গাইবান্ধা জেলার ঐতিহাসিক নিদর্শন রাজা বিরাট

0

বিরাট রাজার ঢিবি বাংলাদেশের রংপুর বিভাগের অবস্থিত একটি প্রাচীন স্থাপনা। এটি পরিচিত বিরাট নগর নামে। প্রাচীন কালে এটি দুর্গনগরী ছিল। এখানে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের সকল জেলাসহ সারাদেশ থেকে প্রতিবছর বৈশাখে মাসব্যাপী রাজা বিরাটের তীর্থ মেলায় হিন্দুধর্মের হাজার হাজার লোকজনের আসে। এটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এর তালিকাভুক্ত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা।

অবস্থান
গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার পশ্চিমে রাজাহার ইউনিয়নের বিরাট নগরীর প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন রাজা বিরাট। বিরাট নগরের পশ্চিমাংশে প্রাচীনকীর্তির ধ্বংসাবশেষ এখন একটি মাত্র ঢিবিরূপে আছে।

বিবরণ
বিরাট নগরের পশ্চিমাংশে পাঁচটি ঢিবি আছে। এক একটি ঢিবি প্রায় এক বিঘা জমির উপর অবস্থিত। ১৯১০ সালে ১৯৫ ফুট × ১৫০ ফুট আয়তনে একটি মন্দিরের ভিত্তি দেয়াল খনন করার পরে এটি অবিষ্কৃত হয়েছিল। এখন থেকে পাঁচটি ব্রোঞ্জ নির্মিত বিষ্ণুমুর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। এখানে ১৯৭৮ সালে পাওয়া যায় সংস্কৃত অক্ষরে খোদাই করা ‘নম: নম: বিরাট’ লেখা ৯ ইঞ্চি দীর্ঘ মহামূল্যবান একটি শিলালিপি। এছাড়া কালো রঙের শিলা পাথর দ্বারা তৈরি হস্তি মস্তক পাওয়া গিয়েছিল যা এখন রাজশাহী যাদুঘরে ও সিংহদ্বারের একটি পাথরের খাম্বা মহাস্থান যাদুঘরে রয়েছে। এর উত্তরে একটি পুকুর আছে।

ইতিহাস
বিরাট নগরী হল হিন্দু পৌরাণিক উপাখ্যান মহাভারতের বর্ণনায় যে রাজা বিরাট তার নামে। তিনি বিরাট বনে এক উচ্চ ভূমিতে রাজবাড়ী ও নগর স্থাপন করেন তখন থেকে এর নাম বিরাট নগরী। তিনি তার রাজ্যে হাজার হাজার দীঘি-পুষ্করিনী খনন করে মাছ চাষ করতেন তাই ‘মৎস্যরাজ বিরাট’ নামে খ্যাত হয়েছিলেন।

গাইবান্ধা জেলার নামকরণ
পাঁচ হাজার বছর আগে মৎস্য দেশের রাজা বিরাটের রাজধানী ছিল গাইবান্ধার গোবিন্দগজ থানা এলাকায়। মহাভারতের কাহিনি বলা হয়েছে এই রাজা বিরাটের রাজসভায় পঞ্চ পা-বের দ্রৌপদীসহ ছদ্মবেশে তদের ১২ বছর নির্বাসনের পরবর্তী ১ বছর অজ্ঞাত বাস করেছে। অজ্ঞাত বাসকালে যুধিষ্টির কঙক নামে বিরাট রাজর পাশা খেলার সাথী হয়েছিলেন। আর ভীমের দায়িত্ব ছিল পাচকের কাজ করা এবং তার ছদ্মনাম ছিল বল্লভ। বিরাট রাজার মেয়ে রাজকন্যা। উত্তমার নাচ, গান ও বাদ্যযন্ত্র শিক্ষার দায়িত্ব নিয়েছিলেন অর্জুন বৃহন্নলা ছদ্মনামে।

গোশালার দায়িত্বে ছিলেন সহদেব তন্তীপাল নামে এবং অশ্বশালার দায়িত্বে ছিলেন নকূল, তার ছন্দনাম ছিল গ্রন্থিক। আর বিরাট রাজার রানী সুদেষ্ণার গৃহপরিচারিকা হয়েছিলেন সৌরিনদ্রী নামে রৌপদী। বলা হয়ে থাকে এই বিরাট রাজার গো-ধনের কোন তুলনা ছিল না। তার গাভীর সংখ্যা ছিল ষাট হাজার। মাঝে মাঝে ডাকাতরা এসে বিরাট রাজার গাভী লুণ্ঠন করে নিয়ে যেতো। সে জন্য বিরাট রাজা একটি বিশাল পতিত প্রান্তরে গো-শালা স্থাপন করেন। গো-শালাটি সুরক্ষিত এবং গাভীর খাদ্য ও পানির সংস্থান নিশ্চিত করতে। নদী তীরবর্তী ঘেসো জমিতে স্থাপন করা হয়। সেই নির্দিষ্ট স্থানে গাভীগুলোকে বেঁধে রাখা হতো।

প্রচলিত কিংবদন্তী অনুসারে এই গাভী বেঁধে রাখার স্থান থেকে এতদঞ্চলের কথ্য ভাষা অনুসারে এলাকার নাম হয়েছে গাইবাঁধা এবং কালক্রমে তা গাইবান্ধা নামে পরিচিতি লাভ করে। গাইবান্ধা নামকরণ সম্পর্কে ভিন্ন মতও রয়েছে। কারণ গাইবান্ধা জেলার সাথে রাজা বিরাটের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে আজও প্রমাণিত হয়নি। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন স্থান যেমন হাতীবান্ধা, বগবান্ধা, চেংড়াবান্ধা, মহিষবান্ধা ইত্যাদি নামে জায়গা থাকায় মনে হয় গাইবান্ধা নামটি খুব বেশি পুরানো নয়। রাজা বিরাটের সাথে সম্পর্ক থাক বা না থাক গাইবান্ধা নামটি যে গাভীর প্রাচুর্য এবং গাভী বেঁধে রাখার ব্যাপার থেকে এসেছে সে কথা ধারণা করা যায়। তবে মহাভারতের সেই রাজা বিরাট যে গাইবান্ধার রাজা বিরাট তার পক্ষেও উল্লেখযোগ্য কিছু যুক্তি রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে মনুসংহিতার সংস্কৃত শ্লোকে বলা হয়েছে (মনূ ৭/১৯০। ‘‘কুরুক্ষেত্রাংসচ মৎস্যাংসচ পঞ্চামান, শুরেসেন জান দীর্ঘণ লঘূংশ্চৈব নরামু গ্রীনীকেষু যোধয়েৎ’’ এই স্লোগানটিতে বলা হয়েছে যে মৎস্যাদি দেশের লোকেরাই রণক্ষেত্রে অগ্রগামী হয়ে যুদ্ধ করত। মহাভারতের বিরাট পর্বে যে মৎপীদেশের কথা বলা হয়েছে এবং বিশ্ব কোষের অষ্টাদশ ভাগের ৬৯০ পৃষ্ঠায় উল্লিখিত মনুরবচন অনুসারে রাজা বিরাটকে মৎস্যদেশ অর্থাৎ মাছ প্রধান এবং নদীমাতৃক দেশ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেদিক থেকে এই উপমহাদেশের নদীমাতৃক এবং মাছ প্রধান এলাকা বলতে বাংলাদেশের এই অঞ্চলকেই বুঝায়।

নরেন্দ্রবসু প্রণীত বিশ্ব কোষের অষ্টাদশ খন্ডে রাজা বিরাট সম্পর্কে উল্লেখ আছে যে উক্ত বিরাট নামক প্রাচীন জনপদ গাইবান্ধার অন্তর্গত গোবিন্দগজ থানার করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে ৬ মাইল দূরে অবস্থিত। উক্ত বিরাট ঘোড়াঘাটের আলীগাঁও পরগণার অন্তর্গত। খৃষ্টীয় দশম শতাব্দীতে ঢাকা নগরিতে বাংলার রাজধানী স্থাপিত হলে ঘোড়াঘাটের প্রশাসনিক গুরুত্ব কমতে থাকে এবং সমৃদ্ধ জনপদ ক্রমে নিবিড় অরণ্যে পরিণত হয়। এই সময় বিরাট নামক স্থানে প্রভাবশালী রাজার প্রাসাদ ছিল। এখানে যে সকল ইটের স্তুপ দেখা যায় সেটি দেখে মনে হয় রাজধানীটি চতুর্দিকে একেবার ক্ষুদ্রপরিখা বেষ্টিত হবার পর আরেকটি বৃহৎ পরিখা বেষ্টিত ছিল এবং নগরীর মধ্যে ছিল অনেক ভালো ছোট বড় জলাশয়।

উল্লিখিত তথ্য গাইবান্ধার রাজা বিরাটের প্রাচীনত্ব এবং মহাভারতে বর্ণিত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ এবং পঞ্চ পা-বদের এখানে অবস্থানের পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করে। এছাড়া ১২৬৮ সালে প্রকাশিত কালীকমলা শর্মা রচিত ‘‘বগুড়া মেতীহাস বৃত্তান্ত’’ নামক গ্রন্থের ৪র্থ অধ্যায়ে মহা ভারতের সেই মৎস্যদেশ সম্পর্কে উল্লেখ আছে ‘‘ মৎস্যদেশের নামের পরিবর্তন লইয়া এই ক্ষণে এই স্থানে জেলা সংস্থাপিত হইয়াছে। উত্তর সীমা রংপুর জেলা, দক্ষিণ-পূর্ব সীমা দিনাজপুর জেলা। বগুড়া হইতে ১৮ ক্রোশ অন্তর ঘোড়াঘাট থানার দক্ষিণে ৩ ক্রোশ দুরে ৫/৬ ক্রোশ বিস্তীর্ণ অতি প্রাচীণ অরণ্যানী মধ্যে বিরাট রাজার রাজধানী ছিল। তৎপর পুত্র ও পৌত্রগণ ঐ স্থানে রাজ্য করিলে পর ১১৫৩ অবন্দে যে মহাপ্লাবন হয় তাহাতে বিরাটের বংশ ও কীর্তি একেবারেই ধ্বংস হইয়া যাওয়ার পর ক্রমেক্রমে ঐ স্থান মহারণ্য হইয়া উঠিল।

যখন এ দেশের আদ্যপান্ত তাবৎ লোকেই ঐ স্থাকে বিরাটের রাজধানী বলিয়া আসিতেছে। আর কীচক ও ভীমের কীর্তি যখন ঐ স্থানে অনতিদূরেই আছে আর মৎস্যদেশ যখন বিরাট রাজার রাজ্য ছিল, ভারতবর্ষ ছাড়া অন্য কোন স্থানকে মৎস্য দেশ বলে না তাখন ঐ স্থানে বিরাট রাজার রাজধানী ছিল তার অন্যথা প্রমাণ করে না। অতএব একথা বলা যায় বিরাট এলাকাটি অত্যন্ত প্রাচীন। এই প্রাচীন এলাকাটি কালীকমল শর্ম্মার মতে ১১৫৩ অব্দের মহাপ্লাবনে প্লাবিত হয়ে নদীগর্ভে তলিয়ে যায় এবং প্রাকৃতিক কারণে আবার তা নদীতলদেশ থেকে উত্থিত হয়। তবে রাজা বিরাটের গোচারণ ভূমির সাথে গাইবান্ধা নামকরণের সম্পর্ক যদি নাই থাকবে তবে রাজা বিরাটের এই কিংবদন্তীটি লোকমুখে এত ব্যাপকভাবে প্রচারিত হলোই বা কেন? যুক্তিহীন বা ভিত্তিহীন কোন বিষয়ের এত ব্যাপক প্রচার কোনক্রমেই সম্ভব নয় বলে ধারণা করা যায়। সুতরাং আমরা বলতে পারি গাই (গরু/গাভী) বাঁধা থেকে এলাকার নামকরণ হয়েছে গাইবান্ধা।

সংরক্ষণ অভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে
সংরক্ষণ অভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে মহাভারতে বর্ণিত মত্স্য দেশের রাজধানী গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার রাজাহার ইউনিয়নের রাজা বিরাটের বিরাট নগরীর প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন। অন্যদিকে একটি চক্র রাজা বিরাটের ঐতিহাসিক স্থাবর-অস্থাবর স্থাপনাসমূহ দখল করছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এসব সংরক্ষণে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করছে না। এতে করে ঐতিহাসিক মত্স্য দেশের রাজধানী ও সনাতন (হিন্দু) সমপ্রদায়ের অন্যতম তীর্থক্ষেত্র “রাজা বিরাট” একসময় শুধু কাগজ-কলমেই থেকে যাওয়ার আশংকা করছেন এলাকাবাসী।

কালক্রমে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বন্যায় বিরাট নগরী ধ্বংস স্তূপে পরিণত হয়। যার স্মৃতিচিহ্ন আজও কিছু কিছু বিদ্যমান। এখানে ১৯৭৮ সালে পাওয়া যায় সংস্কৃত অক্ষরে খোদাই করে ‘নম: নম: বিরাট’ লেখা ৯ ইঞ্চি দীর্ঘ মহামূল্যবান একটি শিলালিপি। যা মহাস্থান যাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া কৃষ্ণ রঙের শিলা পাথর দ্বারা তৈরি হস্তি মস্তকটি রাজশাহী যাদুঘরে ও সিংহদ্বারের একটি পাথরের খাম্বা মহাস্থান যাদুঘরে রয়েছে। তাছাড়া প্রায় ৫ টন ওজনের একজোড়া পাথরের কপাট যুগ যুগ ধরে পতিত অবস্থায় ছিল। যা পরবর্তীতে খণ্ড খণ্ড করে গ্রামবাসীরা নিয়ে গেছে।

লেখকঃ মোহাম্মদ শামসুদ্দীন আকন্দ, ব্যাংকার। (উইকিপিডিয়া, বিভিন্ন ব্লগ ও দেখতে গিয়ে লোকমুখে শোনা কথা অবলম্বনে লিখিত)
[গত সপ্তাহে গিয়েছিলাম এই রাজা বিরাট দেখতে, বর্তমানে এখানে একটি ঢিবি ছাড়া আর কিছুই নেই।]
ইমেইলঃ shafiqueshams@gmail.com

Leave a Reply