কতটা ভালো আছে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত?

ব্যাংকের বিতরণ করা বিপুল পরিমাণ টাকা আটকে আছে গ্রাহকের কাছে। করোনার কারণে অনেকেই ঋণের টাকা ফেরত দিতে পারেনি। তবে ব্যাংকের অবস্থা খারাপ হয়েছে—এমনটি বলা যাচ্ছে না। কারণ, গত দুই বছর ধরে বিশেষ সুবিধা পেয়েছে ব্যাংক খাত। শুধু তাই নয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শিথিল নীতিমালার কারণে ২০২১ সালে কয়েকটি বাদে অধিকাংশ ব্যাংক উচ্চ পরিচালন মুনাফা অর্জন করেছে। শিথিল নীতিমালার কারণে অপরিশোধিত কিস্তির সুদকে লাভের খাতায় দেখানোর সুযোগ পেয়েছে ব্যাংকগুলো।

আরও দেখুন:
আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানত-ঋণের সুদহার বেঁধে দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক
ঈদের আগে শুক্র ও শনিবার ব্যাংক খোলা থাকবে
আগামী দিন ডিজিটাল লেনদেনের: মাসরুর আরেফিন

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এতে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ সুবিধা পাওয়ার পরও ২০২১ সালে নিট লোকসানের সম্মুখীন হয়েছে অন্তত ৯টি ব্যাংক। এর মধ্যে ৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক।

টেকনো ইনফো বিডি‘র প্রিয় পাঠক: প্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও চাকরির গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ টেকনো ইনফো বিডি তে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন।

এগুলো হলো বেসিক ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক। এছাড়া বেসরকারি খাতের পদ্মা ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক এবং বিদেশি খাতের পাকিস্তানের হাবিব ব্যাংক।

এর মধ্যে জনতা ব্যাংক গত বছর ৩ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা নিট লোকসানের সম্মুখীন হয়েছে। ২০২০ সালে ব্যাংকটি নিট লোকসান করেছিল ৫ হাজার ৫৪ কোটি টাকা। পদ্মা ব্যাংকের ক্রমবর্ধমান নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। গত বছরে পদ্মা ব্যাংকের নিট লোকসান হয়েছে ১ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা। ২০২০ সালে ব্যাংকটির নিট লোকসান ছিল ১৫১ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পদ্মা ব্যাংকটির ব্যালেন্স শিটে নিট লোকসানের তথ্য প্রকাশ না করার অনুমতি দিয়েছে। এই লোকসানকে তারা ২০৩২ সাল পর্যন্ত ‘ইনটেনজিবেল অ্যাসেট’ হিসাবে দেখাতে পারবে।

এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের নিট লোকসান গত বছর বেড়ে হয়েছে ৩৯০ কোটি টাকা, যা ২০২০ সালে ছিল ৩৬৬ কোটি টাকা।

গত বছরে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের নিট লোকসান গুনেছে ৫৯৬ কোটি টাকা। ২০২০ সালে এটি ছিল ৫৩৩ কোটি টাকা।

বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক গত বছর ১৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা নিট লোকসানের সম্মুখীন হয়। ব্যাংকটি গত বছর কার্যক্রম শুরু করে।

সংকটে থাকা আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। মোট ৩৩টি শাখার ১৮টিই লোকসানে পরিচালিত হচ্ছে। ব্যাংকটির আয় চেয়ে ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি, যা ব্যাংকিং খাতে বিরল। বিনিয়োগের (ঋণের) সাড়ে ৭৮ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। খেলাপি ঋণের প্রায় শতভাগই মন্দমানের, যা আদায় হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। বিপুল অঙ্কের খেলাপিঋণের কারণে প্রতি বছরই নিট লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে। ব্যাংকটির পুঞ্জীভূত লোকসান বাড়তে বাড়তে এখন ১৯০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ব্যাংকটির কাছে এখনও আমানতকারীদের পাওনা রয়েছে প্রায় ৪২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) প্রায় ৭ কোটি টাকার আমানত আটকে আছে। এই ব্যাংকটি চলতি অর্থবছরসহ টানা চার অর্থবছর লাভের মুখ দেখেনি। যা আয় করছে তার চেয়ে ব্যয় করছে বেশি। জানা গেছে, ব্যাংকটির মোট ৩৮৩টি শাখা রয়েছে। এর মধ্যে শহরে রয়েছে ৫০টি আর পল্লী শাখা রয়েছে ৩৩৩টি। এসব শাখার মধ্যে ১৫১টি শাখাই লোকসানে রয়েছে। সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা লাভ করে ব্যাংকটি। এরপর টানা চার বছর কোনও লাভের দেখা নেই।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে ব্যাংটি লোকসান দেয় ৪৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে লোকসান হয় ৩৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা। সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২০-২১ অর্থবছরে লোকসান গুণতে হয় ৩ কোটি ১০ লাখ টাকা। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের ২৬ আগস্ট পর্যন্ত ১৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকা আয় এবং ১৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যয় করেছে রাকাব। এ সময়ে ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে বিশেষায়িত এ ব্যাংকটির।

এছাড়া ২০২১ সালের প্রথম নয় মাসে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে মুনাফা কমেছে এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ (এক্সিম ব্যাংক), মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক ও সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাব দেখা দিয়েছে। এতে কিছু ব্যাংক কয়েক বছর ধরেই লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে। ব্যাংকের টাকা ফেরত আনার ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শক্ত হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত ব্যাংকগুলোকে চাপ দেওয়া যাতে খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে জোর প্রচেষ্টা চালানো যায়।

এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শিথিল নীতিমালার কারণে ২০২১ সালে বেশ কিছু ব্যাংক উচ্চ পরিচালন মুনাফা করেছে। এই নীতিমালার কারণে অপরিশোধিত কিস্তির সুদকে লাভের খাতায় দেখানোর সুযোগ পেয়েছে ব্যাংকগুলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা অনুসারে, গত বছর ঋণগ্রহীতারা তাদের সবগুলো কিস্তির মধ্যে মাত্র ১৫ শতাংশ পরিশোধ করলে ব্যাংকগুলো তাদের খেলাপি হিসেবে বিবেচনা করতে পারবে না। এর বিপরীতে অপরিশোধিত বাকি ৮৫ শতাংশ কিস্তির সুদ ব্যাংকের মুনাফা হিসেবে স্থানান্তর করার অনুমতি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা বাস্তবে পরিশোধই করা হয়নি। এই প্রক্রিয়া ব্যাংকগুলোর মুনাফার অঙ্ক বাড়াতে সহযোগিতা করেছে।

ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড বিদায়ী বছরে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এর আগের বছরে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল ২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। এছাড়া গত বছরের নয় মাসে।

মুনাফা দেখানো ব্যাংকগুলোর শীর্ষ তালিকার মধ্যে রয়েছে বেসরকারি ডাচ-বাংলা ব্যাংকের নাম। ব্যাংকটি ২০২০ সালে ৫৫০ কোটি মুনাফা করেছে। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত (নয় মাসে) মুনাফা করেছে ৩৯৫ কোটি টাকা। একই সময়ে ইস্টার্ন ব্যাংক মুনাফা করেছে ৪০২ কোটি টাকা। ২০২০ সালের পুরো সময়ে ব্যাংকটি ৪১৮ কোটি মুনাফা করেছে। এছাড়া একই সময়ে বেসরকারি ট্রাস্ট ব্যাংক মুনাফা করেছে ২৭৮ কোটি টাকা। ২০২০ সালে (১২ মাসে) ১৮০ কোটি মুনাফা করেছিল ব্যাংকটি।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত অবস্থা আড়ালে চলে গেছে। কারণ বেশিরভাগ ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শিথিল নীতিমালার সুযোগ নিয়ে মুনাফা করেছে। তিনি বলেন, এখন সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। সুতরাং বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ব্যাংকগুলোকে তাদের নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) ও মূলধনের ভিত্তি উন্নত করতে বাধ্য করা।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button