২০২১-২২ অর্থবছরে রফতানির আয়ের ৮ শতাংশ এনেছে ইসলামী ব্যাংক

দেশের রফতানি খাতের সবচেয়ে বড় অংশীদার ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। ২০২১-২২ অর্থবছরে ইতিহাস সৃষ্টি করা পণ্য রফতানির অন্তত ৮ শতাংশ হয়েছে বেসরকারি খাতের ব্যাংকটির মাধ্যমে। উদ্যোক্তা তৈরি, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রফতানির ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা রাখছে ব্যাংকটি। এ নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন দেশের সর্ববৃহৎ ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাছান আদনান

দেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান তৈরিতে ইসলামী ব্যাংকের ভূমিকা কী?

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের যাত্রা ১৯৮৩ সালে। ওই সময় দেশের রফতানি খাত ছিল খুবই সীমিত। পাট, চামড়াসহ অল্প কিছু পণ্য তখন বিদেশের বাজারে বাংলাদেশ রফতানি করত। রফতানি আয়ে তৈরি পোশাক খাতের অবদান ছিল খুবই সীমিত। সেই সময় দেশের উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছিল কেবলই হাতেগোনা। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ইসলামী ব্যাংক উদ্যোক্তা তৈরি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্পায়নে জোর দিয়ে কার্যক্রম শুরু করে। আমাদের ব্যাংকের হাত ধরে গড়ে ওঠে একঝাঁক প্রতিশ্রুতিশীল শিল্প উদ্যোক্তা, যারা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অনবদ্য অবদান রেখে চলেছেন। বিশেষ করে দেশের তৈরি পোশাক খাতের ভিত্তি তৈরি হয়েছে আমাদের ব্যাংকের বিনিয়োগের মাধ্যমে।

দেশের তৈরি পোশাক খাতের বিকাশে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র বা এলসি। ব্যতিক্রমধর্মী এ ঋণপত্রের প্রবর্তন ও জনপ্রিয় করে তুলতে ইসলামী ব্যাংকই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। দেশের অনেক বৃহৎ শিল্প উদ্যোক্তা এ ব্যাংকে এসেছিলেন একেবারেই শূন্য হাতে, পায়ে হেঁটে কিংবা রিকশায় চড়ে। ইসলামী ব্যাংকের সহায়তায় তারা শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন। এ ব্যাংকের বিনিয়োগে দেশে প্রায় ৮০ লাখের বেশি মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে। বর্তমানে দেশে ছয় হাজারের বেশি শিল্প-কারখানা এবং দুই হাজারের বেশি কৃষিভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান এ ব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। দেশের মোট এসএমই বিনিয়োগের ১১ শতাংশ এককভাবে ধারণ করে ইসলামী ব্যাংক গড়ে তুলেছে প্রায় তিন লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। আমাদের গড়ে তোলা উদ্যোক্তারা দেশের রফতানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

টেকনো ইনফো বিডি‘র প্রিয় পাঠক: প্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও চাকরির গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ টেকনো ইনফো বিডি তে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন।

দেশের রফতানি আয়ে ইসলামী ব্যাংকের অংশগ্রহণ কতটুকু?

প্রতিষ্ঠার পরের বছর তথা ১৯৮৪ সালে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে রফতানি হয়েছিল মাত্র ৬ কোটি ৪০ লাখ টাকার পণ্য। বিপরীতে ২০২১ সালে আমাদের ব্যাংকের মাধ্যমে ৩০ হাজার ১৭৮ কোটি টাকার পণ্য রফতানি হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই আমাদের ব্যাংকের মাধ্যমে রফতানি ১৮ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে শুধু জুনেই রফতানি হয়েছে ৩ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকার পণ্য। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠার পর থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে ৩ লাখ ৪১ হাজার ২৬২ কোটি টাকার পণ্য রফতানি হয়েছে। দেশে ৬১ ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করলেও বর্তমানে দেশের মোট রফতানি আয়ের ৮-১০ শতাংশ এ ব্যাংকের মাধ্যমে আসছে।

ইসলামী ব্যাংকের হাত ধরে গড়ে উঠে রফতানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এমন প্রতিষ্ঠান কোনগুলো?

দেশের শীর্ষস্থানীয় রফতানি প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি নাসা গ্রুপ। এ শিল্প গ্রুপটির যাত্রা হয়েছিল কেবল ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগে। ইয়ুথ গ্রুপ, জাবের অ্যান্ড যুবায়ের গ্রুপ, রাজ কামাল ফুড প্রডাক্টস, এনজেড টেক্সটাইল লিমিটেড, মাল্টিটেক্স নিট কম্পোজিট, এনইও বাংলা লিমিটেড, সিয়াম কম্পিউটারাইজড ইলাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, জামান ফ্যাশনওয়্যার লিমিটেডের মতো শিল্প গ্রুপগুলো ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগে গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠান দেশের রফতানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ ১০ রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানতে চাই?

দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশির ভাগ রফতানিকারকই কোনো না কোনোভাবে ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে সম্পৃক্ত। চলতি বছরে আমাদের ব্যাংকের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি পণ্য রফতানি করা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো জিএমএস কম্পোজিট নিটিং, জাবের অ্যান্ড যুবায়ের ফ্যাব্রিক্স, নোমান কম্পোজিট টেক্সটাইল, আকিজ টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, তাকওয়া ফ্যাব্রিক্স লিমিটেড, এ জে সুপার গার্মেন্টস লিমিটেড, আকিজ জুট মিলস লিমিটেড, স্টারলিং স্টাইলস লিমিটেড, এমএস ফখরুদ্দিন টেক্সটাইল এবং বসুন্ধরা মাল্টি ফুড। তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংক রফতানিমুখী পাট, কৃষি, চামড়াসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করেছে।

দেশের রফতানি খাত বর্তমানে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে কেন্দ্রীভূত। রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনার জন্য ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোগ কী?

বাংলাদেশের রফতানি খাতকে আরো সমৃদ্ধ করতে হলে রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে। রফতানির ক্ষেত্রে নতুন নতুন খাত উদ্ভাবনের জন্য ইসলামী ব্যাংক স্টার্টআপ চালু করেছে। পাট রফতানি না করে পাটজাত পণ্য রফতানিতে জোর দিলে রফতানি আয় বাড়বে। একইভাবে কাঁচা চামড়া রফতানি না করে চামড়াজাত পণ্য তৈরি করতে পারলে এ খাতের আয় বাড়বে। পণ্য তৈরিতে অবশ্যই গুণগত মানের বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া দরকার। দেশের খুলনা ও যশোর অঞ্চলে ছোট ছোট অনেক এসএমই প্রতিষ্ঠান আছে। ওইসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রফতানি হয়। ইসলামী ব্যাংক খুঁজে খুঁজে বৈচিত্র্যপূর্ণ পণ্য উৎপাদন ও রফতানিতে বিনিয়োগ করছে। একই সঙ্গে দক্ষ জনবল তৈরিতেও আমরা বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছি।

আরও দেখুন: আমদানিতে শতভাগ নগদ মার্জিন, মিলবে না কোনো ঋণ

শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি বিদেশে পাঠাতে পারলে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ অনেক গুণ বেড়ে যেত। কিন্তু আমরা এক্ষেত্রে এখনো অনেক পিছিয়ে আছি। দেশে দক্ষ জনবল তৈরিতে ইসলামী ব্যাংক বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ, একটি হেলথ টেকনোলজি ইনস্টিটিউট, একটি ডিপ্লোমা নার্সিং ইনস্টিটিউট, ছয়টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাতটি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমরা পরিচালনা করছি। বিদেশে দক্ষ নার্সসহ স্বাস্থ্য খাতের কর্মীদের বিপুল চাহিদা রয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button