টিআইবিঃ বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি ঘরেই গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে আমরা যারা এমন সব এলাকায় থাকি যেখানে গ্যাসের লাইন নেই। এছাড়াও অনেকেই বাসায় ব্যাক-আপ হিসেবে গ্যাস সিলিন্ডার রাখেন, যাতে গ্যাসের লাইনে সমস্যা হলে সেটা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়া যায়।

সিলিন্ডারের ব্যাপক মাত্রায় ব্যবহার এবং মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় অকালে অনেকগুলো প্রাণ ঝরে পরার ঘটনায় আমাদের আজকের পোস্ট গ্যাস সিলিন্ডারের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিতকরণে আপনার ভূমিকা।

আজকের দিনে গ্যাস সিলিন্ডার প্রায় সব রকম শিল্প এবং জায়গায় নিয়মিত ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কেননা এর সুবিধা ও কার্যকারিতা অন্যান্য বিকল্পগুলোর তুলনায় অনেক বেশি, যেমন- সাশ্রয়ী দাম, গতিশীলতা, পরিবেশ বান্ধব গুণাবলী, কম মাত্রায় দূষণ ইত্যাদি। ফসিল ফুয়েল এবং কার্বন নির্গমন জাতীয় জ্বালানীর বিপরীতে এটি বর্তমানে অন্যতম এক বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ছবি: গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারকারীদের জন্য আবশ্যক।

কিন্তু এই দারুণ বিকল্প জ্বালানীর সাথে জড়িত বিপর্যয়ের সংখ্যাও অনেক বেড়ে গেছে আজকাল। এই দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই ঘটার পেছনে অন্য যেকোন কারণের চেয়ে অজ্ঞতা, অবহেলা এবং অসচেতন ব্যবহারই সবচেয়ে বেশি দায়ী।

গ্যাস সিলিন্ডার কেনার সময় লক্ষণীয় বিষয়সমূহ:

গ্যাস সিলিন্ডার কেনার সময় অনুমোদিত বিক্রেতাদের কাছ থেকেই পণ্য কেনা উচিত। এছাড়াও আপনাকে এটাও খেয়াল করে দেখতে হবে যেন সিলিন্ডারগুলো সার্টিফাইড প্রস্তুতকারক কোম্পানির দ্বারা তৈরি হয়।

অতএব গ্যাস সিলিন্ডার কেনার সময় নিম্নোক্ত বিষয়গুলো নিশ্চিত করে নেয়ার চেষ্টা করুনঃ

  • নিশ্চিত করুন সিলিন্ডারে কোম্পানির সিল রয়েছে কি না।
  • নিশ্চিত করুন যে সিলিন্ডারটির সেফটি ক্যাপটি সুরক্ষিত ভাবে লাগানো রয়েছে কি না।
  • বিক্রেতা কিংবা ডেলিভারি ম্যানকে সিলিন্ডারের যথাযথ ব্যবহার বিধি ও ম্যানুয়াল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে দ্বিধা করবেন না।
  • ভূমির সমতলে সমান ও শুষ্ক জায়গায় সিলিন্ডারটি রাখুন।
  • সিলিন্ডারটি টানা হেঁচড়া করবেন না, মাটিতে গড়াবেন না কিংবা ফেলে দেবেন না। এগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিশেষজ্ঞরা বিশেষ ভাবে নিষেধ করে থাকেন।
  • শুধুমাত্র অনুমোদিত বিক্রেতাদের কাছ থেকে সব সময় কেনার চেষ্টা করুন।

অনুমোদন ছাড়া, সার্টিফিকেশন ছাড়া কিংবা অন্য কোন উপায়ে অবৈধ হওয়া বিক্রেতাদের কাছ থেকে সস্তায় সিলিন্ডার কেনা আপনার ও আপনার আশেপাশের মানুষদের জীবনে বিপদ ডেকে আনার শামিল।

গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের আগে ও পরের নিরাপত্তা টিপস:

আপনি যদি গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারকারী হন কিংবা এমন কোন জায়গার আশেপাশে বসবাস করে থাকেন যেখানে এটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে, তাহলে নিচে উল্লেখিত নিরাপত্তা টিপসগুলো প্রয়োগ করা এবং অন্যদের জানানো আপনার জন্য খুবই জরুরি-

  • সবসময় যেকোন ধরণের গন্ধ বা গ্যাস লিক হওয়ার যেকোন লক্ষণীয় চিহ্নের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন।
  • সিলিন্ডারে লিকেজ খোঁজার সময় মোমবাতি কিংবা ম্যাচের কাঠি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।
  • সব সময় গ্যাস সিলিন্ডারের উপরের মুখটি উপরের দিকে রেখে সোজা ভাবে একটি সমতল ভূমিতে রাখুন কিংবা সংরক্ষণ করুন।
  • কোন বদ্ধ ক্যাবিনেট নয়, সব সময় যথাযথ বায়ু চলাচল করে এমন জায়গায় সিলিন্ডারটি রাখুন।
  • আগুন, বিদ্যুৎ এবং তাপের যেকোন রকম উৎস থেকে সিলিন্ডারকে দূরে রাখুন।
  • ব্যবহার শেষে প্রত্যেক বার সুইচ অফ করে রাখুন।
  • খালি সিলিন্ডারগুলো একটি শীতল ও খোলামেলা জায়গায় সংরক্ষণ করুন এবং খেয়াল রাখুন যেন সেফটি ক্যাপ লাগানো থাকে।
  • আপনার ম্যাচের কাঠি কিংবা আগুনের উৎস সব সময় সিলিন্ডার গ্যাস চালু করার আগে জ্বালিয়ে নিন।
  • সিলিন্ডারের বিভিন্ন কানেকশন ও রাবার টিউব ইত্যাদি প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করুন।

গ্যাস লিকের ঘটনা ঘটলে করণীয়:

আপনি যদি কখনও গ্যাস লিকের ঘটনার মত একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সম্মুখীন হন, তখন নিচের জরুরী টিপস গুলো মেনে চলার চেষ্টা করুন-

  • আতঙ্কিত হবেন না।
  • শান্ত থাকুন, মাথা ঠাণ্ডা রাখুন এবং নিজেকে সামলে নিন।
  • কোথাও লিক হয়েছে এমন সন্দেহ হলে যে কোন ধরণের ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী বা বিস্ফোরক পণ্য চালু করা থেকে বিরত থাকুন।
  • সব ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী বন্ধ করে ফেলুন এবং যেকোন ধরণের শিখা, লাইট, ধূপ কাঠি, মোমবাতি ইত্যাদি নিভিয়ে ফেলুন।
  • সিলিন্ডার কানেকশন বন্ধ করে দিন এবং সেখানে সেফটি ক্যাপ পরিয়ে দিন।
  • বাতাস ভালোভাবে চলাফেরা করার জন্য প্রত্যেকটি জানালা ও দরজা খুলে দিন, কিন্তু সব গুলো ফ্যান বন্ধ করে রাখুন।
  • ফায়ার সার্ভিস ও পার্শ্ববর্তী থানার সাথে যোগাযোগ করুন অথবা ৯১১ এ ডায়াল করুন।

দূর্ঘটনা প্রতিরোধে সহজ ও কার্যকরী গ্যাস সিলিন্ডার নিরাপত্তামূলক টিপস:

অপ্রত্যাশিত দূর্ঘটনা এড়াতে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে সহজ ও কার্যকরী কিছু টিপস মাথায় রাখা উচিত নিচে উল্লেখ করা হলো-

  • আপনার গ্যাস সিলিন্ডারটি এবং এর সাথে ব্যবহার হওয়া নানা রকম সামগ্রীর নিয়মিত ও যথাযথ সার্ভিসিং করানো হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করে নিন। হয়ত সেগুলোতে কোন সমস্যা নাও থাকতে পারে। তারপরও যেকোন দুর্ঘটনা ঘটে যেতেই পারে। অনেক ক্ষেত্রে এমন ঘটে যে সহজ ও দ্রুত কিছু রক্ষণাবেক্ষণ পদ্ধতি অবলম্বন করার কারণে মারাত্মক ও প্রাণঘাতী বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
  • গ্যাস সিলিন্ডার, ইলেকট্রনিক্স কিংবা গ্যাসের পণ্যসামগ্রী কেনার সময় অরিজিনাল ও ভালো মানের পণ্য দেখে কিনুন।
  • নিশ্চিত জানেন না বা পারেন না এমন কোন কাজ কখনওই একা হাতে করতে যাবেন না, যেমন- কীভাবে সিলিন্ডার সংযোগ দেয়া বা বিচ্ছিন্ন করতে হয় ইত্যাদি।
  • আপনার কুকার কিংবা রান্নাঘরে চুলার কাছাকাছি কোন  জানালায় পর্দা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। ব্যক্তিগত প্রয়োজন বা গোপনীয়তা রক্ষা করার আরো বিভিন্ন ধরণের উপায় রয়েছে, যেগুলোতে সহজে আগুন ধরবে না।
  • কেরোসিন বা এই জাতীয় অন্যান্য যেকোন দাহ্য বস্তু গ্যাস সিলিন্ডার বা চুলার কাছাকাছি রাখবেন না।
  • সেফটি ক্যাপটি স্থায়ীভাবে খুলে না ফেলাই ভালো। কেননা যেকোন ধরণের লিকের ঘটনা ঘটলে এটি ব্যবহার করা যায়।
  • ব্যবহারের পর সব সময় সিলিন্ডারটি বন্ধ করে ফেলুন এবং ঠিক ভাবে বন্ধ হয়েছে কি না তা আবারো চেক করে নিন।
  • কখনওই, কোন অবস্থাতেই আতঙ্কগ্রস্ত হবেন না! শান্তভাবে, ভেবে চিন্তে সব রকম সিদ্ধান্ত নিন।
  • জরুরী অবস্থা মোকাবেলা করার জন্য ইমারজেন্সি ফোন নাম্বার নাগালের মধ্যে রাখুন।
  • বিভিন্ন ধরণের ইমারজেন্সির ক্ষেত্রে আপনার বাসা, বিশেষ করে রান্নাঘরের মধ্যে নিরাপত্তামূলক বিভিন্ন ধরণের যন্ত্রপাতি, যেমন- গ্যাস ডিটেক্টর, অগ্নি নির্বাপক ইত্যাদি কিনে রাখুন।

এত সব নিরাপত্তামূলক টিপসের পেছনে মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে যেন আপনি যেকোন ধরণের দুর্ঘটনা ঘটার আগেই সেগুলো ঠেকাতে পারেন। আর যদি দুর্ঘটনা ঘটেই যায়, তাহলে নিজের ও নিজের আশেপাশের মানুষগুলোর নানা রকম ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনতে পারেন।

শেষকথা, একদিকে যেমন সরকার ও বিভিন্ন প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো এই সব পণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন, অন্যদিকে আমাদেরও উচিত এই পণ্যগুলোর যথাযথ ব্যবহার সম্পর্কে জানা ও মানা। এতে করে যেকোন সময় সম্ভাব্য দুর্ঘটনা বা বিপর্যয় যথাসম্ভব কমিয়ে আনা সম্ভব। সূত্রঃ বিক্রয় ডট কম থেকে সংগৃহীত ও পরিমার্জিত।

Leave a Reply