ব্যাংকাররা কি করোনা জয়ী?

0

কোভিড-১৯ তথা করোনা ভাইরাসের প্রকোপে সারা পৃথিবীর মানুষের সাধারণ জীবনযাত্রা থমকে গেছে। তেমনিভাবে থমকে গেছে আমাদের ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কি.মি. এর ছোট্ট দেশটির মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাত্রাও। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ সকল সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে করোনা পরিস্থিতি বিবেচনা করে। সকল সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ছুটি পেলেও ছুটি মেলেনি পুলিশ, ব্যাংকার ও ডাক্তারদের।

সারাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সহ করোনা কালীন সময়ে লকডাউন বাস্তবায়ন থেকে শুরু করে অন্যান্য বহুবিদ কাজের জন্য পুলিশ বাহিনীকে প্রয়োজন। তেমনিভাবে দেশের এই দূর্যোগপূর্ণ সময়ে সবচেয়েবেশী প্রয়োজন ডাক্তারদের, তারাই এই সময়ের করোনা বিরোধী লড়াইয়ের প্রকৃত সৈনিক। যদিও করোনা বিরোধী যুদ্ধে এখনো তাদের নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যাবস্থা সরকার নিশ্চিত করতে পারে নি। তবুও তারা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা সেবা প্রদান করে যাচ্ছেন।

এই সময়ে জনগণের অর্থের লেনদেন যাতে নির্বিঘ্ন হয়, তাই সরকার বাংলাদেশের সকল ব্যাংক বিশেষ করে সরকারী ব্যাংকগুলো খোলা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে করোনা পরিস্থিতি যখন অবনতির দিকে যাচ্ছে, সময়ের সাথে সাথে যখন করোনায় আক্রান্ত রোগীদের পরিমাণ বেড়েই চলেছে, এই অবস্থায় সরকার বিভিন্ন জেলা লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেয়। একে একে লকডাউন হতে থাকে বিভিন্ন জেলা। তবে এসব জেলায় অবস্থিত ব্যাংকগুলো সম্পর্কে কোন নির্দেশনা দেয়া হয় নি।

যার ফলে লকডাউন চলাকালীন সময়েও ব্যাংক খোলা রাখায় ফলে ব্যাংকাররা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েই অফিসে যেতে বাধ্য হয়েছেন। পথে পথে তারা বিভিন্ন যায়গায় পুলিশ কর্তৃক হয়রানিরও স্বীকার হয়েছেন এখন খবরও পাওয়া যাচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আমার পরিচিত এক ব্যাংক কর্মকর্তা আমাকে বললেন, “যদিও লকডাউন চলছে, কিন্তু বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এর আমাদের শাখাটি খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। যার ফলে আমরা বাধ্য হয়ে লকডাউন অমান্য করে ব্যাংকে যাওয়ার জন্য রওয়ানা হলাম। বিভিন্ন যায়গায় পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে একটি সিএনজিতে করে ব্যাংকে যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে পুলিশের একটি টহল গাড়ি আমাদের ধাওয়া করলে আমাদের সিএনজিটির ড্রাইভার দ্রুত চালিয়ে আমাদের দুই কিলোমিটার দূরের একটি গ্রামে নিয়ে আসে। সেখানে আমরা একটি বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিই। একদিকে লক ডাউনের ফলে বের হওয়া নিষেধ, এর মধ্যে অফিস খোলা। এভাবে কি আর অফিস করা যায়?”

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে লকডাউনকৃত এলাকায় সকল ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তবে লক ডাউনের মধ্যেও রোববার থেকে স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে বন্ধ শাখাগুলো খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকারী ব্যাংকগুলো। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে বিভিন্ন শাখার ব্যাবস্থাপকদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এখন আমার প্রশ্ন হলো, তখনি একটি জেলা বা অঞ্চল লকডাউন করা হয়, যখন সে জেলা বা অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ করোনা রোগী পাওয়া যায় এবং সেসব যায়গায় করোনা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। এখন এই অবস্থায় কি কোন গ্রাহক লেনদেনের জন্য ব্যাংকে যাবেন, যেখানে রাস্তায় রাস্তায় কড়া পুলিশি প্রহরা চলছে?

আর এইসব ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে যেখানে সাধারণ মানুষকে ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করা হচ্ছে, সেখানে ব্যাংকারদের অফিস করতে বাধ্য করার মাধ্যমে কি তাদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলা হচ্ছে না?

আর তারা অফিসে যাওয়ার জন্য বের হলেও তো নানা যায়গায় পুলিশি বাধা ও হয়রানির মুখে পড়ছে, আর লকডাউনের সময় তো রাস্তায় গাড়ি-ঘোড়াও চলছে না; এই অবস্থায় সঠিক সময়ে অফিসে গিয়ে সুষ্ঠুভাবে কাজ করা কি আদৌ সম্ভব?

আচ্ছা, তর্কের খাতিরে না হয় ধরেই নিলাম যে, লকডাউন হলেও গ্রাহকরা লকডাউন অমান্য করেই লেনদেন করতে এলেন। কিন্তু এই অবস্থায় লেনদেনের ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাটা কি সম্ভব হচ্ছে? তাছাড়া, ব্যাংকগুলোতে লেনদেনের জন্য নানা ধরণের মানুষ ভীড় জমান। এতে করে মানুষের মধ্যে যেমন করোনা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে, তেমনিভাবে ব্যাংকে কর্মরত মানুষগুলোরও তো করোনায় আক্রান্তের ঝুঁকিটা থেকে যায়।

ইতোমধ্যে কিছু কিছু ব্যাংকার করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবর শোনা যাচ্ছে। এর মধ্যে অগ্রনী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখায় এক ব্যাংক কর্মকর্তা করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর পুরো শাখাই লকডাউন করে দিয়ে উক্ত শাখায় ৬২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে।

ব্যাংকে যারা কর্মরত আছেন, তারাও তো মানুষ। দিনশেষে প্রত্যেকেই তাদের বাড়িতে ফিরে যান, লকডাউনকৃত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা সমূহে যেহেতু করোনা আক্রান্তের ঝুঁকি বেশি থাকে, তাই তারা আক্রান্ত হলে তাদের দ্বারা তাদের পরিবারের মানুষগুলোও আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়।

বেঁচে থাকার অধিকার সবারই আছে, তাই সরকারের উচিৎ হবে অন্তত লকডাউনকৃত এলাকাসমূহে ব্যাংকের শাখা সমূহ বন্ধ রাখা।

লেখক: জোহেব শাহরিয়ার, আলাপন ব্লগ।

Leave a Reply