বিশেষ কলাম

ঋণ পরিশোধে আর কত ছাড়?

লেখক: এমএ খালেক, অবসরপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড; অর্থনীতি বিষয়ক লেখক।

দেশের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের একটি শীর্ষ সংগঠনের প্রতিনিধিদল ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের কিছু দাবিদাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাদের এই দাবিদাওয়া নতুন কিছু নয়। আগের কিছু দাবিরই পুনরাবৃত্তি মাত্র। তারা করোনাকালীন ঋণ পরিশোধে দেওয়া বিশেষ ছাড় আগামী জুন পর্যন্ত বাড়ানোর দাবি করেছেন। এছাড়া পবিত্র রমজানে স্থানীয় বাজারে পণ্যমূল্য সীমিত রাখার লক্ষ্যে পণ্য আমদানি সহজীকরণ করা এবং দ্রুত অর্থায়নের কথা বলেছেন। এজন্য প্রয়োজন হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ব্যবসায়ীদের মার্কিন ডলার দেওয়ার অনুরোধ করেছেন।

টেকনো ইনফো বিডি‘র প্রিয় পাঠক: প্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও চাকরির গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ টেকনো ইনফো বিডি তে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন।

প্রসঙ্গক্রমে তারা আরও বলেছেন, এ মুহূর্তে ব্যাংক ঋণের সুদের ঊর্ধ্বসীমা এখনই প্রত্যাহার করার প্রয়োজন তারা দেখছেন না। সুদের হার কম হলে বিনিয়োগ বেশি হয়। তাই আগামী এক বছর যেন ব্যাংক ঋণের আপার ক্যাপ তুলে দেওয়া না হয়। দেশের ব্যবসাবাণিজ্যের অবস্থা বর্তমানে খুবই খারাপ। জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের কারণে কারখানাগুলো পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন কার্যক্রম চালাতে পারছে না। ব্যবসা না করতে পারলে উদ্যোক্তারা তাদের গৃহীত ব্যাংক ঋণের কিস্তি নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করতে পারবেন না। তাই আগামী জুন পর্যন্ত কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলেও কাউকে যেন নতুন করে ঋণখেলাপি হিসাবে চিহ্নিত করা না হয়। এফবিসিসিআই সভাপতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যেসব দাবি উত্থাপন করেছেন তা নানা কারণেই আলোচনার অবকাশ রাখে। করোনাকালীন অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ বিবেচনায় নতুন করে কাউকে ঋণখেলাপি ঘোষণা করেনি। প্রাথমিকভাবে সীমিত সময়ের জন্য এ সুযোগ দেওয়া হলেও পরে বেশ কয়েকবার তা বৃদ্ধি করা হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও করোনার প্রভাব সীমিত হয়ে এসেছে।

করোনাকালীন ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ উদ্যোক্তাদের যে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছিল কিন্তু এখন তা কোন যুক্তিতে আবারও বাড়ানো হবে? করোনার মতো বিভিন্ন অজুহাতে খেলাপি ঋণ কালচারকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার এই প্রবণতা কি সারা জীবন চলতে থাকবে? দেশে বর্তমানে উচ্চমূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষ বিপর্যস্ত অবস্থায় আছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক নানাভাবে মূল্যস্ফীতিকে সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় ঋণখেলাপিদের কোনো ধরনের বিশেষ সুযোগ না দিয়ে খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করাই বাঞ্ছনীয় ছিল।

তারা আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রস্তাব দিয়েছেন তা হলো, ব্যাংক ঋণের আপার ক্যাপ অন্তত আরও এক বছর বহাল রাখা। তারা বলছেন, ব্যাংক ঋণের সুদের হার কম হলে বিনিয়োগ বেশি হয়। তাদের এই বক্তব্য সাধারণ দৃষ্টিতে সঠিক এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বাংলাদেশের অবস্থা কি তা নির্দেশ করে? ব্যাংক ঋণের সুদের হার কম থাকলেই বিনিয়োগ হবে, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং ব্যাংক ঋণ সহজীকরণ করা হলে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়ে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়িয়ে দিলে উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ঋণ গ্রহণ আগের তুলনায় কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ নীতি সুদহার বাড়ানোর অনিবার্য পরিণতি হিসাবে ব্যাংক ঋণের সুদহারও আনুপাতিকভাবে বেড়ে যায়। মানুষ চাইলেই আগের মতো ব্যাংক ঋণ গ্রহণ করতে পারেন না। এতে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ কমে যায়। তাই কোনো দেশে মূল্যস্ফীতি অসহনীয় মাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে অর্থের জোগান কমানোর সহজ উপায় হিসাবে নীতি সুদহার বাড়িয়ে দেয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশই এখন উচ্চমূল্যস্ফীতির প্রভাবে বিপর্যয়কর অবস্থার মধ্যে রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে বর্তমানে যে উচ্চমূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে তা গত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য তারা নীতি সুদহার বাড়িয়ে চলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক এ বছর মোট ছয়বার নীতি সুদহার বাড়িয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত অন্তত পাঁচবার নীতি সুদহার বাড়িয়েছে। বিশ্বের অন্তত ৭৭টি দেশ এ পর্যন্ত তাদের নীতি সুদহার বাড়িয়েছে। এসব দেশের ব্যাংক ঋণের সুদহার বাজারের ওপর নির্ভরশীল। চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে বাজারই নির্ধারণ করে ব্যাংক ঋণের সুদহার কত হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি পঞ্জিকা বছরে অন্তত দুবার নীতি সুদহার বাড়িয়েছে। আগে নীতি সুদহার ছিল ৫ শতাংশ। এটা অনেকদিন ধরে চলে আসছিল। কিন্তু রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল, গ্যাস ও খাদ্যপণ্যের সংকটের কারণে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক দুবারে নীতি সুদহার দশমিক ৭৫ শতাংশ বাড়িয়েছে। নীতি সুদহার হচ্ছে, কোনো সময় সিডিউল ব্যাংকগুলো যদি তারল্য সংকটে পতিত হয়, তখন তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে স্বল্প মেয়াদে ধার বা ঋণ গ্রহণ করে। এই ঋণের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে সুদ আরোপ করে, সেটাই হচ্ছে নীতি সুদহার। বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে দ্বিমুখী আচরণ করেছে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়ালেও ব্যাংক ঋণের নির্ধারিত আপার ক্যাপ ৯ শতাংশ তুলে দেয়নি। ফলে শিডিউল ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে আগের চেয়ে দশমিক ৭৫ শতাংশ বেশি সুদ দিলেও তারা উদ্যোক্তাদের কাছে ঋণদানের ক্ষেত্রে আগের মতোই সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদ আরোপ করতে পারছে। এতে শিডিউল ব্যাংকের মুনাফা আগের তুলনায় কমে গেছে। এ উচ্চমূল্যস্ফীতিকালেও উদ্যোক্তারা আগের মতো সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ পাচ্ছে। এতে ব্যক্তি খাতে ঋণ গ্রহণের মাত্রা বেড়ে গেছে। ব্যক্তি খাতে গৃহীত ঋণের অর্থ যদি উৎপাদনশীল শিল্পে ব্যবহৃত হতো তাহলে কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু এ টাকা বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে। এমনকি বিদেশে পাচার হচ্ছে। চলতি মুদ্রানীতিতে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। আগের মুদ্রানীতিতে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। কিন্তু ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১১ শতাংশ।

বর্তমান মুদ্রানীতিতে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ১৪ দশমিক ১ শতাংশ নির্ধারিত থাকলেও একপর্যায়ে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত হয়। পরে অবশ্য এ হার কিছুটা কমেছে। উচ্চমূল্যস্ফীতিকালে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণ প্রবৃদ্ধির এ ধারা ইতিবাচক বলে বিবেচনা করা যেত যদি তা সঠিকভাবে বিনিয়োগ হতো। কিন্তু অর্থবছরের প্রথম ৪ মাসে শিল্পে ব্যবহার্য ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানি কমেছে ৭৬ শতাংশ। কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি কমেছে ১৪ শতাংশেরও অধিক। তার অর্থ হচ্ছে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ অথবা বিদ্যমান বিনিয়োগ সম্প্রসারণের চেষ্টা করছেন না। তাহলে ব্যক্তি খাতে যে ব্যাংক ঋণ দেওয়া হচ্ছে তা কোথায় যাচ্ছে? এগুলো বাজারে সার্কুলেট হচ্ছে অথবা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা বারবার বলে আসছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যাংক ঋণের আপার ক্যাপ তুলে দেওয়া জরুরি। কিন্তু তা না করে ব্যাংক ঋণের আপার ক্যাপ তুলে না দেওয়ার জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। ব্যাংক ঋণের সুদের হার কম থাকলে বিনিয়োগ বেশি হবে এটা বুঝি কিন্তু গৃহীত ব্যাংক ঋণ সঠিকভাবে ব্যবহারের নিশ্চয়তা না পেলে যে তা বাজারে ছড়িয়ে পড়বে অথবা বিদেশে পাচার হবে সেটা বুঝলাম না-এমন চিন্তা করার কারণ কী?

আরও দেখুন:
খরচ মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঢালাওভাবে ব্যাংক ঋণ নিচ্ছে সরকার
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তারল্য সহায়তা গ্রহণের বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের বক্তব্য
আর্থিক সাক্ষরতা বিষয়ক ওয়েবসাইট চালু করলো বাংলাদেশ ব্যাংক

ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহারের অন্যতম কারণ হচ্ছে খেলাপি ঋণের ব্যাপক উপস্থিতি। খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানোর পরিবর্তে যদি বাড়ার সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে ব্যাংক ঋণের সুদের হার কখনোই টেকসইভাবে কমবে না। খেলাপি ঋণ ব্যাংকের মুনাফা নানাভাবে খেয়ে ফেলে। বিনিয়োগ সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তাই এ মুহূর্তে ঋণখেলাপিদের কোনো ধরনের ছাড় না দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। খেলাপি ঋণের হার আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণীয় মাত্রায় নিয়ে আসতে পারলে ব্যাংক খাতে অনেক সমস্যা এমনিতেই সমাধান হয়ে যাবে। বৃহৎ ঋণখেলাপিদের অধিকাংশই ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি। তারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ব্যাংক থেকে গৃহীত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেন না। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা দেশের শত্রু। তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া যাবে না। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এটা খুবই ভালো কথা। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের কথা বলে কেউ যদি ব্যাংক লুটে শামিল হয়ে যায়, তাদের কখনোই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলা যাবে না।’ কারণ মুক্তিযুদ্ধ আমাদের দেশকে ভালোবাসতে, দেশের মানুষকে তাদের ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার শিক্ষা দেয়। কোনোভাবেই রাষ্ট্রীয় সম্পদ বা ব্যাংকের অর্থ লুটপাটের শিক্ষা দেয় না। যারা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি, তাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বয়কট করা যেতে পারে। রাষ্ট্রের কাছ থেকে তারা যেসব সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে, তা প্রত্যাহার করা যেতে পারে। একজন ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি কখনোই দেশপ্রেমিক হতে পারেন না। বিশেষ সুবিধার আওতায় ঋণখেলাপিদের ছাড় না দিয়ে তাদের যথাযথ আইনের আওতায় আনতে হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button