করযোগ্য আয় বের করার সহজ নিয়ম

0
306

আয়কর হচ্ছে ব্যক্তি বা সত্ত্বার আয় বা লভ্যাংশরে উপর প্রদেয় কর। নিয়মানুযায়ী যাদের বেসিক ১৬,০০০ টাকা বা তদুর্ধ্ব তাদের সবাইকে প্রতিবছর ৩০ নভেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করতে হয়।

এখানে মনে রাখতে হবে যে রিটার্ন দাখিল করা আর ইনকাম ট্যাক্স বা আয়কর পরিশোধ করা দুটি এক জিনিস নয়। ১৬,০০০ টাকা বেসিক এর আওতাধীন সবাইকে রিটার্ন দাখিল করতে হবে এটা সত্য কিন্তু তাদের আয় যদি করসীমা অতিক্রম না করে তাহলে আয়ের উপর আয়কর বা ইনকাম ট্যাক্স দিতে হবে না। শুধুমাত্র রিটার্ন দাখিল করলেই চলবে। আয় যদি করসীমা অতিক্রম করে তাহলেই কেবল আয়কর দিতে হবে। আর এই করযোগ্য আয় কিভাবে বের করবেন সেই বিষয়েই আজকের এই লেখা। চলুন জেনে নেই কিভাবে করযোগ্য আয় বের করতে হয়।

আয়কর হিসাব করার ৫টি সহজ ধাপ রয়েছে। নিচে ধারাবাহিক ভাবে ধাপগুলো আলোচনা করা হলো:

প্রথম ধাপঃ করযোগ্য আয় বের করুন

Basic Salary: পুরোটাই করযোগ্য আয়।
Bonus (Eid Bonus/Incentive Bonus): পুরোটাই করযোগ্য আয়।
বাসা ভাড়া: Basic Salary এর ৫০% বা বছরে ৩ লক্ষ টাকা- এই দুইয়ের মধ্যে যেটি কম, সেই পরিমাণ অর্থের উপর কর দিতে হবেনা। কাজেই করযোগ্য আয় নিরূপনের সময় আপনার প্রাপ্ত বাসা ভাড়া থেকে সেই পরিমাণ অর্থ (অর্থাৎ Basic Salary এর ৫০% বা বছরে ৩ লক্ষ টাকা- এই দুইয়ের মধ্যে যেটি কম) বাদ দিয়ে করযোগ্য আয় বের করতে হবে।
চিকিৎসা ভাতা: Basic Salary এর সর্বোচ্চ ১০% বা বাৎসরিক ১,২০,০০০ টাকা এই দুয়ের মধ্যে যেটি কম, তা আমার প্রাপ্ত চিকিৎসা ভাতা থেকে বাদ দিয়ে করযোগ্য আয় বের করতে হবে।
যাতায়াত ভাতা (যারা গাড়ী সুবিধা পান না): বাৎসরিক সর্বোচ্চ ৩০,০০০ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত অর্থাৎ আমার প্রাপ্ত যাতায়াত ভাতা হতে ৩০,০০০ টাকা বাদ দেয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকবে তা আমার করযোগ্য আয়।
যাতায়াত ভাতা (যারা গাড়ী সুবিধা পান): আমি যেই পরিমাণ অর্থই পাইনা কেন, আমার বেসিক স্যালারীর ৫% অথবা বাৎসরিক ৬০,০০০ টাকা – এ দুইয়ের মধ্যে যেটি সর্বোচ্চ- তা আমার করযোগ্য আয় হসেবে বিবেচিত হবে।
প্রভিডেন্ড ফান্ড (যদি অনুমোদিত হয়): শুধুমাত্র নিয়োগকর্তার অংশ করযোগ্য আয় হিসেবে গণ্য করতে হবে।
✰✰ উপরিউক্ত আয়ের বাইরে অন্য যেকোন আয় যেমন বিনোদন ভাতা, বাৎসরিক ছুটির সাথে প্রাপ্য ভাতা, ওভার টাইম, হাউজ মেইনটেন্যান্স ভাতা, সুদ আয়, ইত্যাদি আয় ১০০% করযোগ্য আয়।

দ্বিতীয় ধাপঃ করযোগ্য আয়ের উপর কত টাকা আয়কর আসবে (আপনি কোনো বিনিয়োগ করিনি ধরে)

প্রথমেই আসি আপনার করমুক্ত আয়সীমা কত অর্থাৎ আপনার করযোগ্য আয় কত টাকার কম হলে আপনাকে কোনো করই দিতে হবে না:

০১. যদি আপনি ৬৫ বছরের কম বয়সী পুরুষ করদাতা হন, তাহলে আপনার জন্য করমুক্ত আয় সীমা ২.৫০ লক্ষ টাকা।
০২. যদি আপনি মহিলা করদাতা এবং আপনার বয়স ৬৫ বছর বা তদূর্ধ (নারী, পুরুষ নির্বিশেষে) হয়, তাহলে আপনার জন্য করমুক্ত আয় সীমা ৩.০০ লক্ষ টাকা।
০৩. যদি আপনি প্রতিবন্ধী হন, তাহলে আপনার জন্য করমুক্ত আয় সীমা ৪.০০ লক্ষ টাকা।
০৪. যদি আপনি গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হন, তাহলে আপনার জন্য করমুক্ত আয় সীমা ৪.২৫ লক্ষ টাকা।
০৫. যদি আপনার কোনো প্রতিবন্ধী সন্তান থাকে বা আপনি কোনো প্রতিবন্ধী সন্তানের অভিভাবক হন, তাহলে আপনার করমুক্ত আয়সীমা উপরের চার ক্যাটাগরির যে ক্যাটাগরিতে আপনি পরেন, তার চেয়ে আরো ২৫,০০০ টাকা বেশী হবে। যদি আপনারা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই করদাতা হন, তাহলে আপনাদের যেকোন একজন এই সুবিধা নিতে পারবেন। অর্থাৎ উপরের পাঁচ ক্যাটাগরির যে ক্যাটাগরিতেই আপনি পরেন, আপনার করযোগ্য আয়, করমুক্ত সীমার কম হলে আমাকে কোনো আয়কর দিতে হবে না।
০৬. আবার যদি আপনার করযোগ্য আয়, করমুক্ত সীমার বেশী হয়, তাহলে আপনার জন্য প্রযোজ্য যে করমুক্ত সীমা, তার উপরও আমাকে কোনো কর দিতে হবে না। আপনাকে শুধুমাত্র কর দিতে হবে, করমুক্ত সীমার উপর অতিরিক্ত যে করযোগ্য আয় আপনার আছে তার উপর।

করযোগ্য আয়ের উপর যে হারে আয়কর দিতে হবে?
i) করমুক্ত সীমা পরবর্তী ৪.০০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত করযোগ্য আয়ের উপর কর দিতে হবে ১০% হারে (শর্ত প্রযোজ্য);
ii) পরবর্তী ৫.০০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত করযোগ্য আয়ের উপর কর দিতে হবে ১৫% হারে;
iii) পরবর্তী ৬.০০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত করযোগ্য আয়ের উপর কর দিতে হবে ২০% হারে;
iv) পরবর্তী ৩০.০০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত করযোগ্য আয়ের উপর কর দিতে হবে ২৫% হারে; এবং
v) অবশিষ্ট আয়ের উপর কর দিতে হবে ৩০% হারে।

ধরা যাক, আপনি একজন ত্রিশ বছর বয়সী পুরুষ এবং আমার করযোগ্য আয় ৫৬ লক্ষ টাকা, তাহলে-
ক) ১ম ২.৫০ লক্ষ টাকার উপর কর আসবে শুন্য টাকা;
খ) পরবর্তী ৪.০০ লক্ষ টাকার উপর কর আসবে ১০% হারে ৪০,০০০ টাকা;
গ) পরবর্তী ৫.০০ লক্ষ টাকার উপর কর আসবে ১৫% হারে ৭৫,০০০ টাকা;
ঘ) পরবর্তী ৬.০০ লক্ষ টাকার উপর কর আসবে ২০% হারে ১,২০,০০০ টাকা;
ঙ) পরবর্তী ৩০.০০ লক্ষ টাকার উপর কর আসবে ২৫% হারে ৭,৫০,০০০ টাকা; এবং
চ) অবশিষ্ট ৮.৫০ লক্ষ টাকা (৫৬ লক্ষ – ২.৫০ লক্ষ – ৪ লক্ষ – ৫ লক্ষ – ৬ লক্ষ – ৩০ লক্ষ) আয়ের উপর কর আসবে ৩০% হারে ২,৫৫,০০০ টাকা। অর্থাৎ ৫৬ লক্ষ টাকা করযোগ্য আয়ের বিপরীতে আপনাকে আয়কর দিতে হবে মোট ১২.৪০ লক্ষ টাকা (যদি আপনি কোন বিনিয়োগ না করেন)।

উপরে একটি জায়গায় আমরা লিখেছি শর্ত প্রযোজ্য। শর্তটি কি? শর্তটি হচ্ছে, আপনার যদি করযোগ্য আয় থাকে, তাহলে আপনি যে ক্যাটাগরিতে পরেন, সেই ক্যাটাগরিতে আপনার আয়কর হিসাব করার পর যদি দেখা যায়, আপনার আয়কর মিনিমাম প্রদেয় আয়করের চেয়ে কম এসেছে, তাহলে আপনাকে মিনিমাম আয়করটা দিতেই হবে।

মিনিমাম আয়কর কত?
১) যদি আপনার বসবাস ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন বা ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন বা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় হয়, তাহলে ৫০০০ টাকা;
২) যদি আপনার বসবাস বাংলাদেশের অন্য যেকোনো সিটি কর্পোরেশন এলাকায় হয়, তাহলে ৪০০০ টাকা;
৩) যদি আপনার বসবাস সিটি কর্পোরেশন এলাকার বাইরে হয়, তাহলে ৩০০০ টাকা।

ধরুন, আপনি একজন ৬৫ বছরের কম বয়সী পুরুষ, আপনার বসবাস ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় এবং এই আয় বছরে আপনার করযোগ্য আয় হয়েছে ২,৭৮,০০০ টাকা। তাহলে আপনার করমুক্ত আয় সীমা ২,৫০,০০০ টাকা হবার কারণে আপনাকে প্রথম ২,৫০,০০০ টাকার উপর কোনো কর দিতে হবেনা। পরবর্তী ২৮,০০০ টাকার (২,৭৮,০০০ টাকা মাইনাস ২,৫০,০০০ টাকা) উপর ১০% হারে আপনার কর আসবে ২,৮০০ টাকা। কিন্তু যেহেতু আপনি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বসবাস করেন, তাই আপনাকে মিনিমাম ৫,০০০ টাকা কর দিতেই হবে।

তবে আবার বলছি যদি আপনার করযোগ্য আয়, করমুক্ত আয়সীমার কম হয়, তাহলে আপনাকে কোনো করই দিতে হবেনা। আবার যদি আপনি মিনিমাম আয়কর দাতা হন, তাহলে আপনি বিনিয়োগ জনিত কোন আয়কর রেয়াত সুবিধা পাবেন না।

তৃতীয় ধাপঃ সর্বোচ্চ আয়কর রেয়াত পাওয়ার জন্য সর্বনিম্ন কত টাকা বিনিয়োগ করতে হবে

আপনি কত টাকা কর রেয়াত সুবিধা পাবেন, তা নির্ভর করে আপনি সংশ্লিষ্ট অর্থ বছরে কত টাকা নতুন বিনিয়োগ করেছেন তার উপর। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আপনি আনলিমিটেড বিনিয়োগ করলেই আনলিমিটেড কর মওকুফ বা রেয়াত সুবিধা পাবেন। আপনি আপনার আয়ের সব টাকাই বিনিয়োগ করতে পারবেন, চাই কি ঋণ নিয়েও বিনিয়োগ করতে পারবেন! কিন্তু একটি নির্দিষ্ট অংকের বাইরে যত টাকাই বিনিয়োগ করেন না কেন, একটি নির্দিষ্ট অংকের বেশী কর রেয়াত সুবিধা আপনি আর পাবেন না। এজন্য এই ধাপটির নাম আমরা দিয়েছি সর্বোচ্চ আয়কর রেয়াত পাওয়ার জন্য সর্বনিম্ন কত টাকা বিনিয়োগ করতে হবে।

আপনার করযোগ্য আয় হতে প্রভিডেন্ড ফান্ডে নিয়োগ কর্তার অংশ (যদি প্রভিডেন্ড ফান্ডটি NBR কর্তৃক অনুমোদিত হয়) বাদ দিলে যা থাকবে, তার সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত যদি আপনি বিনিয়োগ করেন, তাহলে আপনি সর্বোচ্চ কর রেয়াত সুবিধা পাবেন।

ধরুন, আপনার করযোগ্য আয় ২১.০০ লক্ষ টাকা যার মধ্যে প্রভিডেন্ড ফান্ডে নিয়োগ কর্তার অংশ ১.০০ লক্ষ টাকা। তাহলে, আপনাকে সর্বোচ্চ কর রেয়াত সুবিধা পেতে হলে ৫.০০ লক্ষ টাকা [(২১.০০ লক্ষ টাকা – ১.০০ লক্ষ টাকা) X ২৫%] নতুন বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট আয় বছরে করতে হবে।

চতুর্থ ধাপঃ বিনিয়োগের উপর কত টাকা আয়কর রেয়াত পাবেন

– প্রথম ২.৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ১৫%
– পরবর্তী ৫.০০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ১২%
– এর বেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থাৎ ৭.৫০ লক্ষ টাকার বেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ৭.৫০ লক্ষ টাকার অতিরিক্ত টাকার উপর ১০%।

নিচে আমরা তিনটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা পরিস্কার ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করছি-

০১. ধরা যাক, সর্বোচ্চ আয়কর রেয়াত পেতে আপনি বিনিয়োগ করেছেন ৯.০০ লক্ষ টাকা। তাহলে,
– প্রথম ২.৫০ লক্ষ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে ১৫% হারে রেয়াত পাবেন ৩৭,৫০০ টাকা [২,৫০,০০০ X ১৫%]
– পরবর্তী ৫.০০ লক্ষ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে রেয়াত পাবেন ৬০,০০০ টাকা [৫,০০,০০০ X ১২%]
– বাকী ১.৫০ লক্ষ টাকা [৯.০০ লক্ষ – ২.৫০ লক্ষ – ৫.০০ লক্ষ] বিনিয়োগের বিপরীতে রেয়াত পাবেন ১৫,০০০ টাকা [১,৫০,০০০ X ১০%]
অর্থাৎ সব মিলিয়ে আপনি কর রেয়াত পাবেন ১,১২,৫০০ টাকা [৩৭,৫০০ + ৬০,০০০ + ১৫,০০০]।

০২. ধরা যাক, সর্বোচ্চ আয়কর রেয়াত পেতে আপনি বিনিয়োগ করেছেন ৬.০০ লক্ষ টাকা। তাহলে,
– প্রথম ২.৫০ লক্ষ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে রেয়াত পাবেন ৩৭,৫০০ টাকা [২,৫০,০০০ X ১৫%]
– পরবর্তী ৩.৫০ লক্ষ টাকা [৬.০০ লক্ষ – ২.৫০ লক্ষ ] বিনিয়োগের বিপরীতে রেয়াত পাবেন ৪২,০০০ টাকা [৩,৫০,০০০ X ১২%]
অর্থাৎ সব মিলিয়ে আপনি কর রেয়াত পাবেন ৭৯,৫০০ টাকা [৩৭,৫০০ + ৪২,০০০]।

০৩. ধরা যাক, সর্বোচ্চ আয়কর রেয়াত পেতে আপনি বিনিয়োগ করেছেন ২.০০ লক্ষ টাকা, তাহলে,
– ২.০০ লক্ষ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে রেয়াত পাবেন ৩০,০০০ টাকা [২,০০,০০০ X ১৫%]।

পঞ্চম ধাপঃ চুড়ান্ত প্রদেয় আয়কর বের করা

এই শেষ ধাপে আমরা ২য় ধাপে যে প্রাথমিক আয়কর বের করেছিলাম, তা থেকে ৪র্থ ধাপে বের করা আয়কর রেয়াত বাদ দিয়ে চূড়ান্ত প্রদেয় আয়কর বের করবো। আয়কর হিসাব করা শেষ।

সূত্রঃ ইন্টারনেট (সংশোধিত ও পরিমার্জিত)

Leave a Reply