হিসাব। এই প্রত্যেকটি হিসাবের জন্য অন্যান্য হিসাবের তুলনায় মুনাফার বেশি ওয়েটেজ দেওয়া হয়।

সাংবাদিক: ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ কত এবং দেশের অর্থনীতিতে এর অবদান কেমন?

মুনিরুল মওলা: দেশের অর্থনীতির টেকসই উন্নয়ন, মানুষের মৌলিক প্রয়োজন, জনকল্যাণসহ সার্বিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে ইসলামী ব্যাংক অগ্রাধিকার দেয়। জাতীয় অর্থনীতির প্রধান দুই স্তম্ভ প্রবাসী রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক শিল্প উন্নয়নে ইসলামী ব্যাংক পথিকৃৎ। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের

বিনিয়োগের অঙ্ক ১ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। যা ব্যাংক খাতে ঋণ বা বিনিয়োগের ৯ শতাংশ এবং পুরো খাতে সর্বোচ্চ।

সাংবাদিক: করোনা সংকট নিরসনে ইসলামী ব্যাংকের ভূমিকা কেমন ছিল?

মুনিরুল মওলা : করোনায় পুরো বিশ্ব কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। দেশ এ সময়ে আর্থিক এবং স্বাস্থ্য সংকটে ছিল। এ সময়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনা তহবিল ব্যবসায়ীদের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বড় ধরনের অবদান রেখেছে। ইসলামী ব্যাংক বিনিয়োগ করেছে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় শতভাগ।

সাংবাদিক: ইসলামি ব্যাংক গ্রাহকের আস্থা কতটা অর্জন করতে পেরেছে?

মুনিরুল মওলা: ইসলামী ব্যাংক গ্রাহকের পুরোপুরি আস্থার ব্যাংকে রূপান্তরিত হয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহক সংখ্যা ১ কোটি ৬০ লাখ, যা দেশের ব্যাংকিং গ্রাহকের ১৭ শতাংশ। ২০১৫ সালে এই সংখ্যা ১ কোটি অতিক্রম করে। ইসলামী ব্যাংক সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ ব্যাংকিং সেবাসহ ৬ হাজারের বেশি ইউনিট নিয়ে সারা দেশে বিস্তৃত এই ব্যাংক শ্রেণি-পেশা, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের অনন্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বিশ্বে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের মোট গ্রাহকের এক-চতুর্থাংশই এককভাবে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের।

সাংবাদিক: আমদানি-রপ্তানিতে ইসলামী ব্যাংকের অবদান কেমন?

মুনিরুল মওলা: দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক। আমদানি বিকল্প ও রপ্তানি প্রণোদনা খাতে ইসলামী ব্যাংকের অবদান উল্লেখযোগ্য। ২০২১ সালে ইসলামী ব্যাংক আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্য করেছে যথাক্রমে ৬৪ হাজার কোটি ও ৩৪ হাজার কোটি টাকা। দেশের আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যে ইসলামী ব্যাংকের মার্কেট শেয়ার যথাক্রমে ১১.৪% ও ৮%। অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রায় ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগের অঙ্ক স্থানীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। পাঁচ শতাধিক বিদেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকের করেসপন্ডেন্ট সম্পর্ক রয়েছে।

সাংবাদিক: প্রবাসী আয়ে ইসলামী ব্যাংকের ভূমিকা কেমন?

মুনিরুল মওলা: ২০২১ সালে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে ৫১ হাজার কোটি টাকা প্রবাসী আয় এসেছে। যা দেশের ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী রেমিট্যান্সের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ইসলামী ব্যাংক প্রতিদিন প্রায় ৬০ হাজার গ্রাহকের কাছে গড়ে ১৩৮ কোটি টাকার রেমিট্যান্স পৌঁছে দিচ্ছে। এছাড়া ইসলামী ব্যাংকের সেলফিন অ্যাপের মাধ্যমে রেমিট্যান্স গ্রহণকারী নিজেরাই সরাসরি রেমিট্যান্স গ্রহণ করতে পারেন। গ্রাহকরা দেশের বাইরে থেকেই ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন করতে পারেন।

সাংবাদিক: অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিল্পায়নে কতটা সফল ইসলামী ব্যাংক?

মুনিরুল মওলা: দেশে ৬ হাজারের বেশি শিল্পকারখানা ইসলামী ব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। এক হাজারের বেশি গার্মেন্টস শিল্প পরিচালিত হচ্ছে ব্যাংকের অর্থায়নে। গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল, স্পিনিং মিল, স্টিল রি-রোলিং, লোহা ও ইস্পাত শিল্প, বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ নানাবিধ ভারী শিল্পকারখানায় ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ রয়েছে। শিল্পখাতে ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। ইসলামী ব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত শিল্পকারখানার মাধ্যমে দেশের ২৫ লাখের বেশি বেকার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

সাংবাদিক: এসএমই ও কৃষিখাতে ইসলামী ব্যাংকের ভূমিকা কেমন?

মুনিরুল মওলা: ইসলামী ব্যাংক দেশের সর্বোচ্চ এসএমই বিনিয়োগকারী ব্যাংক। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের এসএমই গ্রাহক সংখ্যা দুই লাখ। ২০২১ সালে ব্যাংকের এসএমই বিনিয়োগের অঙ্ক ছিল ২৬ হাজার কোটি টাকা। যা দেশের মোট এসএমই বিনিয়োগের ১১ শতাংশ। এছাড়া ২০২১ সালে কৃষি খাতে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার গ্রাহককে বিনিয়োগ করেছে ইসলামী ব্যাংক। ইসলামী ব্যাংকের অর্থায়নে গড়ে উঠেছে ২ হাজারের বেশি কৃষিভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ইসলামী ব্যাংকের অর্থায়নে ২৮টি পাটকল পরিচালিত হচ্ছে।

সাংবাদিক: ব্যাংক খাত সম্পর্কে কিছু বলুন।

মুনিরুল মওলা: ব্যাংক খাতে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। এক ব্যাংকের গ্রাহককে প্রলোভন দেখিয়ে ভাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে অন্য ব্যাংক। এটা ভালো লক্ষণ নয়। এছাড়া কয়েকটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেশি, এটা সত্য। সেটা সহনীয় পর্যায়ে কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। ঝুঁকি এড়াতে সিন্ডিকেশন লোনের দিকে যেতে পারে ব্যাংকগুলো। বিশেষ করে বড় অঙ্কের ঋণের ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য। ব্যাংক খাতে সুশাসন যা আছে, তা যথেষ্ট নয়।

সাংবাদিক: অনেক ব্যাংকের আমানত আটকে আছে নন ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাতে। এর থেকে উত্তরণের পথ কী?

মুনিরুল মওলা: হ্যাঁ, অনেক ব্যাংকের আমানত আটকে আছে নন ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে। খাতটিতে বেশ কিছু সমস্যাও বিরাজমান। এর সমাধানের পাশাপাশি টাকা আদায়ে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

সাংবাদিক: দেশের ইসলামী ব্যাংকের সংখ্যা বাড়ছে। অনেক ব্যাংক পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকে রূপান্তরিত হতে চায়, না পেরে বেশিরভাগ ব্যাংকই শাখা বা উইন্ডো চালু করেছে-এটাকে কীভাবে দেখছেন?

মুনিরুল মওলা: নিঃসন্দেহে এটা ভালো উদ্যোগ। ইসলামী ব্যাংকের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে এখন দেশে ১০টি ব্যাংক পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকিং পরিচালনা করছে। সার্বিকভাবে দেশের মোট ব্যাংকিংয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এখন ইসলামি পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে। যার হার উত্তরোত্তর বাড়ছে।

এ সম্পর্কিত আরও দেখুন

Leave a Reply

এ সপ্তাহের জনপ্রিয় পোস্ট

সর্বশেষ পোস্ট