সাধারণ ছুটিতে ব্যাংকিং: হয়রানি বন্ধে নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থার দাবি

0

আগামী দুই সপ্তাহ দেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে করোনাভাইরাস সংক্রমণ হতে পরে সবচেয়ে বেশি হারে। এ জন্য সরকার সাধারণ ছুটির মেয়াদ আগামী ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এ সময়ে মানুষ যেন নিজের ঘরেই অবস্থান করে সে জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাস্তাঘাটে জনসমাগম ঠেকাতে কড়াকড়ি আরোপ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেকায়দায় পড়েছেন সাধারণ ব্যাংকাররা। গণপরিবহন বন্ধ। ব্যাংক থেকেও কোনো পরিবহনের ব্যবস্থা করা হয়নি। তাই তাদের একমাত্র বাহন ছিল রিকশা। কিন্তু গতকাল বিভিন্ন মোড়ে রিকশাও আটকে দেয়া হয়। এর ফলে দীর্ঘ পথ হেঁটে অনেক মহিলা কর্মকর্তাসহ সাধারণ কর্মকর্তারা কর্মস্থলে এসেছেন।

পূবালী ব্যাংকের একজন ভুক্তভোগী ব্যাংক কর্মকর্তা গতকাল জানিয়েছেন, একেতো নিরাপত্তামূলক পোশাক ব্যাংক থেকে সরবরাহ করা হয়নি, এরপরও দেয়া হয়নি নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা। এর ফলে পকেটের টাকা খরচ করে অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে যখন অফিসে আসছেন, তখন পথে পথে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তিনি রামপুরা থেকে মতিঝিলে অফিসে আসার সময় কয়েক দফা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়েছেন। সর্বশেষ মালিবাগ মোড়ে আসার পর রিকশা আর আসতে দেয়নি। ব্যাংকের কার্ড দেখানোর পরও তাকে রিকশা থেকে নামিয়ে দেয়া হয়। বাধ্য হয়ে চাকরি রক্ষার্থে তাকে মালিবাগ মোড় থেকে হেঁটে মতিঝিলে ব্যাংকের শাখায় এসেছেন।

নতুন প্রজন্মের এনআরবিসি ব্যাংকের তিনজন কর্মকর্তা বলেন, তাদেরও মাঝপথে রিকশা থেকে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। বাধ্য হয়ে তাদেরকে হেঁটেই অফিসে আসতে হয়েছে। এভাবে গতকাল অনেকেই রাস্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধার মুখে পড়েন। কেউবা দীর্ঘ পথ হেঁটে অফিসে এসেছেন। কিন্তু যাদের বেশি শারীরিক সমস্যা তারা বাসায় ফিরে যেতে বাধ্য হন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম গতকাল বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্যই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকিং খাত সীমিত পরিসরে ব্যাংক লেনদেনের জন্য খোলা রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা ব্যাংকের মাধ্যমেই পরিশোধ করতে হয়। আবার রফতানিমুখী শিল্প কারখানার শ্রমিকদের বেতনভাতা দেয়ার জন্য সরকার যে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে তাও বাস্তবায়ন হবে এই ব্যাংকের মাধ্যমেই। মূলত সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও জনগণের স্বার্থেই ব্যাংক খোলা রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংক খোলা রাখার শুধু নির্দেশনা দিতে পারে, তবে ব্যাংক কিভাবে তার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিসে উপস্থিত করবে এটা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নিজস্ব ব্যাপার। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তেমন করার কিছুই নেই।

এ দিকে ব্যাংকারদের শীর্ষ সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) সভাপতি ও ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডি ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলী রেজা ইফতেখার বলেন, ব্যাংকাররা জনগণের স্বার্থেই অফিস করছেন। এ ক্ষেত্রে কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা রাস্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের আইডি কার্ড দেখালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অফিসে আসার অনুমতি দিয়ে থাকেন। তিনি বলেন, পথে কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা হয়রানির শিকার হয়েছেন এমন কথা তিনি শুনেননি।

সাধারণ ব্যাংকারদের মতে, অপর্যাপ্ত নিরাপত্তার মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে তারা অফিস করছেন। দেশব্যাপী লকডাউনের মধ্যে অফিসে যাওয়ার তাদের জন্য রাখা হয়নি কোনো পরিবহন ব্যবস্থা। করোনাভাইরাসের মতো রোগ থেকে নিরাপদ রাখতে রাখা হয়নি বাড়তি কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা। সব যান চলাচল বন্ধের মধ্যে বাড়তি অর্থ ব্যয় করে অফিস করলেও তাদের জন্য রাখা হয়নি বাড়তি কোনো প্রণোদনা ব্যবস্থা। ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা অফিস নির্দেশনা দিয়ে বাসায় অবস্থান করছেন। কিন্তু তাদের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করছেন তারা।

এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আবারো অফিসের সময়সূচি বাড়িয়ে দিয়েছেন। আগামী রোববার থেকে সকাল ১০টা থেকে ১টা পর্য়ন্ত তিন ঘণ্টা ব্যাংক লেনদেন এবং বিকেল ৩টা পর্যন্ত আনুষঙ্গিক কার্যক্রম করার নির্দেশনা দিয়েছেন। একই সাথে ব্যাংক সেবার আওতাও বাড়ানো হয়েছে।

এ দিকে বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের মতো মহামারী রোগের প্রাদুর্ভারের মধ্যেও জীবনের সবধরনের ঝুঁকি নিয়ে অফিস করতে হচ্ছে তাদের। কিন্তু করোনাভাইরাসের মতো অতিসংবেদনশীল রোগ থেকে নিজেকে নিরাপদে রাখতে ন্যূনতম নিরাপত্তার ব্যবস্থাও তাদের জন্য রাখা হয়নি। অথচ জনগণের সাথে সম্পৃক্ত পেশাগুলোর মধ্যে ব্যাংকিং পেশাও একটি। ডাক্তার যেখানে নিরাপত্তামূলক পোশাক না পেলে রোগীকে স্পর্শ করছেন না সেখানে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা না রেখে গ্রাহকের কাছ থেকে প্রতিদিন শত শত কোটি টাকার কাগজের নোট স্পর্শ করতে হচ্ছে। নিজেদের ব্যবস্থাপনায় শুধু হ্যান্ডগ্লাভস পরে টাকা লেনদেন করতে হচ্ছে, যা পর্যাপ্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নয় বলে তারা মনে করেন।

এ দিকে প্রতিটি ব্যাংক থেকে নিজস্ব কোনো পরিবহন ব্যবস্থা না রাখায় গতকাল পথে পথে হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে ভুক্তভোগী ব্যাংকাররা জানিয়েছেন। এমনি পরিস্থিতিতে অন্তত রাস্তার নিরাপত্তার জন্য প্রতিটি ব্যাংক থেকে নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা রাখার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ ব্যাংকাররা।